রোববার ৩০ আগস্ট ২০২৬

১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কপোতাক্ষের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা  ১৭৬ বছরের পুরোনো সেতুর শেষ স্তম্ভ

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৪:০০, ২৯ আগস্ট ২০২৬

কপোতাক্ষের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা  ১৭৬ বছরের পুরোনো সেতুর শেষ স্তম্ভ

বিগত যৌবনা কপোতাক্ষ। একসময় যে নদী ছিল প্রমত্ত, স্রোতস্বিনী, আজ তার বুকজুড়ে মৃতপ্রায়। সেই নদীর এক প্রান্তে পানির ওপর এখনও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে একটি ইটের স্তম্ভ। মাঝখানে ধসে পড়া অংশটি স্তম্ভটিকে যেন দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। সময়ের ক্ষতচিহ্ন শরীরে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্তম্ভটি আজও পথিকের মনে প্রশ্ন জাগায়-কিসের ধ্বংসাবশেষ এটি? কে নির্মাণ করেছিলেন? কেনই বা নদীর বুকে এমন একটি স্থাপনা তৈরি হয়েছিল?

কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই এসব প্রশ্নের উত্তর অজানা। চৌগাছার প্রবীণদের কেউ কেউ শুধু বলেন, এটি ‘সাহেবদের বানানো ব্রিজের’ অবশিষ্ট অংশ। এর বেশি ইতিহাস অনেকেরই জানা নেই। অথচ কপোতাক্ষের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই ইটের স্তম্ভের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের সড়ক যোগাযোগ, নীলকরদের স্বার্থ, মাঝিদের প্রতিবাদ এবং একটি ঐতিহাসিক সেতু নির্মাণের রক্তাক্ত কাহিনি।
বাংলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে যাওয়ার পর চৌগাছার গুরুত্বও বাড়তে থাকে। যশোরের সঙ্গে নদীয়া ও কৃষ্ণনগরের সড়ক যোগাযোগ নির্বিঘ্ন করার প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই সময় যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন মি. বেনফোর্ট। ১৮৫০ সালে তিনি চৌগাছায় কপোতাক্ষ নদের ওপর একটি সেতু নির্মাণ করেন। একই সময়ে তাঁর উদ্যোগে যশোর-চৌগাছা সড়ক নির্মাণের কাজও শুরু হয়।

বেনফোর্ট ১৮৫০ সালে যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত জেলায় কর্মরত ছিলেন। জেলার যোগাযোগব্যবস্থা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকার কথা স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়। চৌগাছা ছিল তাঁর বিশেষ পছন্দের জায়গা। চিনি কারখানার মালিক ও নীলকরদের অনুরোধে তিনি যশোর-চৌগাছা সড়ক নির্মাণে উদ্যোগী হন।
সড়কটি চৌগাছা থেকে মহেশপুর ও হাসখালী হয়ে তৎকালীন নদীয়া জেলার সদর এবং বিভাগীয় শহর কৃষ্ণনগরের সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যদিকে আরেকটি সড়ক পুড়োপাড়া হয়ে বাগদা-বনগাঁর দিকে গিয়ে ঐতিহাসিক যশোর রোডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। ফলে চৌগাছা তখন শুধু স্থানীয় জনপদ নয়, বৃহত্তর যোগাযোগব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত হয়।

এই যোগাযোগব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর একটি ছিল কপোতাক্ষের ওপর নির্মিত সেতুটি। তবে সেতু নির্মাণ সহজে মেনে নেয়নি স্থানীয় মাঝি সম্প্রদায়। তাঁদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, সেতুটি নির্মিত হলে নৌযান চলাচল ও তাঁদের জীবিকার ওপর প্রভাব পড়বে। আবার প্রচার ছিল—সেতুটি সাধারণ মানুষের জন্য নয়, ‘সাহেবদের’ যাতায়াতের জন্য তৈরি হচ্ছে। ফলে মাঝিদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষেরও একাংশ যুক্ত হয়ে যায়।
নির্মাণাধীন সেতুতে কয়েক দফা হামলার ঘটনাও ঘটে। সেতু ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এ নিয়ে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত নানা বাধা ও বিরোধিতা অতিক্রম করে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হয়।
কিন্তু কপোতাক্ষের স্রোতের কাছে সেই স্থাপনার আয়ু দীর্ঘ হয়নি। নির্মাণের মাত্র তিন বছরের মাথায়, প্রবল বর্ষা ও নদীর স্রোতের তোড়ে সেতুটি ভেঙে পড়ে। এরপর আর সেটি পুনর্র্নিমাণ করা হয়নি। কালের প্রবাহে সেতুর অধিকাংশ অংশই হারিয়ে যায় নদী ও জনপদের স্মৃতি থেকে।

অতিক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১৭৬ বছর। সেই প্রমত্ত কপোতাক্ষও আজ আর নেই। একসময় যে নদী সেতুটিকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, আজ তার বুকেই জেগে আছে সেই সেতুর পশ্চিম প্রান্তের একটি স্তম্ভ। স্তম্ভটির কাছ থেকে সংযোগ সড়কের সামান্য অংশের অস্তিত্বও দেখা যায়। তবে পূর্বপ্রান্তে সেতুটির কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন আর অবশিষ্ট নেই।
চৌগাছায় নতুন কোনো মানুষ গেলে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো ইটের স্তম্ভটি দেখে বিস্মিত হন। আশপাশের মানুষের কাছে জানতে চান এর পরিচয়। প্রবীণরা স্মৃতির ভাঁজ খুলে বলেন—‘শুনেছি, সাহেবদের বানানো ব্রিজ।’ কিন্তু কে সেই সাহেব, কখন সেতু হয়েছিল, কেন হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

মি. বেনফোর্টও আজ অনুপস্থিত। তাঁর নির্মিত সড়ক ও সেতুর অধিকাংশই সময়ের গর্ভে বিলীন। কেবল কপোতাক্ষের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ভাঙা ইটের স্তম্ভ যেন সাক্ষ্য দিয়ে চলেছে সেই সময়ের।
এই পুরোনো সেতু চৌগাছার যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তনের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক আমলের উন্নয়নচিন্তা ও স্বার্থের ইতিহাস, স্থানীয় মানুষের প্রতিরোধের ইতিহাস এবং কপোতাক্ষের বদলে যাওয়ারও সাক্ষী। 
মহাকাল একদিন হয়তো এই শেষ স্তম্ভটিকেও মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে। তখন কপোতাক্ষের তীরে দাঁড়িয়ে আর কেউ প্রশ্ন করবে না—‘এটি কিসের ধ্বংসাবশেষ?’ ইতিহাসের একটি অধ্যায়ও হয়তো তখন হারিয়ে যাবে নদীর পলির নিচে।
 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ: