সোমবার ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরে থামছে না খাদ্যসেবাখাতের নৈরাজ্য, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

সালমান হাসান রাজিব

প্রকাশিত: ১৭:১০, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যশোরে থামছে না খাদ্যসেবাখাতের নৈরাজ্য, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

অস্বাস্থ্যকর, নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘর এবং কারখানার পরিবেশে জীবাণুদূষণের কারণে ঘটছে ‘ফুডবর্ন ইলনেস’ (খাদ্যবাহিত রোগ)। অন্যদিকে, খাবারে ক্ষতিকর উপকরণ ও ভেজাল মেশানোর ফলে ক্যানসারসহ নানা মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে জেলাজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে দেড় শতাধিক অভিযানে অর্ধকোটি টাকারও বেশি জরিমানা করা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। জরিমানা গুনেও ফের একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়ানোর নজির রয়েছে। ফলে যশোরে খাদ্যশিল্প ও খাদ্যসেবা খাতে চলমান নৈরাজ্যে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে।

ফুটপাতের খাবারের দোকান থেকে অভিজাত হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বেকারি—সবখানেই চলছে অনিয়ম। নামকরা ও জনপ্রিয় খাবারের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা যেন সেই প্রবাদের মতো—‘প্রদীপের নিচে অন্ধকার’। খাবার পরিবেশনের স্থান ঝকঝকে, তকতকে এবং আধুনিক আসবাব ও ঝলমলে আলোকসজ্জায় সাজানো হলেও ‘কিচেন’ বা রান্নাঘরের অবস্থা বেহাল। অভিযানে আবর্জনা ও ড্রেনের পাশে খাদ্যসামগ্রী এবং আগের দিনের রান্না করা খাবার কাঁচা মাছ-মাংসের সঙ্গে সংরক্ষণের দৃশ্য ধরা পড়েছে।

এদিকে, মিষ্টি তৈরির কারখানায়ও নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের চিত্র প্রায়ই ধরা পড়ছে। জনপ্রিয় হোটেলে আগের দিনের বাসি খাবারের সঙ্গে পরের দিন রান্না করা ভাত-তরকারি মেশানোর ঘটনাও ঘটছে। সব মিলিয়ে খাদ্য সংরক্ষণ, তৈরি ও বিক্রিসহ বিপণনের বিভিন্ন স্তরেই চলছে অনিয়ম। আর শাস্তি হিসেবে জরিমানা গুনেও থামছেন না ব্যবসায়ীরা।
এমন পরিস্থিতিতে আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি খাদ্যে অনিয়ম রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভোক্তা ও ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দিয়েছেন চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, আইনজীবী ও রাজনীতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

হোটেল-রেস্তোরাঁর রান্নাঘরের নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যে ‘মাইক্রোবিয়াল কনটামিনেশন’ বা জীবাণুদূষণের ঝুঁকি থাকে বলে জানান যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানভীর আহমেদ। তিনি বলেন, এর ফলে ‘ফুডবর্ন ইলনেস’ বা খাদ্যবাহিত রোগ হতে পারে। দীর্ঘদিন এ ধরনের দূষিত খাবার গ্রহণে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। খাবারের মাধ্যমে নিউরোটক্সিনসহ ক্ষতিকর উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনুমোদনহীন উপাদান যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অনুমোদিত ফুড কালার বা অন্যান্য উপাদানও নির্ধারিত মাত্রার বেশি ব্যবহার করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তার মতে, ভেজাল ও ক্ষতিকর উপাদান দীর্ঘদিন গ্রহণে লিভার, কিডনি ও হরমোন ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এবং ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতি প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

ক্যানসারঝুঁকির উপাদান মিশ্রণ:
যশোরের চৌগাছা শহরের কুঠিপাড়া মোড়ের আব্বাস বেকারির পাউরুটির নমুনা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ভ্রাম্যমাণ ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় পাউরুটিতে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন উপাদান—পটাশিয়াম ব্রোমেটের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। পাশাপাশি বেকারিতে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্যসামগ্রী তৈরির প্রমাণ মেলে। এসব অনিয়মের দায়ে বেকারি মালিককে ৭ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

নামকরা হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও অনিয়ম:
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে উঠে এসেছে—নামিদামি ও জনপ্রিয় খাবারের প্রতিষ্ঠানেও নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য তৈরি ও সংরক্ষণের চিত্র। শহরের আরএন রোডের ক্যাফে নূর হোটেলে অভিযানে ফ্রিজে বিক্রির জন্য বাসি খাবার ও বাসি মাংস নোংরা পরিবেশে সংরক্ষণ, রান্নাঘরের পাশে প্রচুর তেলাপোকার উপস্থিতি এবং রান্নায় ব্যবহারের জন্য অনুমোদনহীন ক্ষতিকর ‘মোগলাই সেন্ট’, ‘কেওড়া জল’ ও ‘গোলাপ জল’ পাওয়ার প্রমাণ মেলে। একই সঙ্গে বিরিয়ানি তৈরির উপকরণে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ না থাকা এবং বারবার পোড়া তেল ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া যায়। এসব অনিয়মের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এমকে রোডের পাঁচফোড়ন হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অভিযানে নোংরা ফ্রিজে বাসি গ্রিল ও কাঁচা মুরগির মাংস একসঙ্গে সংরক্ষণ এবং মেয়াদহীন কাসুন্দি, সস ও মেওনেজ পাওয়া যায়। অভিযোগ ছিল, গ্রিলের জন্য ব্যবহৃত মুরগির মাংস সংরক্ষণ করে পরদিন বিক্রি করা হচ্ছিল। মাংস সংবাদপত্রের কাগজে মোড়ানো অবস্থায় রাখায় কাগজের কালি খাবারে মিশে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির আশঙ্কাও ছিল। নষ্ট খাবার ধ্বংসের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

লালদীঘির পাড়ের ভোজন বাড়ি রেস্তোরাঁয় বাইরে থেকে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখা গেলেও রান্নাঘরে গিয়ে পাওয়া যায় ভিন্ন চিত্র। সেখানে মুরগির গ্রিলের পাশে ঝাড়ু রাখা, নোংরা পরিবেশ এবং গ্রিলের মাংস অস্বাস্থ্যকরভাবে সংরক্ষণের মতো অনিয়ম ধরা পড়ে। খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণে এসব অনিয়মের দায়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিককে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
নাজমা হোটেলের রান্নাঘরে অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সন্ধান পাওয়া যায়। আগের দিনের পচা ভাত টাটকা ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছিল হোটেলটিতে। রুটি ও পরোটার খামিরে অনুমোদনহীন ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল ব্যবহারের প্রমাণ পান কর্মকর্তারা। হোটেলের ভেতরের আবর্জনার স্তূপ ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার সংরক্ষণের দৃশ্যও অভিযানে ধরা পড়ে।

মুজিব সড়কে ঝটপট ফাস্টফুডে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণের অভিযোগে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সড়কের আড্ডাখানায় দুই দফায় অভিযানে অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘর, পচা-বাসি খাবার ও অনিরাপদ সংরক্ষণের চিত্র ধরা পড়ে। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া মিষ্টি ও বেকারি খাদ্যসামগ্রী বিক্রিকারী প্রতিষ্ঠান বনফুল পচা-বাসি দই-মিষ্টি সংরক্ষণের দায়ে একাধিকবার জরিমানা গুনলেও একই ধরনের অনিয়ম থেকে বের হতে পারেনি।

একই প্রতিষ্ঠানে একাধিকবার জরিমানা:
খাদ্যপণ্যের মান ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও যশোরে একই প্রতিষ্ঠানকে বারবার জরিমানা করার ঘটনা ঘটছে। জরিমানার পরও কিছু প্রতিষ্ঠানে ফের একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়ছে। বনফুল অ্যান্ড কোংয়ের মণিরামপুর শাখায় ২০২৬ সালের ১৫ জুন অভিযানে খাদ্যপণ্যের মোড়কে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ না থাকা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য সংরক্ষণসহ বিভিন্ন অনিয়মে প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর মাত্র ৩৫ দিন পর, ২০ জুলাই, একই শাখায় ফের অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সেবারও তারিখবিহীন খাদ্যপণ্য ও নষ্ট দই সংরক্ষণ-বিক্রির অনিয়ম ধরা পড়ে। দুই দফায় প্রতিষ্ঠানটিকে মোট ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

একইভাবে, যশোর শহরের আড্ডাখানা রেস্টুরেন্টেও একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৩ জুন পরিচালিত অভিযানে পচা-বাসি খাবার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য সংরক্ষণের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগে একই প্রতিষ্ঠানে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের মাধ্যমে মামলা হয়েছিল। এ ছাড়া বিসমিল্লাহ মধু ট্রেডিং, শেখহাটির বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা ও জরিমানার তথ্য পাওয়া যায়। সর্বশেষ ২৯ এপ্রিল ২০২৬ অভিযানে কৃত্রিমভাবে মধু তৈরির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিককে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
সব মিলিয়ে যশোরে বিভিন্ন প্রান্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অভিযানে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার ছাড়াও পচা-বাসি ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার সংরক্ষণ-বিক্রি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য তৈরি, খাবারে নিষিদ্ধ রং ও উপকরণ মেশানো এবং খাদ্যপণ্যের প্যাকেটজাতকরণ ও মূল্যতালিকায় অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের উপপরিচালক সেলিমুজ্জামান জানান, ভেজাল, ক্ষতিকর উপাদান মিশ্রণসহ খাদ্যে বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রায় দেড়শ অভিযানে অর্ধকোটি টাকার বেশি জরিমানা আদায় করা হয়েছে। খাদ্যে অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁর দপ্তর কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
যশোরের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা আব্দুর রহমান জানান, চলতি বছরে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে ১৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযানে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া যশোরে মিনি ল্যাবে ৩৭৭টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

যশোরের সিভিল সার্জন মাসুদ রানা জানান, ভেজাল খাদ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। ভেজাল ও খাদ্যে অনিয়ম রোধে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খাদ্যে ভেজাল ও অনিয়ম রোধ করা সম্ভব।
যশোর আদালতের আইনজীবী শাহরিয়ার বাবু বলেন, খাদ্যে ভেজাল ও অনিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনে শাস্তির বিধান থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই অপরাধে বারবার জরিমানা করেও যদি অনিয়ম বন্ধ না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনে থাকা কঠোরতর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু জরিমানা আদায় নয়, অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: