রোববার ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভিকে সাক্ষাৎকার 

তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনায় আপত্তি নেই জয়ের

রানার ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭:৪২, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ১৭:৫৪, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনায় আপত্তি নেই জয়ের

দেড় বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় দুদিন আগের নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিতে রাজি না থাকলেও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলে তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে তার আপত্তি নেই।
জয় বলেছেন, ‘আমি সবসময়ই উন্মুক্ত। আমি এমন একজন মানুষ, যে সবসময় আলোচনায় বিশ্বাস করে- তা যত কঠিনই হোক বা যার সঙ্গেই হোক। এটাই আমার কৌশল; জীবনে সবসময়ই এভাবেই চলেছি।’
গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে যখন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন চলছিল, সে সময় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত জয়ের সাক্ষাৎকার নেন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভির সাংবাদিক মাহাথির পাশা। বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোরে সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার করে আইটিভি। এরপর তা বাংলা ভাষায় প্রকাশ করে বাংলাদেশী সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর.কম। যা দৈনিক রানারের পাঠকদের জন্য হুবুহ তুলে ধরা হলো-

চব্বিশের আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে দমন-পীড়ন, তাতে আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার দায়, আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ভুল’, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়, তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা, নির্বাচনে জামায়াতের উত্থান, আওয়ামী লীগের সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে মাহাথির পাশার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন সজীব ওয়াজেদ জয়।

বৃহস্পতিবারের নির্বাচনের ফলাফলকে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ স্বাগত জানালেও জয় এ নির্বাচনকে বলছেন ‘প্রহসন’।

‘দেশের সবচেয়ে বড় দল এবং সব প্রগতিশীল দলকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা হয়েছে। মূলত এমনভাবে সাজানো একটি নির্বাচন হয়েছে, যাতে সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী তাদের জনসমর্থনের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব সংসদে পায়। এটি টেকসই হবে না। ভবিষ্যতে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।

‘দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের একটি নিষিদ্ধ- এমন নির্বাচনকে কীভাবে গ্রহণযোগ্য বলা যায়? যুক্তরাজ্যে যদি টোরি বা লিবারেলদের যে কোনো একটি দল নিষিদ্ধ করা হত, সেটার সমতুল্য পরিস্থিতি এটি। একে কোনোভাবেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বলা যায় না। অনির্বাচিত একটি শাসনব্যবস্থার নির্দেশে একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা নজিরবিহীন ঘটনা।’

আওয়ামী লীগের শাসনামলেই যে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে মাহাথির পাশা তখন প্রশ্ন করেন, বিষয়টি কীভাবে নজিরবিহীন হয়?

জয় তখন দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেনি। তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আদালতের রায়ের কারণে। জামায়াত তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধন করলে আবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারত।

জয় এবারের নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বললেও আওয়ামী লীগ আমলের তিনটি নির্বাচনে কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ ছিল। তাহলে জয়ের মূল্যায়নকে ‘কেন গুরুত্ব দেওয়া হবে’, সেই প্রশ্ন রাখেন আইটিভির সাংবাদিক।
জবাব দিতে গিয়ে শেখ হাসিনার ছেলে দাবি করেন, বিষয়টি ‘পুরোপুরি সঠিক নয়’।

‘গত তিনবারের মধ্যে প্রথম ও তৃতীয়বার বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করেছিল। দ্বিতীয়বারের ক্ষেত্রে, নির্বাচনের আগে জনমত জরিপগুলো দেখুন- আমেরিকানদের করা জরিপসহ সব জরিপেই দেখা গিয়েছিল আমাদের দল বিপুল ব্যবধানে জয়ী হবে। আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি নিজেদের উদ্যোগে কিছু অনিয়ম করেছেন। সেগুলো তদন্ত হওয়া উচিত ছিল, হয়নি। তবে সামগ্রিক ফলাফলে তার প্রভাব পড়ত না।’

২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনেও বিরোধী মতকে দমন, নৌকায় সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরার ব্যাপক অভিযোগ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিল। তাহলে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ নিয়ে কথা বলার মত অবস্থান আওয়ামী লীগের আছে কি না, সেই প্রশ্ন করা হয় জয়কে।

উত্তর দিতে গিয়ে ২০১৪ সালের নির্বাচন ঘিরে বিরোধী দলের জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনা মনে করিয়ে দেন জয়। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ কাউকে ‘নিষিদ্ধ করেনি’। তার ভাষায়, এটাই গত তিন নির্বাচনের সঙ্গে এবারের ভোটের ‘মৌলিক পার্থক্য’।

এখন যদি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিদেশি সাংবাদিকরা তাদের মূল্যায়নে বলেন যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, তাহলে মেনে নেবেন কিনা-সেই প্রশ্ন রাখা হয় জয়ের সামনে।

তিনি বলেন, ‘না, মেনে নেওয়া যায় না। আবার বলছি, দেশে যে অল্পসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষক রয়েছেন, তারা সরকারের তত্ত্বাবধানে চলাচল করছেন। কারণ তাদের স্বাধীনভাবে দেশের ভেতরে ভ্রমণের সুযোগ নেই, আর সত্যি বলতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও এতটাই খারাপ যে সেটি নিরাপদ নয়। তাহলে তারা আসলে কতটা পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন?

‘তবে তারা বক্তব্য দেওয়ার আগে আমি চূড়ান্ত মন্তব্য করব না। কিন্তু মূল প্রশ্ন হল- যুক্তরাষ্ট্রে যদি ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকানদের যে কোনো একটি দলকে নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে কি সেটিকে কোনোভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বলা যাবে?’

মাহাথির পাশা প্রশ্ন করেন, ‘গত ১৫ বছরে দুর্নীতি, অপহরণ, গুম, মতপ্রকাশ দমনের অভিযোগ-এসব বিবেচনায় নিয়ে আপনার কি মনে হয় না যে আজকের পরিস্থিতির জন্য আংশিকভাবে আওয়ামী লীগ নিজেই দায়ী?’

জবাবে জয় বলেন, ‘না, কারণ একই ধরনের অভিযোগ বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালেও তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল। অথচ এখন তাদেরই সেলিব্রেট করা হচ্ছে।’

চব্বিশের অভ্যুত্থান নিয়ে এক প্রশ্নে আইটিভির সাংবাদিক বলেন, ‘আপনি কি স্বীকার করেন যে আন্দোলন চলাকালে এমন কিছু ব্যর্থতা ছিল, যা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার পতনের কারণ হয়েছে?’

জবাবে জয় ‘কিছু ব্যর্থতা’ থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনটি শান্তিপূর্ণভাবেই শুরু হয়েছিল। তাদের দাবি ছিল যৌক্তিক। দুঃখজনক বিষয় হল, ২০১৮ সালে আমাদের সরকারই কোটা কমিয়ে দিয়েছিল। কোটা সরকার পুনর্বহাল করেনি; যারা আগে কোটা সুবিধা পেতেন, তাদের পরিবারের করা একটি মামলার ভিত্তিতে আদালত তা পুনর্বহাল করেছিল। এরপরই আন্দোলন শুরু হয়।

‘আমাদের সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল। তবে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল বিষয়টি সঠিকভাবে জানাতে; শিক্ষার্থী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসে কথা বলতেও ব্যর্থ হয়েছিল।’

জয়ের দাবি, জামায়াতে ইসলামী ওই ‘সুযোগ’ কাজে লাগিয়ে সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়।

‘তারাই সহিংসতা শুরু করে, আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়, এবং আবারও সরকার তা মোকাবিলায় ভুল করে; বিষয়টি এত দূর গড়ানো উচিত ছিল না।’

মাহাথির পাশা প্রশ্ন করেন, ‘আপনার মায়ের শাসনামলে কঠোর দমন-পীড়ন হয়েছিল। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে ১,৪০০ জন নিহত হয়েছেন। আপনি কিছু ভুলের কথা স্বীকার করছেন। নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের কাছে কি আপনি ক্ষমা চাইবেন?’

জাতিসংঘ ১৫ জুলাই থেকে ১৫ অগাস্টের মধ্যে নিহতের ওই সংখ্যার কথা বলেছে। আর সরকার পতন হয়েছিল ৫ অগাস্ট। তাহলে পুরো সময়ের হত্যাকাণ্ডের দায় কেন আওয়ামী লীগ সরকারকে দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন সজীব ওয়াজেদ জয়।

‘শত শত পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন, আন্দোলনের সময় আমাদের দলের শত শত কর্মীও নিহত হয়েছেন। তাহলে পুলিশ সদস্য ও সরকার-সমর্থক কর্মীদের হত্যার দায় কীভাবে সরকারের ওপর চাপানো যায়? অবশ্যই, যে কোনো মৃত্যু দুঃখজনক। কিন্তু সব হত্যার দায় সরকারকে দেওয়া কীভাবে যুক্তিযুক্ত?’

‘ক্ষমা চাওয়ার প্রসঙ্গে বলি, আমার মা প্রথমেই নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, সমবেদনা জানিয়েছিলেন, বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছিলেন এবং সব হত্যাকাণ্ড তদন্তে একটি বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করেছিলেন।’

আইটিভির সাংবাদিক তখন প্রশ্ন করেন, ‘আপনি স্বীকার করছেন আপনার মায়ের সরকারের আমলে কিছু ভুল হয়েছে, কিন্তু জেন জি আন্দোলনের সময় নিহত ১৪০০ জন বা তাদের কারও মৃত্যুর দায় আপনি নিতে রাজি নন।

জয় বলেন, ‘না, আসলে আমরা দায় স্বীকার করছি কয়েকশ মানুষের মৃত্যুর জন্য। ১৪০০ নয়, কারণ তাদের প্রায় অর্ধেকই ছিলেন পুলিশ সদস্য ও আমাদের দলের কর্মী। সঠিক সংখ্যা এই মুহূর্তে আমার জানা নেই, তবে কয়েকশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে- এটি অবশ্যই দুঃখজনক।

‘আমার মা কখনও কাউকে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেননি, শুধুমাত্র যারা পুলিশ বা অন্যদের ওপর হামলা করছিল, তাদের ক্ষেত্রে ছাড়া। একটি সরকারের আর কী করার থাকে? মানুষের জীবন রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে সশস্ত্র জঙ্গিরা পুলিশকে আক্রমণ করছিল।’

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় অন্তত ৩২ জন শিশু মারা গেছে। তাদের পরিবারের কাছে আওয়ামী লীগ ক্ষমা চাইবে কি না, সেই প্রশ্ন রাখা হয় জয়ের সামনে।

উত্তর দিতে গিয়ে জয় দাবি করেন, শেখ হাসিনার সরকার ‘তা করেছে’।

‘আমাদের সরকার পতনের আগেই, আন্দোলনের সময়ই আমার মা তাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। আমরা তাদের সঙ্গে দেখা করেছি; আমার মা ব্যক্তিগতভাবে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।’

শেখ হাসিনার ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডে তাকে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যার নির্দেশ’ দিতে শোনা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের কঠোর দমন নীতির কারণেই এত প্রাণহানি ঘটেছে কি না, সেই প্রশ্ন রাখা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলের সামনে।

জয় আগের মতই দাবি করেন, বিবিসি ও আল জাজিরা অডিও টেপের যে অংশটি প্রচার করেছে, তা কেটে নেওয়া একটি অংশ। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কখনও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ‘অনুমতি দেওয়া হয়নি’।

‘পুরো রেকর্ডিংয়ে তিনি (শেখ হাসিনা) স্পষ্টভাবে বলেছেন: সহিংস আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করতে, জীবন ও সম্পদ রক্ষায় প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।’

জুলাই-অগাস্টের ঘটনার জন্য মানবতাবিরোধ অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি যদি কখনও বাংলাদেশে ফেরেন, তার সামনে কী অপেক্ষা করছে? তা নিয়ে জয় উদ্বিগ্ন কি না, সেই প্রশ্ন রাখেন আইটিভির সাংবাদিক।

জবাবে জয় বলেন, তিনি উদ্বিগ্ন নন, কারণ তার বিশ্বাস, দেশের ‘অন্তত অর্ধেক জনগণ’ এই নির্বাচনকে কখনও ‘মেনে নেবে না’।

অতীতে আওয়ামী লীগ বারবার জামায়াতে ইসলামী বা তাদের অনুসারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তারাই ছিল বিএনপির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। শেখ হাসিনার শাসনামলে দমন-পীড়নের কারণেই জামায়াতের এই পুনরুত্থান ঘটেছে কি না, সেই প্রশ্ন রাখা হয় সাক্ষাৎকারে।

জয় তখন বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বীহীন মাঠে খেললে পুনরুত্থান ঘটানো খুব সহজ। এখন সেটাই হচ্ছে। জামায়াত এককভাবে বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয় দল নয়।’

বাংলাদেশের আদালত প্লট দুর্নীতির মামলায় সজীব ওয়াজেদ জয়কেও পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। এ অবস্থায় তিনি দেশে ফিরবেন কি না, জানতে চান মাহাথির পাশা।

জয় তখন বলেন, ‘আমি বাংলাদেশে থাকি না। আমার পুরো জীবনে মোট সাত বছর বাংলাদেশে কাটিয়েছি। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি।’

বাংলাদেশে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আছে কি না জানতে চাইলে জয় বলেন, ‘অবশ্যই একসময় ফিরব। দেখুন- তারেক রহমান, যিনি... দণ্ডিত হয়েছিলেন, তিনি এখন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। এসব পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হয় না।

তাহলে কি জয় বলতে চাইছেন যে একদিন হয়ত তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্যে দেশে ফিরে রাজনীতিতে নামবেন?

উত্তরে শেখ হাসিনার ছেলে বলেন, ‘না, আমার কখনও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা ছিল না; আমি তা বলছি না। আমি বলছি, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। অতীতে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবাদের যেসব দণ্ড হয়েছিল, সেগুলো সব বাতিল করা হয়েছে, সন্ত্রাসীদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এসব কিছুই স্থায়ী হবে না, টেকসই নয়। আর হ্যাঁ, একসময় আমি বাংলাদেশে ফিরতে পারব।’

শেখ হাসিনা কখনও বাংলাদেশে ফিরবেন কি না, সেই প্রশ্নে জয় বলেন, ‘আমার কোনো সন্দেহ নেই, তিনি একদিন ফিরবেন। তিনি বহুদিন ধরেই অবসর নিতে চেয়েছেন। তার প্রায় পুরো জীবনই কেটেছে বাংলাদেশে; সেখানেই তিনি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। কোনো একসময় তিনি ফিরবেন।’

তবে এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ‘একেবারেই নিরাপদ হবে না’ বলে মনে করেন জয়।

আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মায়ের ভারতে থাকা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন, কারণ তার বিবেচনায় ভারতই এখন শেখ হাসিনার জন্য ‘পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা’।

‘ভারত সরকার তাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিচ্ছে। ভারতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে; বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়া তার ধারেকাছেও যায় না। তাই তার নিরাপত্তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই। বরং তিনি যেখানে আছেন, সেখানে আছেন বলে আমি স্বস্তি পাই।

‘তবে তার জন্য খারাপ লাগে- নিজ দেশের বাইরে থাকতে হচ্ছে, যা তিনি কখনও চাননি। ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানের পর আমরা আগেও নির্বাসনে ছিলাম, যখন আমার পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছিল।’

জয় বলেন, ‘তখনও ১৯৭৫ সালের সেই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু দেখুন, আওয়ামী লীগ আবারও ফিরে এসেছে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ।’

মাহাথির পাশা তখন প্রশ্ন করেন, ‘আপনি যেমন বলছেন, নিঃসন্দেহে দলের ভবিষ্যৎ থাকতে পারে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ কেমন হবে? এখন কি বড় ধরনের সংস্কারের সময় নয়? নতুন নেতৃত্ব, নতুন মুখ?

সজীব ওয়াজেদ: ‘সংস্কার কোনো এককালীন প্রক্রিয়া নয়; এটি ধারাবাহিক ও চলমান বিষয়। আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। হ্যাঁ, আওয়ামী লীগ তার নিজস্ব নেতৃত্ব ঠিক করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটিও সম্ভব নয়; আমরা কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছি না, দলীয় বৈঠক করতে পারছি না, সংবাদ সম্মেলন করতে পারছি না।

‘আমাদের কার্যালয়গুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও গ্রেপ্তারের ভয়ে থাকতে হচ্ছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের করার মত কিছুই নেই। তবে পরিস্থিতি বদলাবে- সবসময়ই বদলায়।’

জয় বারবার বলেছেন, ২০২৪ সালের অগাস্টের ঘটনাবলীর জন্য তার মা দায়ী নন। তাহলে যা ঘটেছে, তার জন্য কাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত, সেই প্রশ্ন রাখা হয় সাক্ষাৎকারে।

উত্তরে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, যদি বিচার নিয়ে কথা বলি, তাহলে প্রতিবাদকারীদের হাতে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডকে দায়মুক্তি দেওয়া- পুলিশ সদস্য ও সরকার-সমর্থক কর্মীদের হত্যার জন্য আইনগত সুরক্ষা দেওয়া- যদি সেটিকেই বৈধ বলা হয়, তাহলে অতীতে যা-ই ঘটুক না কেন, তার বিচারের প্রসঙ্গই অর্থহীন হয়ে যায়। তখন আর বিচার নিয়ে কথা বলারই বা মানে কী? যদি হত্যাকাণ্ডই গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়, তাহলে আর বিচার নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন কী?”

তারেক রহমান বলেছেন, তিনি ‘প্রতিশোধের রাজনীতির’ পথে যেতে চান না। সে কথা মাথায় রেখে জয় কি তাকে মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ করবেন?

আইটিভির এই প্রশ্নে জয় বলেন, ‘এটা আমার হাতে নেই; আমি দেশে থাকি না। এটা পুরোপুরি দলের সিদ্ধান্তের বিষয়- তারা কী করতে চায়, সেটি তারাই ঠিক করবে।

‘বিএনপি বাংলাদেশের আরেকটি বড় রাজনৈতিক দল। অবশ্যই তাদের সঙ্গে কথা বলা উচিত; আমি সবসময়ই সেটা বলে এসেছি। বিএনপির কখনোই নির্বাচন বর্জন করা উচিত হয়নি। আর তারেক রহমান আমি বলছি, নির্বাচনটি ভুয়া, তবে যদি তিনি প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে অবশ্যই আমরা তার সঙ্গে কথা বলব এবং তার সঙ্গে কাজ করব।’

বাংলাদেশে মুজিব পরিবার ও জিয়া পরিবারে বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব নিয়ে অনেকে সমালোচনা করেন; এর অবসান হওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্ন কর হয় সজীব ওয়াজেদ জয়কে।

জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা কি বংশানুক্রমিক রাজনীতি? আমরা নিজেরা রাজনীতিতে থাকতে চাই? নাকি তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ দলীয় কাউন্সিলে বারবার আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন? প্রশ্নটা সেখানেই।
‘দেখুন, আমি যদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চাইতাম, অনেক আগেই হতে পারতাম। আমার মা এক দশকের বেশি সময় ধরে আমাকে নির্বাচনে দাঁড়াতে, সংসদ সদস্য হতে উৎসাহ দিয়ে আসছিলেন।’

তাহলে কেন জয় প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি?

তার উত্তর, ‘কারণ জীবনে এমন মানুষও থাকে, যারা যা আছে, তাতেই সন্তুষ্ট। সবাই ক্ষমতা বা অর্থকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখে না। আমার কখনোই ক্ষমতা বা টাকার প্রতি লোভ ছিল না। আমি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারলেই খুশি।’

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: