বুধবার ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চার্লীগঞ্জের হাট

খুলনার এক হারিয়ে  যাওয়া জনপদের গল্প

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৫:৪৭, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খুলনার এক হারিয়ে  যাওয়া জনপদের গল্প

আজকের ব্যস্ত খুলনা শহরের ভিড়, রেললাইন, বাজার আর জনবসতির আড়ালে হারিয়ে গেছে পুরোনো জনপদের গল্প- চার্লীগঞ্জ। একসময় যেখানে ছিল সাহেবের কুঠি, নদীর পাড়ে বসত হাট, আর সেই হাটকে ঘিরেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল একটি বসতি। সময়ের প্রবাহে চার্লীগঞ্জের সেই পুরোনো চেহারা হারিয়ে গেলেও নামটি এখনো বহন করে চলেছে ঔপনিবেশিক খুলনার এক বিস্মৃত অধ্যায়ের স্মৃতি।

চার্লীগঞ্জের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোম্পানি আমলের লবণ ব্যবসা। ১৭৭২ সালে যশোরে কোম্পানি শাসন প্রতিষ্ঠার পর রায়মঙ্গল লবণ এজেন্সির সদর দপ্তর ১৭৮১ সালে বর্তমান খুলনা শহরের কয়লাঘাটায় স্থানান্তর করা হয়। এই লবণ এজেন্সির ডেপুটি ছিলেন জনৈক চার্লস- স্থানীয় মানুষের মুখে যিনি সংক্ষেপে ‘চার্লী সাহেব’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

খুলনা স্টেশনের উত্তর দিকে চার্লী সাহেব তাঁর কুঠি স্থাপন করেছিলেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। কুঠির পূর্বদিকে নদীর পাড়ে তিনি একটি হাট বসান। সাহেবের কুঠি আর তার পাশে নদীর তীরে গড়ে ওঠা সেই হাটকে ঘিরেই জায়গাটির নাম হয়ে যায় ‘চার্লীগঞ্জ’। হাটটি পরিচিত ছিল ‘চার্লীগঞ্জের হাট’ কিংবা ‘সাহেবের বাজার’ নামেও।
তবে চার্লীগঞ্জ নামের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসে আরেকটি মতও রয়েছে। এই মত অনুযায়ী, খালিশপুরের পূর্বদিকে- বর্তমান রেল এলাকা-সহ বিস্তৃত অঞ্চলে- জনৈক চোলেট সাহেবের একটি নীলকুঠি ছিল। কুঠির কাছেই তিনি একটি হাট প্রতিষ্ঠা করেন। পরে লোকমুখে চোলেট সাহেবের নাম ভুল করে চার্লী সাহেব হিসেবে প্রচলিত হয় এবং তাঁর নামেই হাটটির নাম হয় ‘চার্লীগঞ্জের হাট’।

আবার ১৮০২ সালে শহরের পাশে জনৈক চার্লসের নীলকুঠি স্থাপনের কথাও স্থানীয় ইতিহাসে পাওয়া যায়। খুলনার নীলচাষের ইতিহাসও এর কাছাকাছি সময়ের। ১৮০১ সালে দৌলতপুরে প্রথম নীলচাষ এবং নীলকুঠি স্থাপন করেন জনৈক ইংরেজ এণ্ডারসন। ফলে চার্লীগঞ্জের ইতিহাসের সঙ্গে খুলনায় কোম্পানি আমলের লবণ ব্যবসা, নীলচাষ এবং ইউরোপীয় বণিকদের কুঠি স্থাপনের ইতিহাসও জড়িয়ে আছে।

চার্লী সাহেবের নাম, তাঁর প্রকৃত পেশা কিংবা তিনি আদৌ চার্লস ছিলেন, নাকি চোলেট- এসব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয়ে স্থানীয় ইতিহাসে প্রায় কোনো দ্বিমত নেই। তাঁর কুঠি ছিল এবং সেই কুঠির পাশে হাট বসেছিল। কয়েক দফা সংস্কারের পর সেই পুরোনো কুঠিবাড়িটি পরবর্তীকালে রেলওয়ের কর্মচারীদের বিশ্রামাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা যায়। এটিই ছিল এলাকার প্রথম পাকা বাড়ি বলেও স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
কল্পনা করলে সেই সময়ের চার্লীগঞ্জকে আজকের খুলনার সঙ্গে মেলানো কঠিন। চারপাশে তখন এত জনবসতি ছিল না। মহকুমা সদরের কাছাকাছি বসতিগুলোর মধ্যে সদর থেকে আধমাইলের সামান্য বেশি দূরে চার্লীগঞ্জের হাটই ছিল উল্লেখযোগ্য বাজার। বর্তমান বড়বাজারের মুরগিহাটের বটগাছতলায় সপ্তাহে দুদিন- শনিবার ও বুধবার- হাট বসত। হাটের কেন্দ্র এবং আশপাশের এলাকা তখন ‘চার্লীগঞ্জ’ কিংবা ‘সাহেবের হাট’ নামে পরিচিত ছিল।
কিন্তু চার্লীগঞ্জ তখনো বড় কোনো ব্যবসা কেন্দ্র হয়ে ওঠেনি। রেললাইন আসেনি, স্টিমার সার্ভিসও চালু হয়নি। নদীপথই ছিল যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের প্রধান অবলম্বন। চার্লীগঞ্জ ছিল মূলত স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন মেটানোর সাধারণ হাট। বড় ব্যবসার জন্য মানুষকে যেতে হতো আরও দূরে।

চার্লীগঞ্জের প্রায় এক মাইল পূর্বদিকে, ভৈরব নদীর ওপারে ছিল সেনের বাজার। সে সময় সেটিই ছিল কাছাকাছি অঞ্চলের একটি বিখ্যাত ব্যবসা কেন্দ্র। নদীর ওপারের এই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে নানা ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেন হতো। কিন্তু ভৈরব নদ ছিল সহজ নদী নয়। বর্ষায় তার রূপ যেমন ভয়ংকর হয়ে উঠত, তেমনি পারাপারের ঝুঁকি এবং দূরত্বের কারণে এদিকের মানুষ বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া সেনের বাজারে যেতে চাইত না।
চার্লীগঞ্জের হাট প্রতিষ্ঠার আগেও খালিশপুরের পাশে চরের হাট এবং বয়রার হাট ছিল এলাকার প্রধান বাজার। নদী, চর, নৌকা আর হাট- এই চারটি উপাদানই তখনকার খুলনার জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। গ্রামের মানুষ নৌকায় করে পণ্য নিয়ে আসত, নদীর পাড়ে হাট বসত, আর সেই হাটকে ঘিরে ধীরে ধীরে তৈরি হতো নতুন বসতি।

আজকের খুলনা শহরের যে অঞ্চল একসময় চার্লীগঞ্জ নামে পরিচিত ছিল, সেখানে তখন শহরের কোলাহল ছিল না। ছিল নদীর স্রোত, কাঁচা পথ, নৌকার আনাগোনা, সাহেবের কুঠি আর সপ্তাহে দু-দিন বসা হাট। কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা পণ্য নিয়ে আসতেন; ক্রেতারা আশপাশের গ্রাম থেকে হাটে জড়ো হতেন। হাটের দিনেই যেন একটু প্রাণ ফিরে পেত নির্জন জনপদটি।
এরপর খুলনার ইতিহাসে আসে পরিবর্তনের সময়। রেললাইন স্থাপিত হলো, স্টিমার সার্ভিস চালু হলো, নদীপথের সঙ্গে যুক্ত হলো আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা। শহরের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়তে থাকল। নতুন নতুন বাজার ও ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে উঠতে লাগল। একসময় যে চার্লীগঞ্জ ছিল সাধারণ একটি স্থানীয় হাট, তার চারপাশেও ক্রমে নগরজীবনের বিস্তার ঘটতে শুরু করল।

শহর বড় হলো, রাস্তা হলো, রেল এলাকা গড়ে উঠল, পুরোনো হাটের চেহারা বদলে গেল। কিন্তু একটি জায়গার নাম কখনো কখনো তার অতীতকে আঁকড়ে থাকে। ‘চার্লীগঞ্জ’ তেমনই একটি নাম। নামটির ভেতরে আজও যেন শোনা যায় বহুদিন আগের হাটের হাঁকডাক, নদীর ঢেউ, নৌকার বৈঠার শব্দ এবং সাহেবের কুঠির পাশ দিয়ে মানুষের যাতায়াতের স্মৃতি।

চার্লীগঞ্জের গল্প আসলে একটি হাটের গল্পের চেয়েও বড়। এটি খুলনা শহরের গড়ে ওঠার প্রাথমিক ইতিহাসের একটি ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একটি কুঠি, নদীর পাড়ে একটি হাট, কয়েকজন সাহেব, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের আনাগোনা- এই সামান্য ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়েই একদিন তৈরি হয়েছিল একটি জনপদের পরিচয়।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: