১০০ বছর বয়সে মানুষ সাধারণত ফিরে তাকান ফেলে আসা জীবনের দিকে। তবে অধ্যাপক মোহাম্মদ আফসার আলীর কাছে শতবর্ষ থেমে যাওয়ার সময় নয়, নতুন করে স্বপ্ন দেখার সময়। শিক্ষকতা, সামাজিক আন্দোলন ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তার দীর্ঘ পথ পেরিয়েও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা তাঁর মধ্যে অটুট।
শুক্রবার যশোর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে তাঁর শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত ‘শতবর্ষে আলোর পথে মহাপ্রাণ’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে উঠে আসে তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনের নানা দিক। ১০০টি মোমবাতি প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক ও বিশিষ্টজনেরা অংশ নেন।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে হাজারো শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছেন অধ্যাপক আফসার আলী। তাঁদের অনেকে রাজনীতি, অধ্যাপনা, গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের এই সাফল্যকেই নিজের জীবনের বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আফসার আলী বলেন, ‘আমার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছি। তাঁদের অনেকে রাজনীতি, অধ্যাপনা, গবেষণাসহ দেশের বড় বড় জায়গায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন—এটিই আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি।’
এরপর নিজের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাস করি।’
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন এই প্রবীণ শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বকে চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বিশ্বের মেহনতি মানুষকে আরও একটি বড় লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে।’
অনুষ্ঠানের বক্তারা বলেন, অধ্যাপক আফসার আলী শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; তিনি বহু শিক্ষার্থীর চিন্তা ও চেতনা গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষের জীবন নিয়ে ভাবনার সুযোগ তৈরি হতো। তাঁদের ভাষায়, ‘তাঁর ক্লাসরুম ছিল চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের জায়গা, আর তাঁর কণ্ঠ ছিল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রাচীর।’
শিক্ষকতার পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন অধ্যাপক আফসার আলী। যশোরের ভৈরব নদ রক্ষা আন্দোলনসহ নদী, পরিবেশ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার বিভিন্ন আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার কথা তুলে ধরেন বক্তারা। তাঁদের মতে, মানুষের অধিকার, পরিবেশ ও জাতীয় সম্পদের প্রশ্নকে তিনি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অধ্যাপক আফসার আলীর সঙ্গে ১০০টি মোমবাতি প্রজ্বালনে অংশ নেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক নার্গিস বেগম, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট এ টি এম এনামুল হক, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, প্রবীণ সাংবাদিক মশিউল আজম, ড. মুস্তাফিজুর রহমানসহ বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষরা।
পরে ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করা হয়। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।
জন্মশতবর্ষ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ইসরারুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কমিটির সদস্য হারুন অর রশিদ।
এক শতাব্দীর জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে অধ্যাপক আফসার আলীর বক্তব্যে তাই শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, ভবিষ্যৎ সমাজ নিয়েও প্রত্যাশার কথা উঠে এসেছে। বয়স ১০০ পেরোলেও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তাঁর কথায় এখনও স্পষ্ট।


























