রোববার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রকল্প পরিচালক হতে কোটি টাকা লগ্নি আলোচিত সেই কৃষি কর্মকর্তার!

মাঈনুল ইসলাম, ঢাকা

প্রকাশিত: ১৯:০৪, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ২০:০০, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকল্প পরিচালক হতে কোটি টাকা লগ্নি আলোচিত সেই কৃষি কর্মকর্তার!

ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পরিচালক পদে আলোচিত সেই ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন শরীফের নাম প্রস্তাবিত হয়েছে। এ নিয়ে অধিদপ্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এর আগে, কৃষি অধিদপ্তরের বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট একটি প্রকল্পে নিরীক্ষার নামে সারা দেশের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে আলোচিত হন তিনি। 

অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত ওই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের প্রস্তাবনায় ড. সাখাওয়াত হোসেন শরীফের নাম প্রস্তাবের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার আগের দায়িত্বকাল ও তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। 

সূত্র জানায়, প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চলমান ‘প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রাপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’ শীর্ষক প্রকল্পের- বিকল্প প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে অনুষ্ঠিত অধিদপ্তরের এক সভায় ড. সাখাওয়াত হোসেন শরীফের নাম প্রস্তাব করা হয়। সূত্রমতে, প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে আকস্মিকভাবে জুম সভা করে প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের প্রস্তাব তৈরি করা হয়। এ ক্ষেত্রে বর্তমান প্রকল্প পরিচালকদের কর্মদক্ষতা, প্রকল্পের অগ্রগতি কিংবা তাদের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই নতুন পরিচালকদের নাম প্রস্তাব করা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ প্রস্তাবটি আটকে দিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে থেকে সভার নোটিশ না দিয়ে গত রোববার পিডি পরিবর্তন নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে হঠাৎ একটি জুম সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান। সভায় বর্তমান প্রকল্প পরিচালকদের পরিবর্তে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এরপর তড়িঘড়ি করে এ বিষয়ে ফাইল তৈরি করে কৃষিমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। যদিও পরদিন কৃষিমন্ত্রী পুরো প্রস্তাবটি আটকে দেন।

জানা গেছে, ২০১৭ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম (এনএটিপি) ফেজ-২ চালু হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৩ সালে। শেষ দিকে প্রকল্পটির হিসাব নিরীক্ষার কথা জানিয়ে ২৭০ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে চিঠি দেন তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন শরীফ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষা ৩১ অক্টোবর থেকে ১৯ নভেম্বরের মধ্যে অডিট অধিদপ্তরের মাধ্যমে সম্পন্ন করার কথা বলা হয় চিঠিতে। এরপর অডিটের নামে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি তদন্তে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। পরে কমিটির এক সদস্য বদলি হলে তার স্থলাভিষিক্ত হন উপপরিচালক (রপ্তানি) হাসান ইমাম। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক, জেলার উপপরিচালক, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এবং প্রকল্পের হিসাব ও অডিটের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয় এবং লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন উপজেলা থেকে অডিটের নামে টাকা নেওয়া হলেও প্রকল্প অফিসে কোনো অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। অনেক উপজেলা থেকে অডিট খরচের নামে বরাদ্দের ২ শতাংশ হারে টাকা নেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে আসে। এ কাজে প্রকল্প অফিসের একটি ‘সংঘবদ্ধ চক্র’ কাজ করেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন শরীফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, তার নেতৃত্বে প্রকল্প অফিস থেকে দুর্নীতির উদ্দেশ্যে ভুয়া অডিটের ব্যবস্থা করা হলেও কোনো অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি।

এদিকে নতুন করে প্রকল্প পরিচালক হওয়ার প্রস্তাবে থাকা সাখাওয়াত হোসেন শরীফের বিরুদ্ধে টেন্ডার, বদলি-পদায়ন ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও করেছেন অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা। তাদের দাবি, অতীতে কয়েকজন প্রকল্প পরিচালক ও ক্ষমতাধর কর্মকর্তাকে নিয়ে তিনি একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছিলেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ আরও দাবি করছেন, ৫ আগস্টের পর তিনি নিজেকে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। বিগত সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা এবং সাবেক কৃষি সচিব  এমদাদ উল্লাহ মিয়ান এর আনুকূল্যে  গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের কথাও তারা বলছেন।

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে (খামারবাড়ি) গুঞ্জন উঠেছে, বহুল আলোচিত ওই কর্মকর্তা প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার চলমান একটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও উচ্চপর্যায়ের আমলাদের আশীর্বাদ পেতে ইতোমধ্যে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এমন খবরও চাউর হয়েছে।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাখাওয়াত হোসেন শরীফকে মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি বলেন, কোনো একটি প্রকল্পের পরিচালক হতে চাইছি আমি এবং টাকা বিনিয়োগ করেছি— এটি আপনার কাছে প্রথম শুনলাম।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: