শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২৬

৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যে সড়ক ধরে বদলে গেছে  যশোরের যোগাযোগের ইতিহাস

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১২:৩১, ১৫ আগস্ট ২০২৬

যে সড়ক ধরে বদলে গেছে  যশোরের যোগাযোগের ইতিহাস

যশোর-বেনাপোল সড়কের সাথে জড়িয়ে আছে যশোরের যোগাযোগব্যবস্থার দীর্ঘ ইতিহাস, জমিদারদের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ, ব্রিটিশ আমলের সড়ক নির্মাণ, রেলপথের আগমন এবং মোটরযুগের সূচনার গল্প। আজ যে সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন ছুটে চলে, সেই পথের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু পুরোনো স্মৃতি, কিংবদন্তি ও হারিয়ে যাওয়া জনপদের চিহ্ন।


অনেকে মনে করেন, যশোর-বেনাপোল সড়কের একটি অংশ গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত শের শাহের আমলে নির্মিত হয়েছিল। ইতিহাসের প্রচলিত বয়ানে শের শাহ সূরির নির্মিত দীর্ঘ সড়কব্যবস্থার সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগ পথের সম্পর্কের কথাও বলা হয়। পরে যশোরের বগচরের জমিদার কালী পোদ্দার এই পথের সংস্কার ও পুনর্র্নিমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।


কালী পোদ্দারকে ঘিরে প্রচলিত আছে একটি মর্মস্পর্শী কাহিনি। তাঁর মা গঙ্গাস্নানে যেতে চাইতেন। মায়ের সেই ইচ্ছা পূরণ করতেই তিনি দীর্ঘ পথ নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেন। শুধু রাস্তা নির্মাণ নয়, পথিকের সুবিধার কথাও তিনি ভেবেছিলেন। রাস্তার দুই পাশে দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগানো হয়েছিল, যাতে পথিকেরা রোদ থেকে আশ্রয় পান। ফলে রাস্তা হয়ে উঠেছিল শুধু যাতায়াতের পথ নয়, ছায়াঘেরা এক জনপথও।


পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শাসনামলে যশোরের যে-সব গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা পাকা করা হয়, এই সড়ক ছিল তার অন্যতম। ১৮৬৬ থেকে ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে যশোর থেকে বনগাঁ পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়। একই সময় কলকাতার সঙ্গে যশোরের রেল যোগাযোগ স্থাপনের কাজও এগিয়ে যায়। সড়ক ও রেল—দুই যোগাযোগব্যবস্থার বিকাশই যশোরকে বৃহত্তর বাংলার সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করে।
সড়কটি তখন শুধু যাতায়াতের পথ ছিল না, ছিল মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যশোর শহর থেকে বনগাঁগামী যাত্রীরা যে জায়গা থেকে বাসে উঠতেন, সেই স্থানটির নাম আজ আর নেই। যশোর শহরের ঈদগাহ ময়দানের পূর্ব পাশ থেকে বনগাঁর বাস ছাড়ত। ফলে ১৯৪৭ সালের আগে ঈদগাহ ময়দানের মোড়, অর্থাৎ বর্তমান উকিলবার মোড়, পরিচিত ছিল ‘বনগাঁ বাসস্ট্যান্ড’ নামে।


নামটি এখন ইতিহাসের পাতায়। বাসস্ট্যান্ডও নেই। কিন্তু শহরের পুরোনো মানুষের স্মৃতিতে সেই জায়গাটি আজও যেন একটি জীবন্ত ছবি- সামনে বাস দাঁড়িয়ে আছে, যাত্রীরা গন্তব্যের অপেক্ষায়, আর বনগাঁর পথে ধুলো উড়িয়ে ছুটে যাচ্ছে বাস।
যশোরে মোটরযুগের সূচনাও খুব বেশি পুরোনো নয়। ১৯৩৫-৩৬ সালের দিকে যশোর-ঝিনাইদহ সড়কে মোটর বাস সার্ভিস বা মোটর সিন্ডিকেট চালু হয়। এর আগে এই অঞ্চলের মানুষের দূরপাল্লার যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। ব্রিটিশ আমলে রেলপথ নির্মিত হওয়ার পর রেল যোগাযোগও মানুষের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। কিন্তু মোটরবাসের আগমন যাতায়াতের ধরনে এনে দেয় নতুন পরিবর্তন।
তবে যশোর-বনগাঁ সড়কে বাস চলাচল শুরু হয়েছিল এরও আগে। স্থানীয় ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩০ সালের আগেই এই পথে ‘মায়ের দান’ নামে কয়েকটি বাস চলত। বাসটির মালিক ছিলেন গোবরাপুরের মণীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। নামটির মধ্যেও যেন সে সময়ের সামাজিক আবেগের ছাপ রয়েছে।
বাস চলাচল শুরু হলেও নদী ছিল বড় বাধা। ঝিকরগাছা, নাভারণ ও হরিদাসপুর এলাকায় নাওভাঙ্গা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সড়ক যোগাযোগকে কার্যকর করতে এসব স্থানে সেতু নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, এসব সেতু নির্মাণে অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন কালীপ্রসাদ পোদ্দার। অর্থাৎ একসময় যে পরিবারের উদ্যোগে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের কথা বলা হয়, পরবর্তী সময়েও সেই পরিবারের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের সম্পর্ক বজায় ছিল।


এরপর আসে আরও বড় এক মাইলফলক। ১৯৪০ সালের ১২ এপ্রিল ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ নদের ওপর নবনির্মিত সেতুর উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন বাংলা সরকারের পূর্ত বিভাগের মন্ত্রী মহারাজা শ্রীশচন্দ্র নন্দী। সে সময় সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা- তৎকালীন সময়ের হিসাবে বিপুল অর্থ।
মন্ত্রী সেতু স্থলে পৌঁছালে সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে অভ্যর্থনা জানান। সেতুর উদ্বোধন ছিল যশোরের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্রমবিকাশের প্রতীক। নদীর ওপর সেতু তৈরি হওয়ায় যাতায়াত আরও সহজ হয়, পণ্য পরিবহন বাড়ে, মানুষের চলাচল দ্রুততর হয়।

 
যশোর-বেনাপোল সড়কের ইতিহাসে তাই জড়িয়ে আছে শের শাহের সময়ের সড়ক নির্মাণের স্মৃতি, কালী পোদ্দারের মায়ের গঙ্গাস্নানের আকাক্সক্ষা, রাস্তার দুপাশে লাগানো গাছের ছায়া, ব্রিটিশ আমলের পাকা সড়ক, রেলপথের আগমন, ‘মায়ের দান’ বাস, বনগাঁ বাসস্ট্যান্ড, নদীর ওপর সেতু এবং মোটর যুগের সূচনা।
সময়ের প্রয়োজনেই অনেক কিছু তৈরি হয়। আবার সময়ের প্রয়োজনেই অনেক কিছু হারিয়ে যায়। বনগাঁ বাসস্ট্যান্ড নেই, সেই পুরোনো বাস নেই, পথের পাশের অনেক গাছ নেই, নেই সেই সময়ের যাত্রীদের কোলাহলও। কিন্তু রাস্তা রয়ে গেছে। তার ওপর দিয়ে এখনও ছুটে চলে অসংখ্য যানবাহন।


আজকের যাত্রী হয়ত জানেন না, তিনি যে পথ দিয়ে ছুটে যাচ্ছেন, সেই পথের বুকেই একসময় হাঁটতেন গঙ্গাস্নানে যাওয়া মানুষ, ছুটত ঘোড়ার গাড়ি, চলত পুরোনো বাস; নদী পারাপারের জন্য অপেক্ষা করতে হতো, পরে সেখানে দাঁড়িয়ে যায় সেতু। ইতিহাস এভাবেই আমাদের চোখের সামনে থাকে- কখনো রাস্তার ধুলোয়, কখনো একটি পুরোনো মোড়ের নামে, কখনো হারিয়ে যাওয়া বাসস্ট্যান্ডের স্মৃতিতে।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: