বাংলাদেশের মানুষের বাস্তব জীবনে সাপের সঙ্গে প্রথম পরিচয় সম্ভবত সাপ দেখে নয়, বর্ণপরিচয়ের বই খুলে। শিশুর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়- ‘অ-তে অজগর। অজগর ওই আসছে তেড়ে।’ সেই অজগর তখন শিশুর কল্পনার এক বিশাল প্রাণী। বয়স বাড়ে, বইয়ের অক্ষর পেরিয়ে মানুষ বাস্তব জীবনে প্রবেশ করে। তখন কখনও সত্যিই সাপের দেখা মেলে, কখনও সাপ থেকে যায় গল্প, লোককথা আর ভয়-রোমাঞ্চের জগতে।
বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে সাপের উপস্থিতি অবশ্য অনেক পুরোনো। মনসামঙ্গল থেকে লোকগাথা, গ্রামীণ বিশ্বাস থেকে মৃৎশিল্প, পটচিত্র থেকে মন্দিরের অলংকরণ- সাপ কখনও দেবতার প্রতীক, কখনও অমঙ্গলের, কখনও আবার রহস্য ও অলৌকিক শক্তির চিহ্ন। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সাপকে চোখের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে যে মানুষগুলো, তারা বেদে- বিশেষ করে সাপুড়ে বেদেরা।
কয়েকদিন আগে কালীগঞ্জের ঝনঝনিয়া থেকে যশোর সদরের মুরাদগড়ের দিকে আসছিলাম। ভৈরব নদের তীরে চোখে পড়ল কয়েকটি অস্থায়ী তাঁবু। নদীর পাশে যেন হঠাৎ গড়ে উঠেছে ছোট্ট এক জনপদ। কাছে গিয়ে বোঝা গেল, এরা বেদে। কিছুদিনের জন্য নদীর তীরে বসত গেড়েছে। নদীই তাদের পথ, নদীর তীরই তাদের অস্থায়ী ঠিকানা। এক জায়গায় বেশিদিন থাকা তাদের জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম নয়।
এই দৃশ্য আমাকে আবার সেই ছোটোবেলার ‘অ-তে অজগর’-এর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
বেদে শব্দটি উচ্চারণ করলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে নৌকা, নদী, ঝাঁপি, সাপ, বাঁশি, তাবিজ-কবজ, ভেষজ ওষুধ আর হাটের মাঝখানে মানুষের ভিড়। বাংলাদেশের বেদেরা ঐতিহ্যগতভাবে একটি ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী। তাদের অনেক দল নদীপথ ধরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করত এবং এখনও কিছু দল সেই জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। গবেষণায় তাদের নদীভিত্তিক ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বেদেদের ইতিহাস নিয়ে একক, সর্বসম্মত মত নেই। এখানেই তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়।
বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, বেদেরা সাধারণভাবে বাদিয়া বা বাইদ্যা নামেও পরিচিত। একটি প্রচলিত মত অনুযায়ী, ১৬৩৮ সালে আরাকান থেকে আসা বল্লাল রাজার সঙ্গে তারা ঢাকায় আসে এবং পরে বিক্রমপুরে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের আদি নাম ‘মনতং’ বলেও সেখানে উল্লেখ আছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও কিছু গবেষকের বক্তব্য এই ইতিহাসকে প্রশ্ন করেছে। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে ‘বাদিয়া’ বা অনুরূপ নামের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং কিছু প্রাচীন সূত্রে সাপ ধরা ও সাপের খেলার সঙ্গে এই জনগোষ্ঠীর সম্পর্কের ইঙ্গিত রয়েছে। ফলে বেদেদের ইতিহাসকে শুধু ১৬৩৮ সালে আরাকান থেকে আগমনের গল্প দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় কি না, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
অর্থাৎ বেদেদের ইতিহাস এখনও পুরোপুরি মীমাংসিত নয়। বরং নানা সময়ের সাহিত্য, ঔপনিবেশিক নথি, লোকস্মৃতি ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণার ভেতর দিয়ে তাদের পরিচয়টি তৈরি হয়েছে। গবেষক ঈধৎসবহ ইৎধহফঃ তাঁর ঞযব দইবফবং' ড়ভ ইবহমধষ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ‘বেদে’ নামটি গত প্রায় দুই শতকে বাংলা অঞ্চলের বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ ও সেবাভিত্তিক জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।
তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে নদীর সম্পর্কও বিস্ময়কর। বাংলাদেশের নদী তাদের কাছে শুধু যাতায়াতের পথ নয়, জীবিকার পথও। একসময় অনেক বেদে পরিবার নৌকাতেই বসবাস করত। কয়েকটি পরিবার মিলে দল, দল মিলে বড় বহর- এভাবেই চলত তাদের ভ্রাম্যমাণ জীবন। নদীর তীরে হাট বসলে সেখানে নৌকা ভিড়ত; বাজারে মানুষ জড়ো হলে শুরু হতো তাদের পসরা।
সাপের ঝাঁপি ছিল সেই পসারার সবচেয়ে রহস্যময় অংশ।
সাপুড়ের বাঁশির সুরে সাপ নাচে- এ দৃশ্য আমাদের লোকসংস্কৃতির এক অতি পরিচিত ছবি। কিন্তু প্রকৃতির বিজ্ঞান এখানে লোকবিশ্বাসের চেয়ে একটু আলাদা কথা বলে। সাপ মানুষের মতো বাতাসে ছড়িয়ে পড়া সুর শুনে নাচে না। বাঁশির শব্দে সাপকে ‘মোহিত’ করার ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। বরং সাপুড়ের শরীরের নড়াচড়া, বাঁশির দোল এবং সামনে থাকা বস্তুটির প্রতি সাপের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই দর্শকের চোখে ‘নাচ’ বলে মনে হয়। কিন্তু গ্রামীণ মানুষের কাছে তখন বিজ্ঞান নয়, বিস্ময়টাই বড়।
হাটের মাঝখানে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। মাঝখানে একজন সাপুড়ে। হাতে বাঁশি। সামনে ঝাঁপি। ধীরে ধীরে ঝাঁপির ঢাকনা ওঠে। বেরিয়ে আসে ফণা তোলা গোখরা। শিশুরা মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, বড়রা একটু দূরে সরে যায়, আবার কৌতূহলে সামনে এগিয়ে আসে। সাপুড়ে দুলতে দুলতে বাঁশি বাজায়। গোখরার ফণা দুলতে থাকে। বহু বেদে পরিবারের কাছে এটাই ছিল জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
সাপ ধরা, সাপের খেলা দেখানো, সাপের বিষ নিয়ে লোকজ চিকিৎসা, তাবিজ-কবজ, ভেষজ ওষুধ, শিংগা লাগানো, বানর বা জাদুর খেলা- বেদেদের ঐতিহ্যবাহী জীবিকার তালিকাটি ছিল বেশ দীর্ঘ। বাংলাদেশের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যেও সাপ ধরা, সাপের খেলা, সাপ বিক্রি, সর্পদংশনের চিকিৎসা, ভেষজ ওষুধ, তাবিজ-কবজসহ এসব পেশার উল্লেখ রয়েছে।
বেদেদের জীবনে নারীর ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে পসরা বিক্রি, ভেষজ ওষুধ, চুড়ি, প্রসাধনসামগ্রী কিংবা ছোটোখাটো গৃহস্থালি জিনিস বিক্রির সঙ্গে অনেক বেদেনী যুক্ত ছিলেন। পুরুষের সঙ্গে নারীরাও এই ভ্রাম্যমাণ অর্থনীতির অংশ ছিলেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ঐতিহ্যগত পেশা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেদেদের জীবিকাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ কারখানায় কাজ করছেন, কেউ ছোট ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন।
একসময় বাংলাদেশের বহু হাট-বাজার, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড কিংবা গাছতলায় দেখা যেত সাপুড়েদের আসর। কিন্তু সেই দৃশ্য ক্রমেই বিরল হয়ে যাচ্ছে। সাপের আবাসস্থল কমেছে, বাজারের বিনোদনের ধরন বদলেছে, আধুনিক চিকিৎসা ও বিনোদন ব্যবস্থা এসেছে, আর আইনগত পরিবর্তনও সাপকে কেন্দ্র করে পুরোনো পেশাকে সংকুচিত করেছে। সাভারের একসময়কার পরিচিত সাপের বাজারও ২০১২ সালের পর বন্ধ হয়ে যায়।
ফলে ভৈরব নদের তীরে দেখা সেই বেদে পরিবারগুলো একটি হারিয়ে যেতে বসা বাংলার ছবিও বহন করছে।
নদীর ধারে তাদের অস্থায়ী ঘর। হয়ত কিছুদিন পর সেই ঘর থাকবে না। তাঁবু গুটিয়ে যাবে। নৌকা কিংবা ভ্যানের পসরা নিয়ে তারা চলে যাবে অন্য কোনো হাটে, অন্য কোনো নদীর তীরে। নতুন জায়গায় আবার তৈরি হবে সাময়িক সংসার। তাদের জীবন যেন ঠিক নদীর মতো- কোনো স্থানে থেমে থাকে না।
আজকের শিশুরা হয়ত ‘অ-তে অজগর’ শিখছে আগের মতোই। কিন্তু সেই শিশুরা যখন একটু বড় হবে, তখন তাদের অনেকেই হয়ত আর হাটের মাঝখানে সাপুড়ের ঝাঁপি খুলতে দেখবে না। বাঁশির সুরে ফণা তোলা গোখরার সেই দৃশ্যও হয়তো একদিন বইয়ের ছবি, পুরোনো আলোকচিত্র কিংবা দাদু-নানুর গল্পে পরিণত হবে।


























