বাংলার জমিদারি ইতিহাসে নাটোরের রাজপরিবার একসময় ছিল বিপুল ঐশ্বর্য, প্রতিপত্তি ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের জন্য সুপরিচিত। বিশাল ভূসম্পত্তি, বিপুল রাজস্ব আয় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে উদার দানের মধ্য দিয়ে পরিবারটি একসময় বাংলার অন্যতম প্রভাবশালী জমিদার পরিবারে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, উত্তরাধিকারীদের প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর সৃষ্ট আর্থিক সংকটের কারণে সেই বিপুল জমিদারির অধিকাংশই হাতছাড়া হয়ে যায়। একসময়ের বায়ান্ন লক্ষ টাকার জমিদারি শেষ পর্যন্ত নেমে আসে মাত্র তিন লক্ষ টাকা আয়ের ভূসম্পত্তিতে।
যশোরের তৎকালীন কালেক্টর জেমস ওয়েস্টল্যান্ড তাঁর এ রিপোর্ট অন দ্যা ডিস্ট্রিক্ট অফ যশোর’ গ্রন্থে নাটোরের রাজপরিবারের উত্থান-পতনের এই ইতিহাস তুলে ধরেছেন। রাজপরিবারের কাছ থেকে সরাসরি কোনো বিবরণ সংগ্রহ করতে না পারলেও তিনি যশোর জেলার যে-সব অঞ্চল একসময় নাটোরের জমিদারির অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেখানকার লোককথা ও প্রচলিত তথ্যের ভিত্তিতে পরিবারটির সম্পত্তি ও ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বিবরণ থেকে জানা যায়, গত শতাব্দীতে নাটোরের জমিদারি ছিল দেশের বৃহত্তম কিংবা বৃহত্তম জমিদারিগুলোর অন্যতম। লোকমুখে প্রচলিত ছিল, এই বিশাল ভূসম্পত্তির মূল্য ছিল বায়ান্ন লক্ষ টাকা।
নাটোরের রাজপরিবারের জমিদারি বিস্তৃত ছিল বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে। যশোর জেলার পশ্চিমাঞ্চলের সাহুজিয়াল, ভূষণা এবং নলদি, মোকিমপুর, সাটোরসহ একাধিক পরগনা ও ভূসম্পত্তি একসময় এই জমিদারির অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণে বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে, সীতারামের বিদ্রোহের পর তাঁর পরিবারের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া ভূসম্পত্তির কিছু অংশ নাটোরের রাজাদের দেওয়া হয়েছিল।
নাটোরের রাজপরিবারের ইতিহাসে মহারানি ভবানী ছিলেন এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। গত শতাব্দীর শেষার্ধে বিশাল এই জমিদারির মালিক ছিলেন তিনি। রাজা রামজীবন রায়ের পুত্র রাজা রামকান্ত রায়ের বিধবা মহারানি ভবানী শুধু জমিদারি পরিচালনায় নয়, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ও দানশীলতার জন্যও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর ধর্মপরায়ণতা ও উদারতার কথা বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও দেবদেবীর সেবায় তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করতেন। ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণ অনুযায়ী, কাশীতে তিনি ৩৮০টি মন্দির, অতিথিশালা এবং অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর দান ও পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনি অর্থের পাশাপাশি জমিও দান করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি স্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলেও অনেকগুলোর পরিচর্যা একসময় বন্ধ হয়ে যায়। ওয়েস্টল্যান্ডের ধারণা, রাজপরিবারের জমিদারি সংকুচিত হয়ে যাওয়ার ফলে এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
নাটোর ছিল রাজপরিবারের প্রধান কেন্দ্র। এখানেও মহারানি ভবানীর প্রতিষ্ঠিত বহু ধর্মীয় স্থাপনার অস্তিত্ব ছিল। মুর্শিদাবাদে অবস্থিত শাম রায় নামের একটি সুপরিচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও তাঁর দানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রতিষ্ঠানটির জন্য বিপুল ভূসম্পত্তি দান করা হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ডিহি ফুলবাড়িয়া। যশোর জেলার চৌগাছা ও কালীগঞ্জের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত এই ভূসম্পত্তির একটি অংশ কালীগঞ্জের বিপরীতে শিবনগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
মহারানি ভবানীর পর নাটোরের জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাঁর দত্তক পুত্র রাজা রামকৃষ্ণ রায়। তাঁর হাতে জমিদারির ভার অর্পণের পেছনে মহারানির মৃত্যুর পাশাপাশি দত্তক পুত্রের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার ঘটনাও ভূমিকা রাখতে পারে বলে ওয়েস্টল্যান্ড উল্লেখ করেছেন। রামকৃষ্ণ রায়ও ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। তবে তাঁর ধর্মচর্চার ধরন ও জমিদারি পরিচালনার মনোভাব ছিল মায়ের চেয়ে ভিন্ন।
মহারানি ভবানী ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জমিদারির প্রশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মনোযোগী ছিলেন। কিন্তু রাজা রামকৃষ্ণ রায় পার্থিব বিষয়ের প্রতি প্রায় সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়েন। তিনি নিজের ধর্মীয় কর্তব্য পালনে অধিকাংশ সময় ব্যয় করতেন এবং জমিদারির দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অন্যদের ওপর ছেড়ে দেন। এর ফলে জমিদারির প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজপরিবারের কর্মচারী ও ভৃত্যদের একটি অংশ এই সুযোগে নিজেদের সম্পদ বাড়াতে শুরু করে। জমিদারির আয় ও সম্পত্তির ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ ক্রমে বাড়তে থাকে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলার ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় আসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন— চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিদারদের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব প্রদানের দায়িত্ব স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু রাজস্বের নির্ধারিত অর্থ সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে জমিদারি নিলামে বিক্রির ঝুঁকি তৈরি হতো। নাটোরের মতো বিশাল জমিদারির ক্ষেত্রেও এই ব্যবস্থা বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণে দেখা যায়, জমিদারির ওপর আরোপিত রাজস্বের বোঝা সামাল দেওয়া এমনিতেই কঠিন ছিল। তার ওপর রাজা রামকৃষ্ণ রায়ের অদক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে।
জমিদারির বিভিন্ন অংশ একের পর এক বিক্রি হতে থাকে। যে কর্মচারীদের দায়িত্ব ছিল রাজপরিবারের সম্পত্তি রক্ষা করা, তাঁদের অনেকেই জমিদারির সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এমনকি রাজপরিবারের কর্মচারীদের কেউ কেউ জমিদারির বিভিন্ন অংশ কিনে নিজেদের ভূসম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠেন। ফলে নাটোরের রাজপরিবারের সম্পত্তি ক্রমে অন্যদের হাতে চলে যেতে থাকে।
ওয়েস্টল্যান্ডের বর্ণনায় এই পতনের ব্যাপ্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কার্যকর হওয়ার দশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই নাটোরের রাজপরিবার তাদের জমিদারির উল্লেখযোগ্য অংশ হারায়। যে রাজা বায়ান্ন লক্ষ টাকার জমিদারির উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন, তিনি তাঁর উত্তরসূরির জন্য রেখে যান মাত্র তিন লক্ষ টাকা আয়ের সম্পত্তি।
