সোমবার ০২ নভেম্বর ২০২৬

১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরে বস্ত্র কারখানা নিয়ে বিচারক হেঙ্কেলের সঙ্গে কোম্পানির বিরোধ

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৫:২৩, ২ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৫:২৩, ২ নভেম্বর ২০২৬

যশোরে বস্ত্র কারখানা নিয়ে বিচারক হেঙ্কেলের সঙ্গে কোম্পানির বিরোধ

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে যশোরে লবণ ব্যবসার পাশাপাশি বস্ত্র উৎপাদন নিয়েও কোম্পানির বাণিজ্যিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিচারক মি. হেঙ্কেলের বিরোধ দেখা দিয়েছিল। অষ্টাদশ শতকের আশির দশকে এই বিরোধের মূল কারণ ছিল দেশীয় তাঁতিদের ওপর কোম্পানির কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব, জোর করে কাপড় বুনতে বাধ্য করা এবং উৎপাদিত কাপড়ের ন্যায্য মূল্য না দেওয়া।

জেমস ওয়েস্টল্যান্ড তাঁর যশোর জেলার ইতিহাসবিষয়ক বিবরণে জানান, তখন যশোর জেলার সাতক্ষীরার সোনাবাড়িয়া ও বুরান এলাকায় কোম্পানির দুটি বস্ত্র কারখানা ছিল। এসব কারখানার রেসিডেন্ট বা সুপারিনটেনডেন্টরা তাঁদের অধস্তন কর্মচারীদের মাধ্যমে স্থানীয় তাঁতিদের অগ্রিম টাকা দিতেন। বিনিময়ে তাঁতিদের নির্দিষ্ট পরিমাণ কাপড় বুনে কারখানায় সরবরাহ করতে হতো। কিন্তু, এই ব্যবস্থায় তাঁতিদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হতো। তাঁদের অভিযোগ ছিল, গোমস্তারা অতিরিক্ত দাবি আদায় করতেন এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও অগ্রিম টাকা নিতে বাধ্য করতেন।

বিচারক মি. হেঙ্কেল তাঁতিদের এসব অভিযোগ শুনতে শুরু করেন। ১৭৮৬ সালে সোনাবাড়িয়া ও বুরান কারখানার সুপারিনটেনডেন্টরা এর প্রতিবাদ জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, কারখানার তাঁতি ও কর্মচারীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল বাণিজ্যিক বিভাগের। বিচারকের এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।

জবাবে হেঙ্কেল জানান, প্রথমদিকে তিনি অভিযোগগুলো বাণিজ্যিক কর্মকর্তাদের কাছে পাঠাতেন। কিন্তু সেখানে ন্যায়বিচার না হওয়ায় তাঁকে নিজেই মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করতে হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন, কোম্পানির একচেটিয়া অধিকারভুক্ত কাপড়ের বিষয়ে তিনি হস্তক্ষেপ করেননি। তাঁর আপত্তি ছিল গোমস্তাদের বেআইনি দাবি ও তাঁতিদের ওপর অত্যাচার নিয়ে।

এই বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বেসামরিক বিচার বিভাগ ও বাণিজ্যিক বিভাগের ক্ষমতার সংঘাত এড়াতে কিছু বিধি জারি করে। নিয়ম অনুযায়ী, রেসিডেন্টকে কোম্পানির তাঁতিদের তালিকা রাখতে হতো এবং তাঁরা কোম্পানির জন্য কাপড় বুনতে আগ্রহী কি না, তা জানার অধিকার দেওয়া হয়। খাজনা দিতে না পারার কারণে জমিদাররা কোম্পানির তাঁতিদের কারারুদ্ধ করতে পারবেন না বলেও নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো তাঁতির বিরুদ্ধে সাধারণ ফৌজদারি অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের জন্য রেসিডেন্টের কাছে পাঠানোর বিধান করা হয়। বাণিজ্যিক এজেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও প্রথমে রেসিডেন্ট-এর কাছে প্রতিকার চাইতে হতো।

কিন্তু এসব বিধিতে বাণিজ্যিক কর্মকর্তাদের ক্ষমতা খুব একটা কমেনি। ১৭৮৭ সালে হেঙ্কেল আবারও অভিযোগ করেন, গোমস্তারা কোম্পানির নিয়মিত তাঁতি নন, এমন ব্যক্তিদেরও জোর করে কাপড় বুনতে বাধ্য করছেন। অনেক তাঁতি আদালতে অভিযোগ করে তাঁদের চুক্তি বাতিল করিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, কোম্পানির কর্মকর্তারা তাঁতিদের কাছ থেকে এমন দামে কাপড় কিনতেন, যে দামে তাঁতিরা সাধারণ বাজারে বিক্রি করতে পারতেন না।
হেঙ্কেলের মতে, তাঁতিদের জোর করে কাজে লাগানোর অভিযোগের বিচার হওয়া উচিত দেওয়ানি আদালতে। কারণ, বাণিজ্যিক রেসিডেন্টের পক্ষে নিজের অধস্তন কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। তিনি আরও দাবি করেন, খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে তাঁতিদেরও অন্য সাধারণ প্রজাদের মতো একই নিয়মের আওতায় আনতে হবে।

পরের বছরও তিনি একই অভিযোগ তোলেন। একবার একজন অনিয়মিত এজেন্টকে বেঁধে রেখে এক জুতো ও তিন টাকা জরিমানা করেন। ওয়েস্টল্যান্ডের মতে, বিচারিকভাবে এমন শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। তবে বাণিজ্যিক কর্মকর্তাদের নিযুক্ত এজেন্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি পরবর্তী সময়েও প্রশাসনে চলতে থাকে।

তবে হেঙ্কেল কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিরোধী ছিলেন না। ১৭৮৮ সালে জেলার উত্তরাঞ্চলের কোমারকোলি রেশম কারখানার ব্যবসা সম্প্রসারণে তিনি উদ্যোগ নেন। আগের কয়েক বছরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তুঁত চাষ পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি রায়তদের অনুকূল শর্তে জমি দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

জেমস ওয়েস্টল্যান্ডের মূল্যায়নে, হেঙ্কেলের বিরোধিতার কারণ ছিল বাণিজ্যিক কার্যক্রম নয়, বরং কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার। তিনি মনে করতেন, জেলার মানুষের অধিকার রক্ষা করা তাঁর দায়িত্ব। তাই বাণিজ্যিক বিভাগের প্রধানদের নিজেদের বিভাগের বিরোধের চূড়ান্ত বিচারক রাখার ব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছিলেন। ওয়েস্টল্যান্ডের ধারণা, হেঙ্কেলের এসব প্রতিবাদ ও যুক্তি পরবর্তী সময়ে লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থার সংস্কারে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলেছিল। 
 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ: