সোমবার ২৬ অক্টোবর ২০২৬

১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুধীর ঘোষের পুজো

শহীদের রক্তে গড়া সম্প্রীতির শারদোৎসব

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৪:২৫, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

শহীদের রক্তে গড়া সম্প্রীতির শারদোৎসব

মূল ফটকেই চোখ আটকে যায়। বাঁশের ছাঁচে তৈরি নানা নকশার হাতের কাজ, তার ভাঁজে ভাঁজে বর্ণিল রঙের ব্যবহার—সব মিলিয়ে যেন উৎসবের এক নিজস্ব শিল্পভুবন। ফটক পেরিয়ে এগোলেই পথজুড়ে রঙিন আলোকসজ্জা। কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ে মণ্ডপের মূল আকর্ষণ—দেবী দুর্গার অবয়ব। দশভূজা দেবী এবং তাঁর সন্তানদের জন্য আলাদা আলাদা আসন। প্রতিমার আসন থেকে মণ্ডপ, মণ্ডপ থেকে পথসজ্জা—সবখানেই যত্ন আর স্বাতন্ত্র্যের ছাপ। প্রতি বছরই যশোরের এই পূজামণ্ডপ সেজে ওঠে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে, নতুন কোনো ভাবনা আর নতুন কোনো নান্দনিকতায়।

কিন্তু এই সাজসজ্জার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মানুষের স্বপ্ন, দেশপ্রেম, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রত্যয় এবং মুক্তিযুদ্ধের নির্মম আত্মত্যাগের স্মৃতি।
সাল ১৯৫৩। উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখনও অস্থির। ভাষার অধিকার নিয়ে আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠছে। সেই সময় যশোর শহরে সর্বজনীন দুর্গাপূজার আয়োজনের উদ্যোগ নিলেন সুধীরকুমার ঘোষ। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পূজার বাইরে গিয়ে তিনি চেয়েছিলেন সবাইকে নিয়ে, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে উৎসব করতে। জাতি, ধর্ম, বর্ণের বিভাজন যেন উৎসবের আনন্দকে স্পর্শ করতে না পারে—এই ছিল তাঁর প্রত্যয়।
সুধীর ঘোষের কাঠগোলায় শুরু হওয়া সেই পূজা হয়ে উঠেছিল যশোরের অন্যতম প্রাচীন সর্বজনীন দুর্গাপূজা। তখন শহরে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পূজার সংখ্যা ছিল সাত-আটটির মতো। সেই সময়ে সুধীর ঘোষের উদ্যোগ ছিল নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। তিনি দুর্গোৎসবকে দেখেছিলেন মানুষে মানুষে মিলনের একটি উপলক্ষ হিসেবে।
সেই আদর্শই আজও বহন করে চলেছে ঘোষ পরিবার।

তবে এই উৎসবের ইতিহাসে ১৯৭১ একটি গভীর কালো অধ্যায় হয়ে আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে সুধীরকুমার ঘোষও নিজেকে দূরে রাখেননি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তির লড়াইয়ে তিনি ছিলেন সক্রিয়। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পাকসেনারা তাঁকে এবং তাঁর নাবালক সন্তান সত্যব্রত ঘোষকে তুলে নিয়ে যায়। স্বামী ও সন্তানকে সেদিনের পর আর ফিরে পাননি কনকলতা ঘোষ।
পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে অকথ্য নির্যাতনের পর শহীদ হন সুধীর ঘোষ ও তাঁর ছেলে সত্যব্রত। তাঁদের মরদেহও আর খুঁজে পাননি কনকলতা দেবী।
স্বামী ও সন্তান হারানোর সেই অসহনীয় শোক নিয়েও তিনি থামিয়ে দেননি দুর্গাপূজা। বরং স্বামীর স্মৃতিকে ধারণ করে আরও দৃঢ়ভাবে ধরে রাখেন সেই আয়োজন। কালের পরিক্রমায় সুধীর ঘোষের সেই পূজা পরিচিত হয়ে ওঠে ‘শহীদ সুধীরকুমার ঘোষ পূজা মন্দির’ নামে।

একজন মানুষের হাতে যে উৎসবের শুরু, তাঁর মৃত্যুর পর তা হয়ে ওঠে একটি পরিবারের স্মৃতি, একটি সমাজের সম্প্রীতির প্রতীক এবং একটি জাতির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ।
কনকলতা দেবী ও তাঁর মেয়েরা দীর্ঘদিন নিজেদের হাতে পূজার আয়োজন পরিচালনা করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় এখন দায়িত্ব পালন করছেন সুধীর ঘোষের বড় ছেলে দেবব্রত ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী স্মৃতিকণা ঘোষ। ঘোষ পরিবারের সদস্যরা ছড়িয়ে আছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে—কেউ কলকাতায়, কেউ দিল্লিতে, কেউ কানাডা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু দুর্গাপূজা এলেই শিকড়ের টানে তাঁরা ফিরে আসেন যশোরে। তখন বাড়িতে বাড়ে ব্যস্ততা, আয়োজনের পরিধি বাড়ে, একসঙ্গে বসে চলে পূজার প্রস্তুতি, রান্নাবান্না ও নানা কর্মযজ্ঞ।

উলুধ্বনি, সিঁদুরখেলা, মন্দির প্রদক্ষিণ—সবকিছুই চলে নিজস্ব রীতি মেনে। আর সেই সঙ্গে থাকে সম্প্রীতির বার্তা। শারদীয় মেলার আয়োজনের পাশাপাশি অসহায় ও দুস্থ মানুষের মধ্যে বস্ত্র কিংবা নগদ অর্থ বিতরণও এই পূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

শহীদ সুধীর ঘোষের পূজামণ্ডপের সাজসজ্জাতেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে প্রতি বছরই নতুন কিছু করার চেষ্টা থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মূল ফটক থেকে শুরু করে আলোকসজ্জা, মণ্ডপ এবং প্রতিমার আসন—সবখানেই হাতের কাজকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাঁশের তৈরি কাঠামো, হাতে তৈরি নকশা আর রঙের ব্যবহারে তৈরি হয়েছে উৎসবের আলাদা আবহ।

চিত্রকর ও মণ্ডপের ডিজাইনার রাজীব রায়ের নেতৃত্বে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন কর্মী ১৫ দিন ধরে মণ্ডপের বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন। ২০০০ সাল থেকে তিনি নিয়মিত এই পূজামণ্ডপের সাজসজ্জার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর ভাষায়, প্রতিবেশী ভারতে পূজার সাজসজ্জায় নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই তিনিও চেষ্টা করেন গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করতে।

দেবব্রত ঘোষের স্মৃতিতে এখনও তাঁর বাবার সময়কার সেই পূজার অনেক ছবি জীবন্ত। তিনি জানান, সুধীর ঘোষের সময় মূল ফটক অনেক উঁচু করে সাজানো হতো। ফটকের ওপরে বসে বাদ্যযন্ত্রীরা বাজনা বাজাতেন। যাত্রাপালা ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও হতো। সময় বদলেছে, আয়োজনের ধরনও বদলেছে; কিন্তু উৎসবের প্রাণটুকু বদলায়নি।

দেবব্রত ঘোষ বলেন, তাঁদের বরাবরের চেষ্টা থাকে অন্যদের চেয়ে একটু ভিন্নভাবে পূজার আয়োজন করা। নিজেদের শিল্পীরা বছরের পর বছর এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। মূল ফটক, রাস্তার আলোকসজ্জা থেকে শুরু করে মণ্ডপের প্রতিটি কাজই করা হয় অত্যন্ত যত্ন নিয়ে। হাতের কাজকে দেওয়া হয় বিশেষ গুরুত্ব। তাঁদের এই কাজের ধরন এখন অন্য অনেক পূজামণ্ডপ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও অনুসরণ করছে। এমনকি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাঁদের কাছ থেকে মঞ্চসজ্জার উপকরণও সংগ্রহ করে।

তবে সাজসজ্জার চেয়েও যে বিষয়টি এই পূজাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে, তা হলো এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র।
এই মণ্ডপে হরিজন, ঋষি, আদিবাসীসহ নানা সম্প্রদায়ের মানুষ যেমন আসেন, তেমনি আসেন বিভিন্ন ধর্মের মানুষও। পূজার আনন্দ এখানে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সুধীর ঘোষ যে উদ্দেশ্যে ১৯৫৩ সালে সর্বজনীন পূজার সূচনা করেছিলেন, সাত দশক পরও সেই উদ্দেশ্যই যেন এই মণ্ডপের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

বছরের পর বছর নানা কথা শুনতে হয়েছে ঘোষ পরিবারকে। কিন্তু তাঁরা তাঁদের অবস্থান থেকে সরে যাননি। তাঁদের বিশ্বাস—স্বকীয়তা আর অসাম্প্রদায়িক মনোভাবই তাঁদের পূজাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
আজ শহরের অন্য মণ্ডপগুলোও যখন নানা বৈচিত্র্যে সেজে ওঠে, তখন শহীদ সুধীরকুমার ঘোষ পূজা মন্দিরের আলাদা আকর্ষণ তার ইতিহাসে। এই মণ্ডপের প্রতিটি বাঁশের নকশা, প্রতিটি আলোর রেখা, প্রতিটি প্রতিমার আসন যেন বহন করে একজন মানুষের স্বপ্নের উত্তরাধিকার। সেই স্বপ্নের সঙ্গে মিশে আছে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতি, স্বামী-সন্তান হারানো এক নারীর অশ্রু এবং একটি পরিবারের দীর্ঘ সাত দশকের অবিচল পথচলা।

১৯৫৩ সালে যে আয়োজন শুরু হয়েছিল সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে, ১৯৭১-এর রক্তাক্ত ইতিহাস তাকে আরও গভীর অর্থ দিয়েছে। তাই শহীদ সুধীর ঘোষের পূজা যশোরের সামাজিক ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এক অনন্য স্মারক।

প্রতি বছর শরৎ এলে মণ্ডপে আলো জ্বলে, ঢাকের বাদ্যি বাজে, দেবীর আরাধনা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। ব্যস্ত হয়ে ওঠে ঘোষবাড়ি। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা পরিবারের সদস্যরা ফিরে আসেন শিকড়ের কাছে।
আর সেই আলো-সাজের ভেতর, উৎসবের কোলাহলের আড়ালে যেন ফিরে আসেন সুধীর ঘোষও—যিনি চেয়েছিলেন সবাইকে নিয়ে, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি উৎসবের আয়োজন করতে। যাঁর জীবন থেমে গেছে ১৯৭১-এর অন্ধকারে, কিন্তু যাঁর স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে যশোরের শারদোৎসবে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: