রোববার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাড়ির সবাই অসুস্থ, মেয়ের চিকিৎসায় ঋণে ডুবেছেন বাবা

প্রতিনিধি, বাগেরহাট

প্রকাশিত: ১৫:১৪, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাড়ির সবাই অসুস্থ, মেয়ের চিকিৎসায় ঋণে ডুবেছেন বাবা

যে ঘরে থাকার কথা ছিল হাসি-আনন্দ, সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। পরিবারের প্রায় সবাই কোনো না কোনো অসুস্থতায় ভুগছেন। ১৫ বছরের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস জীম দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে কৃষক বাবা ইব্রাহিম হাওলাদার বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ঋণ করেছেন। অসুস্থ মা পারভীন বেগমও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন; চোখে ছানি পড়ায় ঠিকমতো দেখতে পান না। বড় মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

বাগেরহাট সদর উপজেলার বেমরতা ইউনিয়নের পোলঘাট চিতলী বাজার এলাকার এই পরিবারটির কষ্ট যেন একসঙ্গে কয়েকটি সংকটের গল্প।

জন্মের পর থেকেই অসুস্থ ও দুর্বল জীম। ছোটবেলায় তাকে খুলনায় শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়া হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কানে শোনার সমস্যা ও হৃদযন্ত্রের জটিলতার কথা জানতে পারে পরিবার। এরপর বছরের পর বছর চিকিৎসা চললেও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি জীম।

এইচ এম বদর সামুর বিদ্যানিকেতন থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে সে। অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। সহপাঠীরা যখন বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যায়, তখন জীমকে ঘরেই কাটাতে হয় দিনের পর দিন।

মেয়ের চিকিৎসার জন্য নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছেন বাবা ইব্রাহিম হাওলাদার। কৃষিকাজ করে সংসার চালান তিনি। কিন্তু চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক ও এনজিও থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এখন সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি মেয়ের চিকিৎসার খরচ চালানোও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় নূরুল জামান সবুর বলেন, ‘জীম ছোটবেলা থেকেই অসুস্থ। পরিবারের মানুষ অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখন তাদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। মানুষের সহযোগিতা ছাড়া জীমের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন।’

প্রতিবেশী জাকির হোসেন বলেন, ‘একজন মেয়ের এভাবে অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে থাকা খুব কষ্টের। পরিবারটি অনেকদিন ধরে চেষ্টা করছে। এখন সমাজের মানুষ পাশে দাঁড়ালে অন্তত জীমের চিকিৎসা আবার শুরু করা সম্ভব হবে।’

জীমের চাচা আব্দুর রহমান হাওলাদার বলেন, ‘ইব্রাহিম নিজের সামর্থ্যের চেয়েও বেশি চেষ্টা করেছে। চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঋণ করেছে। এখন পরিবারটির অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা চাই, সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষ তাদের পাশে দাঁড়াক।’

জীমের বাবা ইব্রাহিম হাওলাদার বলেন, ‘মেয়েটা জন্মের পর থেকেই অসুস্থ। যতটুকু সামর্থ্য ছিল, সব দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছি। আমি জমিতে কৃষিকাজ করি। মেয়ের চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে অনেক টাকা ঋণ হয়ে গেছে। এখন ঋণও শোধ করতে পারছি না, আবার মেয়ের চিকিৎসাও ঠিকমতো করাতে পারছি না। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?’

জীমের মা পারভীন বেগম বলেন, ‘আমার মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই কষ্ট করছে। আমরা কত জায়গায় ডাক্তার দেখিয়েছি, কত পরীক্ষা করিয়েছি, তার হিসাব নেই। মেয়েটাকে সুস্থ করতে পারলাম না। আমিও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছি। চোখে ছানি পড়েছে, ঠিকমতো দেখতে পারি না। কিন্তু নিজের কষ্টের কথা ভাবি না। মেয়েটা যদি একটু সুস্থ হতো, তাহলেই শান্তি পেতাম।’

এই পরিবারের কষ্ট এখানেই শেষ নয়। বড় মেয়ে আশা আক্তার মিম ২০২৬ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। ভালো ফল করার সম্ভাবনা থাকলেও পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে অনার্সে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মিম বলেন, ‘আমার ছোট বোনটা যখন সুস্থ ছিল, তখন ওর সঙ্গে খেলব, গল্প করব, আড্ডা দেব—কত কিছু ভাবতাম। কিন্তু ও ছোটবেলা থেকেই অসুস্থ। এখন ওর সঙ্গে ঠিকমতো খেলতে পারি না, বাইরে নিয়ে যেতে পারি না। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় যখন দেখি, অন্য মেয়েরা তাদের ভাইবোনদের সঙ্গে হাসি-আনন্দ করছে, আর আমার বোনটা অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে আছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি চাই, আমার বোনটা একদিন সুস্থ হয়ে উঠুক। আবার আমার সঙ্গে খেলুক, গল্প করুক, হাসুক। কিন্তু আমাদের পরিবারের যে অবস্থা, তাতে ওর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াটাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা। আমার নিজের পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে।’

বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহনাজ পারভীন বীথি বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। ব্যবস্থা নেওয়ার আগে রোগীর সব কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হবে। ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার সিরোসিসে আক্রান্তদের আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের আওতায় সহযোগিতা করা যায় কি না, কাগজপত্র দেখে তা যাচাই করা হবে।’

একদিকে ১৫ বছরের অসুস্থ জীমের চিকিৎসা, অন্যদিকে অসুস্থ মা। বড় মেয়ের পড়াশোনার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। এর মধ্যে কৃষক বাবা ইব্রাহিমের মাথায় প্রায় ১৫ লাখ টাকার ঋণের বোঝা। পরিবারের চাওয়া খুব বেশি নয়—জীমের চিকিৎসা যেন আবার শুরু করা যায়, মায়ের চোখের চিকিৎসা করানো যায় এবং টাকার অভাবে বড় মেয়ের পড়াশোনা যেন থেমে না যায়।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: