জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং শেখ পরিবারের পছন্দের ঠিকাদারের কারণে সড়ক ও জনপদ বিভাগের ৪০০ কোটি টাকা জলে গেছে। চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে যশোর-খুলনা মহাসড়কের ৩৩ কিলোমিটার। ফলে শুধুমাত্র সড়কটি দিয়ে যানবাহনে চলাচলকারী যাত্রীদের দুর্ভোগ নয়; স্থবির হয়ে পড়েছে নওয়াপাড়া নৌ-বন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যও। এ ব্যাপারে সড়ক বিভাগ বলছে, সংস্কার কাজ চলমান। শেষ হতে দেড় বছর সময় লাগবে।
যশোর-খুলনা মহাসড়ক (এন-৭) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলোর একটি। বিভাগীয় শহর খুলনার সঙ্গে এ অঞ্চলের অন্য দুই প্রধান শহর যশোর ও কুষ্টিয়া ছাড়াও মাগুরা, নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর ও সংলগ্ন অঞ্চলে যাতায়াতের প্রধান সড়ক এটি।
এ রাস্তার পাশে নৌবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-বাণিজ্য শহর নওয়াপাড়া। দেশে আমদানি করা সারের প্রায় ৬০ শতাংশ নওয়াপাড়া থেকে সারা দেশে পরিবহন করা হয়। দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর যশোরের বেনাপোলের সঙ্গে খুলনাসহ মোংলা বন্দরের যোগাযোগও মূলত এন-৭ মহাসড়কের ওপর নির্ভরশীল।
২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যশোর অংশে চাঁচড়া থেকে অভয়নগরের রাজঘাট পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটারে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে এসেও কার্যত জনভোগান্তির নিকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে আছে এ প্রকল্পটি। সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের হম্বিতম্বি ছিল আসলে লোক দেখানো এবং নিজের পছন্দসই ঠিকাদারকে দিয়ে কাজটি করানোর কৌশল।
প্রথম শ্রেণীর স্থানীয় ঠিকাদার আবু সাঈদ জানান, ২০১৮ সালে ‘তমা কনস্ট্রাকশন’ ও ‘মাহবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স’ এই দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে যশোর-খুলনা মহাসড়কের কাজটি দেওয়া হয়েছিল। এই সড়কে যে নকশা করা হয়েছিল, সেই অনুপাতে সঠিকভাবে ঠিকাদার কাজ করেনি।
তিনি বলেন, সড়কের ‘পূর্ণমাল রিফারিং’ করে ভালো অংশটার সাথে নতুন মালামাল রাস্তায় ব্যবহার করার কথা। কিন্তু নতুন মালামাল ব্যবহার ও ‘পূর্ণমাল রিফারিং’ না করে পুরাতন মাল দিয়েই সড়ক তৈরি করেছে। এই সড়কের ঠিকাদাররা ছিল ফ্যাসিবাদী সরকার ঘনিষ্ঠ। বিশেষ করে শেখ পরিবারের এক প্রভাবশালী সদস্য এবং স্বয়ং ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তারা সে সময় দিনকে রাত করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন। সে কারণে সড়ক বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি।
২০১৮ সালে ৩২১ কোটি টাকা ব্যয়ে মহাসড়কটির ফের সংস্কারকাজ শুরু করে ‘তমা কনস্ট্রাকশন’ ও ‘মাহবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামে দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২০ সালের জুনে ওই কাজ শেষ হয়। কিন্তু এর অল্পদিনের মাথায় যশোর সদরের পদ্মবিলা থেকে অভয়নগর প্রান্ত পর্যন্ত অংশে সড়কটি ফুলে-ফেঁপে উঠে কার্যত সরু লেনে পরিণত হয়। ফলে এটিতে চলাচল দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে, একের পর এক দুর্ঘটনায় পড়তে থাকে যানবাহন। সওজ কর্তৃপক্ষ তখন বলেছিল, অতিরিক্ত তাপমাত্রায় বিটুমিনের কাজ করায় এমনটি হয়েছে। এরপর তারা আরো ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে সড়কটির দুই পাশের অংশ উঁচু করে।
এ অঞ্চলের স্থানীয়রা বলেন, খুলনা মহাসড়কে বিগত সরকারের আমলে যে কাজ হয়, তাতে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি হয়েছে। এই রাস্তা ৬ মাস অন্তত অন্তর সড়ক বিভাগ টেন্ডার করে। ছয় মাস চলার পরে আবার একই অবস্থায় ফিরে আসে রাস্তাটি । সড়ক বিভাগ ও ঠিকাদাররা মিলে সরকারের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প এনে ছোট একটি অংশ সড়কের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করে বাকি টাকা লুটপাট করেছে। এজন্যই এই সড়কের বেহাল দশা। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত নতুন সড়ক তৈরি করার দাবি জানান।
নওয়াপাড়া নৌবন্দর ব্যবসায়ীরা বলেন, সড়কে চলাচলে অনুপযোগী হওয়ায় অস্থবির হয়ে পড়েছে নওয়াপাড়া নৌবন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যও। খুলনা মহাসড়কের বেহাল দশা হয়াই বন্দর থেকে মালামাল স্থানান্তরের জন্য ট্রাক ড্রাইভাররা মালামাল লোড করতে চাচ্ছে না। বিশেষ করে ভরা মৌসুমে সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। সড়কের এই অবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ছে।
এদিকে পরিবহন ও ট্রাক চালকরা বলছেন, এই খুলনা মহাসড়ক দীর্ঘদিন ধরে খারাপ অবস্থায় আছে। ইট দিয়ে ‘রিফারিং’ করছে। দুই তিন দিন পর আবার একই অবস্থা হচ্ছে। কাজের মান ঠিক না থাকায় সড়কের এই অবস্থার কারণে আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রাস্তার কারণে গৌন্তব্যে পৌছাতে সময় লাগছে তিনগুণ আর প্রায় ঘটছে দুর্ঘটনা।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কর্তৃপক্ষ বুয়েট শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাকারিয়াকে কনসালটেন্ট নিয়োগ দিয়ে সড়ক সংস্কারকাজের পরীক্ষা করে। ২০২০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দাখিল করা ড. জাকারিয়ার রিপোর্টে বেশকিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সড়কটিতে কম পুরুত্বের বিটুমিন ওয়্যারিং করায় তা টিকবে না। এ ছাড়া সরকারি গেজেট অনুযায়ী লোডযুক্ত যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। ড. জাকারিয়া মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করে যানবাহনের চাপ কমানোর সুপারিশও করেন। তবে কনসালটেন্ট যে দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছিলেন, তাতে কারো কোনো শাস্তি হয়নি। আর তিনি যেসব সুপারিশ করেছিলেন, তাও আলোর মুখ দেখায় বিপাকে পড়েছেন পরিবহন ও ট্রাক মালিকরা।
খুলনা বিভাগের পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি আনিসুর রহমান লিটন জানান, খুলনা বিভাগীয় শহর হওয়াই কুষ্টিয়া, ঝিনাইদাহ, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, নড়াইল ও যশোর এই ছয় জেলার মানুষ এবং মংলা পোর্ট, নওয়াপাড়া নৌবন্দর ও বেনাপোল বন্দরের পরিবহন-ট্রাক খুলনা মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াত করে। দীর্ঘদিন যাবত এই সড়কের বেহাল দশা। সরকার প্রতিবছর কাজ করার জন্য এই সড়কের কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। একশ্রেণীর অসাধু লোক জনগণের এই টাকা লুটে কোটিপতি হচ্ছে। আর ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সড়ক বিভাগ ঠিকাদারের কাজের সঠিক তদারকি না করলে সড়কের এই বেহাল অবস্থা ঠিক হবে না । খুলনা মহাসড়ক ধান খেতে পরিণত হওয়ার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে চলেছে। পরিবহন ও ট্রাক প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সড়কের এই অবস্থার কারণে খুলনা মহাসড়কের ৭০% মোটরগাড়ির মালিক ব্যবসায়ীরা পথে বসে গেছে। এই সড়কে চলাচলের উপযোগী করে দ্রুত ৬ লেনের প্রকল্প সরকারকে গ্রহণ করা আহ্বান জানান ।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া বলেন, চলমান সংকটের বিষয়ে মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করতে না পারলে সমস্যার সমাধান করা কঠিন হবে। বুয়েটের শিক্ষকের পরামর্শ ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আমরা সড়কের গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় রাস্তা স্থায়ী করার জন্য ঢালাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছি। ২০২৪ সালের জুন মাসে সড়কে প্রথম স্টেপে ৪ কিলোমিটার ঢালাইয়ের কাজ শুরু সম্পন্ন হয়েছে । পরবর্তীতে ২৩৫২ কিলোমিটারের কাজের টেন্ডার করেছি। তার ভিতরে প্রায় এক কিলোমিটার কাজ হয়ে গেছে বাকি কাজ চলমান আছে। তাছাড়া আরো ৮ কিলোমিটার রাস্তা ঢালাই এর জন্য টেন্ডার প্রসেসিং রয়েছে । চলমান সংস্কার কাজ শেষ হতে দেড় বছর সময় লাগবে।


























