ইংরেজরা কলকাতায় নিজেদের শাসন ও প্রশাসনিক কাঠামো শক্ত করে গুছিয়ে বসার পর খুব দ্রুতই বুঝতে পেরেছিল, এ দেশ শাসন করতে হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটা অংশকে নিজেদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। অফিস-আদালত, কাছারি এবং বিচার ব্যবস্থায় কাজের জন্য ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি স্থানীয় ভাষা ও আইন-কানুন জানা শিক্ষিত মানুষের প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন থেকেই কলকাতার বিভিন্ন স্থানে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করে। তবে মুসলমানদের জন্য উচ্চতর শিক্ষা এবং বিশেষ করে ইসলামি আইন বিষয়ে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও তখন ক্রমেই সামনে আসছিল।
এই প্রেক্ষাপটেই কলকাতায় আধুনিক মাদ্রাসা শিক্ষার সূচনা। ১৭৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কয়েকজন শিক্ষিত মুসলমান তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁরা জানান, মজিদউদ্দীন নামে একজন পণ্ডিতের সন্ধান তাঁরা পেয়েছেন। তাঁকে কেন্দ্র করে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা গেলে কলকাতার মুসলমান ছাত্ররা আইনসহ প্রয়োজনীয় বিষয়ে শিক্ষা লাভ করতে পারবে এবং পরবর্তীকালে সরকারের প্রশাসনিক ও বিচারকার্যে সহায়তা করতে পারবে।
ওয়ারেন হেস্টিংস প্রস্তাবটিতে সম্মতি দেন। মজিদউদ্দীনকে মুসলমানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। মাদ্রাসা চালানোর জন্য হেস্টিংস নিজ উদ্যোগে মাসে ৬২৫ টাকা ব্যয় করতেন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির সূচনালগ্নে সরকারি কাঠামোর বাইরে ব্যক্তিগত অর্থেই এর ব্যয় নির্বাহ করা হয়েছিল।
পরে মাদ্রাসার জন্য একটি স্থায়ী ভবন নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। হেস্টিংস কলকাতার বৈঠকখানার কাছে পদ্মপুকুর এলাকায় জমি কেনার উদ্যোগ নেন এবং জমিটির জন্য ৫ হাজার ৬৪১ টাকা ব্যয় করেন। কয়েক মাস নিজের অর্থে মাদ্রাসা চালানোর পর তিনি কোম্পানির বোর্ডের কাছে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেন। মাদ্রাসাটি যাতে নিয়মিত সরকারি অর্থে পরিচালিত হতে পারে, সে জন্য বিলেতে পর্যন্ত চিঠিপত্র চালাচালি হয়। হেস্টিংস এক বছরের মাদ্রাসা পরিচালনার ব্যয় বাবদ ১৫ হাজার ২৫১ টাকা এবং পদ্মপুকুরের জমির মূল্য বাবদ আরও ৫ হাজার ৬৪১ টাকা দেওয়ার জন্য বোর্ডের কাছে অনুরোধ জানান।
এভাবেই কলকাতার মাদ্রাসাটি ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে থাকে। এটি শুধু মুসলমান ছাত্রদের জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না; ব্রিটিশ শাসনের প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থার প্রয়োজনের সঙ্গেও এর প্রতিষ্ঠার সম্পর্ক ছিল গভীর। বিশেষ করে মুসলিম আইন, আরবি ও ফারসি ভাষা এবং ইসলামি জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষিত ব্যক্তিদের তখন কোম্পানি সরকারের বিচার ও প্রশাসনিক কাজে প্রয়োজন হতো।
তবে পদ্মপুকুরের প্রথম অবস্থানটি মাদ্রাসার জন্য উপযুক্ত ছিল না। জায়গাটি ছিল অস্বাস্থ্যকর এবং শিক্ষার্থীদের বসবাস ও পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশও সেখানে ছিল না। ফলে মাদ্রাসাটিকে কলকাতার মুসলমান-প্রধান এলাকা কলিঙ্গায় সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বর্তমানের ওয়েলেসলি স্কোয়ার এলাকার সঙ্গে এই স্থানটির ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে।
১৮২৪ সালে মাদ্রাসার নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সমকালীন সংবাদপত্র সমাচার দর্পণ-এও সেই নির্মাণের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮২৪ সালের ২৪ জুলাই প্রকাশিত পত্রিকায় লেখা হয়- “সংপ্রতি শুনা গেল ১৫ জুলাই বৃহস্পতিবার শহর কলিকাতাতে এক মহম্মদী মদরসা অর্থাৎ পাঠশালার মূল প্রস্তব সংস্থাপন হইয়াছে।” এই সংবাদ থেকে বোঝা যায়, কলকাতায় মুসলমানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ততদিনে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।
কলকাতা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা বাংলার শিক্ষা-ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এর আগে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে মক্তব, মাদ্রাসা ও মুসলিম শিক্ষাকেন্দ্র ছিল এবং মধ্যযুগ থেকেই ধর্মীয় ও আরবি-ফারসি শিক্ষার ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। কিন্তু কলকাতায় ১৭৮০ সালে যে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটি ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসা শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।
পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠান কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা নামে পরিচিত হয় এবং বাংলার মুসলিম শিক্ষা ও আইন শিক্ষার ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নেয়। একদিকে ব্রিটিশ সরকার নিজেদের প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাতে শিক্ষিত মুসলমান কর্মী তৈরি করতে চেয়েছিল, অন্যদিকে এই প্রতিষ্ঠান থেকেই বহু মুসলমান শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। ফলে ঔপনিবেশিক শাসকের প্রশাসনিক প্রয়োজন এবং বাংলার মুসলমান সমাজের শিক্ষার প্রয়োজন- দুইয়ের সংযোগস্থল হয়ে উঠেছিল কলকাতা মাদ্রাসা।
প্রায় আড়াইশ বছর পর আজ পেছনে তাকালে দেখা যায়, ১৭৮০ সালের সেই উদ্যোগ বাংলার মুসলমানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতিহাসে এটি ছিল এক নতুন যুগের সূচনা। কলকাতার মাটিতে প্রতিষ্ঠিত সেই মাদ্রাসাই পরবর্তী সময়ে আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলায় আধুনিক মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাস তাই কলকাতার সেই ১৭৮০ সালের উদ্যোগকে বাদ দিয়ে লেখা সম্ভব নয়।


























