গঙ্গার ধার থেকে উঠে হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়া চত্বরকে ফেলে রেখে মূল প্রবেশপথের সামনে এসে ডানদিক ধরে গেলে কেল্লা নিজামত এলাকা, মুর্শিদাবাদের নবাবদের নিজস্ব এলাকা। এখানে নবাবদের নিজস্ব প্রাসাদ, দরবার ভবন, ধর্ম উপাসনা ক্ষেত্র, প্রমোদ উদ্যান প্রভৃতি ছিল এই প্রাসাদের এলাকার মধ্যে। এ ছাড়া এই প্রাসাদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পেশার মানুষদের জন্য আলাদা আলাদা বসতি, বাজার, হাতিশালা, আস্তাবল, সমাধিক্ষেত্র প্রভৃতি গড়ে উঠেছিল প্রাসাদের আশপাশে। আমি আছি নবাব বাহাদুর রোডে।
সামনে নওশের বানুর সমাধি ও মসজিদ। নওশের বানু ছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁর স্ত্রী। পরিবারের অন্যদের মত তাঁর সমাধিও ওই মসজিদের সিঁড়ির নিচে। একটু এগিয়েই জুতা পট্টির তোরণদ্বার। এই রকম গেট বা তোরণ অনেকগুলি আছে এই এলাকায়, জুতাপট্টি এলাকায় ছিল চর্মকারদের বাস। নবাব পরিবার ও সেনাবাহিনীর জন্য চামড়াজাত দ্রব্যের কাজ এরা করতেন। একটু এগিয়ে গিয়ে গেলেই নজর আলি খান এস্টেট। এখানে প্রাচীন প্রাসাদোপম অট্টালিকা, ইমামবাড়া প্রভৃতি রয়েছে, চারিদিকে তার ইতিহাসের গন্ধ। কয়েক-পা হাঁটতেই এল নহবত গেট বা ত্রিপোলিয়া তোরণ। এখানেই টাঙ্গাওয়ালাদের স্ট্যান্ড। নবাব সুজাউদ্দিনের সময়ে এটি তৈরি। অতীতে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় নহবত বাজত। তোরণ পেরিয়ে ডানদিকে ছিল কেল্লা নিজামতের পূর্বদিকের তোরণদ্বার। তোরণের ভগ্ন অংশ ও দরজার বিশাল কব্জা ছাড়া কিছু নেই। স্থানীয়রা এটিকে রণকব্জা বলেন।
এই এলাকায় এমন অনেকগুলি দরজাবিহীন শুধু কব্জাটি দেখা যায়। এর কাছেই রাস্তার ধারের গেটটি কুরতাখানার গেট, এখানে দরজিদের বাস ছিল। মজার কথা কুরতাখানা এখন লোকমুখে কুত্তাখানায় পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চলে ছিল বিখ্যাত চকবাজার বা চাঁদনি চক। এখানে হিরে, জহরত, সোনা, চাঁদি প্রভৃতি দামি জিনিস কেনা-বেচা হত। চকবাজারেই রয়েছে মণি বেগমের তৈরি চক মসজিদ। মীরজাফর আলি খানের দ্বিতীয় পত্নী ছিলেন মণি বেগম।
এই মসজিদের ভিতরে একটি সমাধি আছে। সমাধিটা হলো বিখ্যাত বীণাবাদক ওয়াজিদ খানের। পলাশির যুদ্ধের পরে মিরজাফর নবাব হলে বেগমের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়ে যায়; মিরজাফর মারা যাওয়ার পর পরবর্তী নবাব নির্বাচনেও মণি বেগমের হাত থাকত। নবাবদের মাসোহারা ছাড়া ইংরেজদের থেকে আলাদা মাসোহারা পেতেন এই বেগম। খুব ভালো সম্পর্ক ছিল ইংরেজদের সঙ্গে। যে মিরজাফর আলি ইতিহাসের কুখ্যাত খলনায়ক, তাঁর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মরা কিন্তু অন্যরকম জীবন কাটিয়েছেন। মুর্শিদাবাদের অন্যতম স্কুল নবাব বাহাদুর ইনস্টিটিউশন মণি বেগমের জমানো টাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। চকবাজার এলাকাতেই ছিল মুর্শিদাবাদের প্রথম প্রাসাদ। মুর্শিদকুলি খাঁ এখানেই তৈরি করেছিলেন চেহেলসেতুন প্রাসাদ। চল্লিশটি স্তম্ভ যুক্ত এই প্রাসাদটি অত্যন্ত সুন্দর ছিল, বর্তমানে কোনও চিহ্নই আর নেই।
একটু এগোতেই রাস্তা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। বাঁদিকে চলে গেছে সিরাজউদ্দৌল্লা রোড, এই পথে গেলে আস্তাবল ও হাতিশালা দেখা যাবে। নবাব বাহাদুর রোড ধরে দক্ষিণ গেটের দিকে কিছুটা যাবার পর একটি ভাঙা দোতলা বাড়ি। এটি আম্বাখানা মানে আমখানা। শুধু গ্রীষ্মকালে আম থাকবে বলে এত বড়ো বাড়ি, নবাবি বলে কথা। শুধু গ্রীষ্ম নয়, সারাবছর আম খেতেন নবাবরা। মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে সব নবাব আমের কদর করতেন, প্রায় ৩০০ রকমের আম পাওয়া যেত এখানে। কোহেতুর, নবাব পসন্দ, বেগম পসন্দ, চন্দনকোষা, সাদুল্লা (হিমসাগর), অমৃতভোগ, কিসনভোগ, চম্পা, সবুজা, ল্যাংড়া, আনসাস প্রভৃতি আম এখানে সংরক্ষণ হত। দিল্লির দরবারেও যেত মুর্শিদাবাদের আম। এখানে বিশাল বিশাল জালায় ঘি অথবা মধু ভর্তি করে, আমের বোঁটায় মোম লাগিয়ে এই জালায় আম থাকত। এতে একবছর আম ভাল থাকত। এসব কাজ যাঁরা করতেন, তাঁদের আমতারাশ বলা হত।
আম মুর্শিদাবাদে নবাবিয়ানা ছিল খুব আদরের। সবচেয়ে মজার কথা কী জানেন- মিরজাফরের ছেলে মিরনকে আমরা সবাই জানি সিরাজের ঘাতক হিসেবে। এই মিরনের আমের প্রতি ভালবাসা ছিল সবচেয়ে বেশি। মুর্শিদাবাদে মিরজাফরের পর তিনি নবাবি পদের মোহও ত্যাগ করেছিলেন আমের জন্য। অনেক প্রাচীন বাড়ি, দেওয়াল পেরিয়ে একটি সুদৃশ্য মসজিদ। এটি সরাইখানা মসজিদ। দক্ষিণ গেটের কাছে এক গলির মধ্যে একটি ভাঙা বাড়ি। একজন বললেন এটি পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপতি ইসকন্দর আলি মির্জার ভিটে। দক্ষিণ গেটের সামনে দিয়ে আবার নবাবি এলাকায় মধ্যে প্রবেশ।
এই তোরণদ্বারে আগে নাকি রক্ষী থাকত, নহবত বাজত, তা আজ অতীত। গেট দিয়ে প্রবেশ করে ডানদিকের এই সাধারণ বাড়িতে নবাবদের বর্তমান বংশধরেরা থাকেন। পাশে এই ঘণ্টা-পিলারটি অনেক পুরোনো, এর পিছনে সেনানিবাস ছিল। কয়েক-পা এগিয়ে বামদিকে দারার আলি খাঁ এস্টেট ও ছোট ইমামবাড়া। এখনও এখান থেকে মহরমের সময় শোভাযাত্রা করে বড়ো ইমামবাড়ায় যায়। নদীর ধারের দিকে এগিয়ে যাই। এখানেই নবাবরা বিচরণ করতেন। তাঁদেরই নদীর ধারে বসার জায়গা হাওয়াখানা। এর কাছেই সুন্দর তিন গম্বুজবিশিষ্ট সফেদা মসজিদ। এখানে নদীর ধারটি সুন্দর করে সাজানো। রাস্তার দু’ধারে রয়েছে চিলথাম, কালো পাথরের দু’টি স্তম্ভের উপর দু’টি উড়ন্ত পাখি, ডানদিকে প্রাচীন বড় বড়ো বাড়ি। এই অঞ্চলে ছিল আলিবর্দির প্রাসাদ, সব কিছু ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। ছোটোবেলা থেকে সিরাজ এখানেই বড়ো হয়েছেন।
নবাব হওয়ার পর সিরাজ নদীর ওপারে হীরাঝিল প্রাসাদে থাকতেন। আজ শুধুই ধ্বংসস্তূপ। একটু এগিয়ে সুদৃশ্য বড় বাড়ি এটাই নবাবদের তৈরি শেষ প্রাসাদ বা নতুন রাজবাড়ি, নবাব ওয়াশিফ আলি মির্জার ওয়াশিফ মঞ্জিল। মঞ্জিলের সামনে নদীর ধারে বিরাট হাওয়াখানা, যা আগে নবাবদের একান্ত ছিল, আজ তা সর্বসাধারণের। হাওয়াখানার সামনে একটি বেমানান জেটিঘাট। এখানে নানান বোট, লঞ্চ নোঙর করে। নদী পারাপার হয়। এর পাশের ঘাট থেকে নৌকাভ্রমণে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া যায়। ওয়াশিফ মঞ্জিলের পাশের রাস্তা দিয়ে একটু গেলেই রানিমহল, মীনা মহল, সোনামহলে। এখন বেহাল অবস্থায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
একসময় কী জমজমাট ছিল এই এলাকা। অতীতে এখানে কৃত্রিম পাহাড়, নানান ফুলের গাছ ও নানান মূর্তি দিয়ে সাজানো ছিল। মূর্তিগুলি হাজারদুয়ারিতে স্থানান্তরিত হয়েছে আর বাকি বাগানটি হতশ্রী অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। এই রাস্তা ধরে কিছুটা হেঁটে হাজারদুয়ারির দক্ষিণদিকের দরজার সামনে এলাম। এখানেই রয়েছে একটি সূর্যঘড়ি। বাংলাভাষার চেয়ে বাংলার ইতিহাসের আরও করুণ অবস্থা। সেটা মালুম পাচ্ছি। নদীর ওপারে পশ্চিমে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীন সূর্য ডুবেছিল এখানেই। স্বাধীনতার পর আবার যে সূর্য উঠল, তা এত মলিন কেন? মেঘ, কুয়াশা প্রভৃতির মধ্য দিয়ে ভারত ইতিহাসের আবার কি কোনও পরিবর্তন হতে চলেছে।


