জমিদারির যে অংশটুকু রাজপরিবার শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পেরেছিল, তার উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল দেবদেবীর সেবায় নিয়োজিত ভূসম্পত্তি। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও দেবসেবার জন্য উৎসর্গ করা সম্পত্তি, অন্য সম্পত্তির মতো সহজে হাতছাড়া হয়নি— ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণে এমন একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যশোর জেলায় নাটোরের রাজপরিবারের অবশিষ্ট সম্পত্তি সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। তবে ডিহি ফুলবাড়িয়ার কথা তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।
নাটোরের জমিদারি ভেঙে যাওয়ার পর তার বিভিন্ন অংশ নতুন নতুন জমিদারির জন্ম দেয়। একসময়ের বিশাল ভূসম্পত্তি বিভক্ত হয়ে একাধিক প্রভাবশালী পরিবারের হাতে চলে যায়। ভূষণা অঞ্চলের জমিদারি বিক্রি করে দেওয়ার পর তা কয়েকটি বড় পরগনায় ভাগ করা হয়। নলদি, নাটোর ও মোকিমপুরের মতো ভূসম্পত্তি পৃথক ক্রেতাদের হাতে চলে যায়। প্রতিটি অংশই পরবর্তী সময়ে স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ জমিদারিতে পরিণত হয়।
সাহুজিয়াল অঞ্চলের ভূসম্পত্তিও বিভক্ত হয়ে একাধিক ছোট জমিদারিতে রূপ নেয়। এসব সম্পত্তিকে বলা হতো ‘ডিহি’। সাধারণত একই ভূখণ্ডে অবস্থিত কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি ডিহি গঠিত হতো এবং নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় সেখান থেকে রাজস্ব আদায় করা হতো। সাহুজিয়ালের বৃহত্তম ডিহি ছিল আড়পাড়া। গোবরাডাঙ্গার কেলারাম মুখার্জি, যিনি পরবর্তীকালে সারদা প্রসন্নের পিতামহ হিসেবে পরিচিত হন, এই ভূসম্পত্তি কিনেছিলেন। অন্যদিকে ডিহি কানেশপুর ও ডিহি স্বরুপর কিনেছিলেন ঠাকুর পরিবারের পূর্বপুরুষ গোপীমোহন ঠাকুর। এভাবে নাটোরের জমিদারি ভাঙনের মধ্য দিয়ে যশোরের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন জমিদার পরিবারের উত্থান ঘটে।
ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণ অনুযায়ী, কালিশঙ্কর রায় ও দয়ারাম রায় ছিলেন এই বিশাল জমিদারির সম্পত্তির অন্যতম প্রধান ক্রেতা। কালিশঙ্কর রায় ছিলেন নাটোরের রাজার দেওয়ান। জমিদারি পরিচালনার দায়িত্বে থেকে তিনি নিজের জন্য সম্পত্তি অর্জন করেছিলেন। ওয়েস্টল্যান্ডের ভাষ্যে, এই সম্পত্তি অর্জনের ক্ষেত্রে তাঁর তত্ত্বাবধানের দায়িত্বের অপব্যবহার ঘটেছিল। অর্থাৎ রাজপরিবারের সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মচারীই একসময় সেই সম্পত্তির ক্রেতা ও নতুন ভূস্বামীতে পরিণত হন।
অন্যদিকে দয়ারাম রায়ও নাটোরের রাজপরিবারের দেওয়ান ছিলেন। তিনি যে সম্পত্তিগুলো কিনেছিলেন, তার অধিকাংশই ছিল নাটোরের কাছাকাছি রাজশাহী অঞ্চলের পুরোনো জমিদারির অংশ। ওয়েস্টল্যান্ড শুনেছিলেন, দয়ারাম রায়ের সম্পত্তি অর্জনের ইতিহাসও কালিশঙ্কর রায়ের মতো হতে পারে। তবে এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। তাঁর এই সতর্ক মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি প্রচলিত তথ্য ও শোনা কথার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
তিনি বলেন, নাটোরের রাজপরিবারের পতন যশোরের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন জমিদার পরিবারের উত্থানের সুযোগ তৈরি করেছিল। আড়পাড়া, কানেশপুর, স্বরুপর, নলদি, মোকিমপুর ও ভূষণার মতো ভূসম্পত্তি একসময় নাটোরের জমিদারির অংশ হলেও পরবর্তী সময়ে সেগুলো পৃথক মালিকানায় চলে যায়। ফলে যশোর ও আশপাশের অঞ্চলের জমিদারি ইতিহাসে নাটোরের রাজপরিবারের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে।


























