১৫৮০ সালে বাংলায় মোগল শাসনের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ দেখা দেয়। বিদ্রোহ দমনের জন্য সম্রাট আকবর প্রথমে রাজা টোডরমল এবং পরে আজিম খানকে বাংলায় পাঠান। আজিম খান ১৫৮২ সালে বাংলায় পৌঁছান এবং ১৫৮৩ সালের মধ্যে তাঁর দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। তাঁর সঙ্গে আসা যোদ্ধাদের মধ্যে ভবেশ্বর রায় ছিলেন অন্যতম। সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণের পুরস্কার হিসেবে তিনি রাজা প্রতাপাদিত্যের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া ভূখণ্ডের অংশবিশেষ লাভ করেন। সৈয়দপুর, অমিদপুর, মুড়াগাছা ও মল্লিকপুর— এই চারটি পরগনার অধিকার তাঁর হাতে আসে। এভাবেই যশোর অঞ্চলে একটি নতুন জমিদারি পরিবারের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
ভবেশ্বর রায় ১৫৮৮ সাল পর্যন্ত এসব পরগনার ভোগদখল বজায় রাখেন। ওই বছরেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর উত্তরাধিকারী মুতাব রাম রায় ১৫৮৮ থেকে ১৬১৯ সাল পর্যন্ত জমিদারির অধিকার ভোগ করেন। তাঁর সময়েই যশোরের রাজপরিবারের রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়। রাজা প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে মোগল সেনাপতি রাজা মান সিংহের অভিযানের সময় মুতাব রাম রায় মান সিংহকে সহায়তা করেন। যুদ্ধে মান সিংহের পক্ষ জয়ী হওয়ায় তিনি নিজের অধিকৃত চারটি পরগনার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হন।
মুতাব রাম রায়ের শাসনামলের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো রাজস্ব প্রদানের বিষয়টি। তাঁর জমিদারির শেষ সাত বছরে ভূমির জন্য রাজস্ব দিতে হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এর আগে এসব ভূখণ্ডের ওপর রাজস্ব ধার্য করা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। এই তথ্য থেকে ধারণা করা যায়, সামরিক সেবার বিনিময়ে পাওয়া ভূখণ্ডের ওপর প্রথমদিকে রাজস্বের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও পরবর্তী সময়ে মোগল রাজস্ব প্রশাসনের আওতায় তা আসতে শুরু করে। ফলে জমিদারির চরিত্রেও পরিবর্তন ঘটে। সামরিক আনুকূল্যে অর্জিত ভূখণ্ড ধীরে ধীরে রাজস্বভিত্তিক জমিদারি কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে।
মুতাব রাম রায়ের উত্তরাধিকারী কন্দর্প রায় ১৬১৯ থেকে ১৬৪৯ সাল পর্যন্ত জমিদারি পরিচালনা করেন। তাঁর আমলে জমিদারির সীমানা আরও সম্প্রসারিত হয়। তিনি দাতিয়া, খালিসখালি, বাগমার, সেলিমাবাদ ও সাজিয়ালপুর পরগনা অধিগ্রহণ করেন। কী উপায়ে এসব পরগনা তাঁর অধিকারে এসেছিল, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট বিবরণ পাওয়া যায় না।
কন্দর্প রায়ের পর জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন মনোহর রায়। যশোরের রাজপরিবারের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সময়েই এই জমিদারি এক উল্লেখযোগ্য আকার ধারণ করে এবং আঞ্চলিক প্রভাবের দিক থেকে অন্য জমিদারিগুলোকে ছাড়িয়ে যায়। মনোহর রায়ের জমিদারি সম্প্রসারণের পদ্ধতি ছিল আগের উত্তরাধিকারীদের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। সামরিক সেবার পুরস্কার হিসেবে ভূখণ্ড লাভের পরিবর্তে তিনি রাজস্ব প্রশাসনের দুর্বলতা ও বকেয়া রাজস্বের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একের পর এক নতুন পরগনা নিজের অধীনে আনেন।
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, মনোহর রায় সম্ভবত নবাবের কাছ থেকে আশপাশের বিভিন্ন এস্টেট বা তালুকের ওপর কর্তৃত্ব লাভ করেছিলেন। এসব ভূসম্পত্তির রাজস্ব সরাসরি নবাবের কোষাগারে জমা না দিয়ে তাঁর মাধ্যমে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বাস্তবে অনেক এস্টেটই নির্ধারিত রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হতে থাকে। তৎকালীন রাজস্ব ব্যবস্থায় বকেয়া রাজস্ব পরিশোধের পাশাপাশি ভবিষ্যতের রাজস্ব প্রদানের দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে কোনো সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ লাভের সুযোগ ছিল। মনোহর রায় এই ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করেন এবং সংশ্লিষ্ট এস্টেটগুলো নিজের জমিদারির অন্তর্ভুক্ত করেন।
মনোহর রায়ের আমলে একাধিক পরগনা যশোরের রাজপরিবারের জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৬৮২ সালে রামচন্দ্রপুর, ১৬৮৯ সালে হাসানপুর, ১৬৯৬ সালে ইসাফপুর এবং ১৬৯৯ সালে মল্লয়, সোবনাল ও সোবনস অধিগ্রহণের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ১৬৯১ সালে রংদিয়া ও রহিমাবাদ, ১৭০৩ সালে সাহোস এবং ১৬৯০ সালে চিংগুটিয়া জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয়। এসবের পাশাপাশি টাল্লা, ফালুয়া, শ্রীপদকবিরাজ, ভাটলা ও কলকাতার মতো ছোট ছোট পরগনা বা ভূসম্পত্তিও তাঁদের অধিকারে আসে।
তবে পরগনাগুলোর অধিগ্রহণের সময় নিয়ে ঐতিহাসিক বিবরণে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। মনোহর রায়ের অর্জিত সম্পত্তির একটি প্রাচীন তালিকায় দাতিয়া ও খালিসখালির নাম পাওয়া যায়। অন্যদিকে, পরিবারের কাছ থেকে সংগৃহীত অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক তালিকায় এই দুটি পরগনাকে কন্দর্প রায়ের অর্জিত সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে এই দুই পরগনা ঠিক কোন সময়ে এবং কার উদ্যোগে জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
ইসাফপুর পরগনার জমিদার হিসেবে কালিদাস রায়ের নাম পাওয়া যায়। তবে অন্য পরগনাগুলোর তৎকালীন জমিদারদের পরিচয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এই অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও একটা বিষয় স্পষ্ট—যশোরের রাজপরিবারের জমিদারি বিস্তারের আগে অঞ্চলটি একক কোনো জমিদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। বরং বিভিন্ন পরগনায় পৃথক পৃথক জমিদার পরিবারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব, রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা এবং ভূসম্পত্তি অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি পরিবার অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এ ক্ষেত্রে যশোরের রাজপরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে নলডাঙ্গার জমিদার পরিবারের ইতিহাসের একটি মৌলিক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। নলডাঙ্গার পরিবার এ অঞ্চলে বসতি স্থাপনের প্রায় শুরু থেকেই প্রতিবেশী জমিদারদের তুলনায় প্রভাবশালী অবস্থানে ছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময়েও তাদের সেই প্রাধান্য অনেকাংশে অক্ষুণ্ন ছিল। অন্যদিকে, যশোরের রাজপরিবারের উত্থান ঘটেছিল ধাপে ধাপে। প্রথমে সামরিক সেবার পুরস্কার হিসেবে কয়েকটি পরগনার অধিকার লাভ, পরে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাধ্যমে সেই অধিকার ধরে রাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মে রাজস্ব ব্যবস্থার সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী জমিদারদের ভূসম্পত্তি অধিগ্রহণ।


























