বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরের প্রথম পৌর চেয়ারম্যান পিয়ারী মোহন গুহ

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৮:১৮, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যশোরের প্রথম পৌর চেয়ারম্যান পিয়ারী মোহন গুহ

যশোর শহরের ইতিহাসে পিয়ারী মোহন গুহ একটি বিস্মৃতপ্রায় নাম। অথচ একসময় তিনি ছিলেন এই শহরের নাগরিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। যশোর পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কলকাতা হাইকোর্টের জাঁদরেল আইনজীবী, বিভিন্ন সামাজিক ও বৌদ্ধিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এবং যশোরের শিক্ষিত নাগরিক সমাজের একজন পরিচিত মুখ ছিলেন তিনি। শহরের বেজপাড়া এলাকায় ছিল তাঁর বাড়ি ও বাগানবাড়ি। আজ তাঁর সেই বাড়ির সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা না গেলেও, বেজপাড়ার একটি সড়ক এখনও বহন করছে তাঁর নাম— পিয়ারী মোহন রোড।

ঊনবিংশ শতকের শেষভাগের যশোরকে বুঝতে গেলে পিয়ারী মোহন গুহের জীবন বিশেষভাবে অনুসন্ধানের দাবি রাখে। কারণ তাঁর পরিচয় শুধু একজন আইনজীবী কিংবা পৌর প্রশাসকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সে সময়ের যশোরের যে শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা ও সংগঠনমুখী নাগরিক সমাজ গড়ে উঠছিল, পিয়ারী মোহন গুহ ছিলেন তারই একজন সক্রিয় অংশীজন।
১৮৮৩ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমসাময়িক নথিতে তাঁর উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। ঞযব ঞযবড়ংড়ঢ়যরংঃ পত্রিকার মে ১৮৮৩ সংখ্যায় যশোরের থিওসফিক্যাল সোসাইটির শাখার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে পিয়ারী মোহন গুহ নিজেকে যশোর শাখার সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিয়ে ২৯ মার্চ ১৮৮৩ তারিখে স্বাক্ষর করেছিলেন। এর অর্থ, ওই সময় তিনি যশোরের একটি নবীন বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক সংগঠনের সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন।

থিওসফিক্যাল সোসাইটির সঙ্গে তাঁর এই সম্পৃক্ততা তৎকালীন যশোরের সামাজিক ইতিহাসের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার শিক্ষিত সমাজে পাশ্চাত্য জ্ঞান, প্রাচ্য দর্শন, ধর্ম, বিজ্ঞান ও মানবতাবাদ নিয়ে নতুন ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। থিওসফিক্যাল আন্দোলন সেই বৃহত্তর বৌদ্ধিক আবহেরই একটি অংশ। যশোরেও যে সেই চিন্তার ঢেউ পৌঁছেছিল, পিয়ারী মোহন গুহের সম্পৃক্ততা তার একটি দলিল।
এরও আগে ১৮৮১ সালের চৎড়পববফরহমং ড়ভ ঃযব অংরধঃরপ ঝড়পরবঃু ড়ভ ইবহমধষ-এ দইধনঁ চবধৎু গড়যধহ এঁযধ' নামে একজনের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁকে এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যপদের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল। যদিও ওই নথির ভিত্তিতে তাঁর সদস্যপদ কতটা আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, সে বিষয়ে আরও যাচাই প্রয়োজন, তবু এশিয়াটিক সোসাইটির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর নামের সংযোগ তাঁর সামাজিক ও বৌদ্ধিক পরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

পিয়ারী মোহন গুহের আরেকটি পরিচয় ছিল আইনজীবী হিসেবে। কলকাতা হাইকোর্টে তিনি আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন পুরোনো নথি থেকে জানা যায়। উনিশ শতকের কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের প্রধান আইন ও প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোর একটি। যশোরের একজন নাগরিক সেখানে গিয়ে উচ্চ আদালতে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া তাঁর সামাজিক অবস্থান ও শিক্ষাগত পরিমণ্ডল সম্পর্কে ধারণা দেয়।
তবে তাঁর আইনজীবী জীবনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনও সামনে আসেনি। কলকাতা হাইকোর্টের পুরোনো মামলার নথি, আইনজীবীদের তালিকা এবং সমকালীন সংবাদপত্রে আরও অনুসন্ধান চালালে তাঁর পেশাগত জীবনের বিস্তৃত পরিচয় পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে কোন কোন মামলায় তিনি সওয়াল করেছেন, তাঁর চেম্বার কোথায় ছিল এবং কলকাতায় তাঁর সামাজিক যোগাযোগ কেমন ছিল— এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অনুসন্ধানের অপেক্ষায়।
যশোর শহরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আরও প্রত্যক্ষ। জানা যায়, শহরের বেজপাড়া এলাকায় তাঁর বাড়ি ছিল। সেখানে ছিল তাঁর বাগানবাড়িও। সেই সময়ের যশোর শহরের চেহারা আজকের মতো ছিল না। শহরের প্রান্তবর্তী বা অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি এলাকায় শিক্ষিত ও বিত্তশালী পরিবারের বাগানবাড়ি থাকা অস্বাভাবিক ছিল না। পিয়ারী মোহন গুহের বেজপাড়ার বাড়িটিও সম্ভবত তেমনই একটি আবাস ছিল।

কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই বাড়ির অস্তিত্ব ও সুনির্দিষ্ট অবস্থান হারিয়ে গেছে। বর্তমানে বেজপাড়ার কোন জায়গায় তাঁর বাড়ি বা বাগানবাড়ি ছিল, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। পুরোনো পৌরসভার নথি, জমির খতিয়ান, মানচিত্র কিংবা সমকালীন দলিল অনুসন্ধান করা গেলে হয়ত একদিন সেই হারিয়ে যাওয়া বাড়ির অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

তাঁর স্মৃতি অবশ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। যশোর শহরের বেজপাড়া এলাকায় এখনও রয়েছে পিয়ারী মোহন রোড। একটি শহরের রাস্তার নাম কখনও কখনও তার বিস্মৃত ইতিহাসের দরজা খুলে দেয়। পিয়ারী মোহন রোডও তেমন একটি স্মৃতিচিহ্ন। রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চলাচল করেন, কিন্তু সেই নামের পেছনে যে একজন আইনজীবী, পৌর প্রশাসক ও সংগঠক মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে, তা হয়ত অনেকেরই জানা নেই।
পিয়ারী মোহন গুহের একটি পুরোনো ছবিও পাওয়া গেছে। ছবিটির পেছনের তথ্য অনুযায়ী, এটি কলকাতার মারকুইজ স্ট্রিটের একটি স্টুডিওতে তোলা এবং সময়কাল ১৮৮৫ সাল। ছবিটি তাঁর ব্যক্তিগত ইতিহাসের একটি দুর্লভ দলিল। উনিশ শতকের একজন যশোরের নাগরিক, যিনি কলকাতায় আইন পেশায় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং একই সঙ্গে যশোরের নাগরিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— তাঁর সমকালীন আলোকচিত্র পাওয়া নিঃসন্দেহে মূল্যবান।

ছবিটির দিকে তাকালে কেবল একজন ব্যক্তির মুখ দেখা যায় না; দেখা যায় একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। ১৮৮৫ সালের কলকাতা তখন ব্রিটিশ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সেই শহরের মারকুইজ স্ট্রিটের কোনো স্টুডিওতে দাঁড়িয়ে যশোরের পিয়ারী মোহন গুহ তাঁর ছবি তুলেছিলেন। ছবিটি যেন যশোর ও কলকাতার মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত যাতায়াত এবং সামাজিক যোগাযোগেরও একটি দলিল।
যশোর পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর ভূমিকার বিষয়টিও নতুন করে অনুসন্ধানের দাবি রাখে। পৌরসভা তখন ছিল কেবল রাস্তা, নালা, আলো কিংবা পরিচ্ছন্নতার প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়; ঔপনিবেশিক আমলে স্থানীয় শিক্ষিত ও বিত্তশালী নাগরিকদের নেতৃত্বে আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার একটি নতুন পরিসরও তৈরি হচ্ছিল। সেই পরিসরের প্রথম সারির ব্যক্তিদের একজন ছিলেন পিয়ারী মোহন গুহ।
তাঁর জীবনের নানা দিক একসঙ্গে রাখলে যে চিত্রটি পাওয়া যায়, তা বেশ আকর্ষণীয়। একদিকে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী, অন্যদিকে যশোর পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান, একদিকে থিওসফিক্যাল সোসাইটির সংগঠক, অন্যদিকে এশিয়াটিক সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষিত নাগরিক; আবার যশোর শহরের বেজপাড়ায় তাঁর বাড়ি ও বাগানবাড়ি। অর্থাৎ তিনি ছিলেন এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে আধুনিক শিক্ষা, আইন, নাগরিক প্রশাসন এবং নতুন ধরনের বৌদ্ধিক চর্চার সঙ্গে যশোরকে যুক্ত করেছিলেন।

আজ তাঁর বাড়ির চিহ্ন নেই, তাঁর বাগানবাড়ির অবস্থানও বিস্মৃত। তাঁর উত্তরসূরিরা কোথায় ছড়িয়ে পড়েছেন, সেই তথ্যও এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু একটি রাস্তার নাম, কয়েকটি পুরোনো সরকারি ও সংগঠনগত নথি এবং ১৮৮৫ সালে কলকাতার একটি স্টুডিওতে তোলা একটি ছবি তাঁর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দিয়ে চলেছে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: