একদিকে পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণের আহ্বান, অন্যদিকে ঝিনাইদহের মহাসড়কের পাশে বেড়ে ওঠা বড় বড় গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে বেড়ে ওঠা রেইনট্রি, মেহগনি, আকাশমণিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ একের পর এক কেটে নেওয়া হচ্ছে। এতে মহাসড়কের দীর্ঘদিনের সবুজ বেষ্টনী ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, ২০২৪ সালে দরপত্রে বিক্রি হওয়া এসব গাছ ২০২৬ সালে এসে পুরোনো কার্যাদেশের ভিত্তিতে কাটার প্রশাসনিক ও আইনগত ভিত্তি কী?
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ-জীবননগর আঞ্চলিক মহাসড়কের কোটচাঁদপুর উপজেলার কাশিপুর থেকে এলাঙ্গী অভিমুখে চলছে গাছ কাটার এ কাজ। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি স্থানে এখনো চলছে গাছ কাটার কাজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বড় আকৃতির রেইনট্রি, মেহগনি, আকাশমণিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কোথাও গাছের গোড়া পড়ে আছে, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ডালপালা। আবার কোথাও কাটা গাছ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর এসব গাছ মহাসড়কের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পথচারী ও যাত্রীদের ছায়া দিয়ে এসেছে। নতুন গাছ বড় হয়ে ওঠার আগেই পুরোনো গাছ কেটে ফেলায় সড়কের দুই পাশের সবুজ কমে যাচ্ছে।
দরপত্র ২০২৪ সালে, গাছ কাটা হচ্ছে ২০২৬ সালে
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এসব গাছ কাটার জন্য ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল সামাজিক বন বিভাগের যশোর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই বছরের ২০ জুন কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তবে নানা কারণে তখন গাছ কাটা সম্ভব হয়নি। প্রায় দুই বছর পর এখন সেই কার্যাদেশের ভিত্তিতেই গাছ কাটা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোটচাঁদপুরে ৪০টি এবং শৈলকুপায় ছয়টি লটে গাছ বিক্রি করা হয়েছে। কার্যাদেশে নির্দিষ্ট করে গাছের সংখ্যা উল্লেখ না করে শুধু লটের সংখ্যা ও বিক্রয়মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে। এসব গাছের মোট বিক্রয়মূল্য ৩৫ লাখ ৫২ হাজার ২৫ টাকা।
বন বিভাগের একটি সূত্রের দাবি, প্রতিটি লটে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি গাছ রয়েছে। সে হিসাবে শুধু কোটচাঁদপুরের ৪০টি লটেই গাছের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর বাইরে শৈলকুপায় রয়েছে আরও ছয়টি লট।
বন্ধের পর আবার শুরু
জেলা বন বিভাগ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে দরপত্র ও কার্যাদেশ দেওয়া হলেও ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মৌখিক নির্দেশে সবুজ ও তরতাজা গাছ কাটা বন্ধ রাখা হয়। পরে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন কোনো নির্দেশনা না থাকায় পুরোনো কার্যাদেশের ভিত্তিতে আবার গাছ কাটা শুরু হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, দীর্ঘ সময় কার্যাদেশ বাস্তবায়ন না হওয়ার পর সেটি বহাল রেখে গাছ কাটার আগে নতুন করে যাচাই বা অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না।
কার্যাদেশ এক প্রতিষ্ঠানের, গাছ কাটছেন অন্য ব্যবসায়ী
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গাছ কাটার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে মেসার্স আর কে এন্টারপ্রাইজের নামে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে কুষ্টিয়ার মৃত আবুল কাশেমের ছেলে বকুল হোসেনের নাম রয়েছে।
তবে সরেজমিনে গাছ কাটার কাজ তদারক করতে দেখা যায় কালীগঞ্জের কাঠ ব্যবসায়ী আক্কাচ আলীকে। কার্যাদেশপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী বকুল হোসেনকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।
আক্কাচ আলী বলেন, ‘কুষ্টিয়ার একজন ঠিকাদার দরপত্রের মাধ্যমে গাছগুলো কিনেছেন। তাঁর কাছ থেকে আমি গাছ কিনে নিয়ে কাটছি। সরকারি সব নিয়ম মেনেই গাছ কাটা হচ্ছে।’
স্থানীয়দের প্রশ্ন
এলাঙ্গী এলাকার বাসিন্দা রনি হোসেন বলেন, ‘তরতাজা গাছগুলো কেন কাটা হচ্ছে, সেটা আমাদের বোধগম্য নয়। এসব গাছ পথচারীদের ছায়া দেয়, পরিবেশ ঠান্ডা রাখে। অথচ একের পর এক গাছ কেটে মহাসড়ক ফাঁকা করে দেওয়া হচ্ছে।’
চা দোকানি রবিউল বলেন, ‘সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দুই বছর আগের দরপত্র এত দিন কীভাবে বহাল থাকল? সেই দরপত্রের ভিত্তিতে এখন গাছ কাটার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো?’
স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘আগে এই সড়ক দিয়ে গেলে দুই পাশে সবুজ গাছের সারি দেখা যেত। এখন অনেক জায়গায় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। গাছ শুধু কাঠ নয়, এগুলো মানুষের ছায়া ও পরিবেশের নিরাপত্তা।’
যা বলছে বন বিভাগ
কোটচাঁদপুরের ডেপুটি বন রেঞ্জার প্রণব কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘গাছগুলো অনেক আগে দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। বিভিন্ন কারণে তখন কাটা সম্ভব হয়নি। এখন কাটা হচ্ছে। সামাজিক বনায়ন প্রকল্পে গাছ লাগানোর পর একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। মেয়াদ শেষে নিয়ম অনুযায়ী গাছ বিক্রি করা হয়। প্রকল্পভেদে এ মেয়াদ ১০ বছর থেকে ২৫-৩০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। বর্তমানে যে গাছগুলো কাটা হচ্ছে, সেগুলো ২০ থেকে ২৫ বছর মেয়াদের বলে আমাদের ধারণা।’
ঝিনাইদহ জেলা সহকারী বন সংরক্ষক মোছা. জুমুয়া জামান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের মৌখিক নির্দেশনায় গাছ কাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে নির্বাচিত সরকার আসার পর কোনো নির্দেশনা না থাকায় এখন পুরোনো দরপত্রের ভিত্তিতে আবার গাছ কাটা হচ্ছে।’
তবে গাছের সংখ্যা, প্রজাতি, বিক্রয়মূল্য এবং দীর্ঘ বিরতির পর পুরোনো কার্যাদেশ বহাল রাখার প্রশাসনিক ভিত্তি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে গাছ কাটার প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। মহাসড়কের পাশে বড় গাছ কাটার পরিবেশগত প্রভাব এবং ভবিষ্যতে সেখানে নতুন করে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা আছে কি না, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।


























