রোববার ০৯ আগস্ট ২০২৬

২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবীন্দ্রনাথ থেকে সুভাষচন্দ্র -খ্যাতিমানদের  প্রশংসাপত্রে এক সময়ের জনপ্রিয় ‘শ্রীঘৃত’

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৩:২২, ৮ আগস্ট ২০২৬

রবীন্দ্রনাথ থেকে সুভাষচন্দ্র -খ্যাতিমানদের  প্রশংসাপত্রে এক সময়ের জনপ্রিয় ‘শ্রীঘৃত’

উনিশ শতকের শেষ ভাগ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপন শিল্পও নতুন মাত্রা লাভ করে। দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আধুনিক বিপণন কৌশল গ্রহণ করে। এই সময়ের বিজ্ঞাপনগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রশংসাপত্র প্রকাশ করা। বর্তমান সময়ে যেমন চলচ্চিত্র তারকা, ক্রীড়াবিদ কিংবা জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের দিয়ে পণ্যের প্রচার করা হয়, তেমনি এক শতাব্দী আগে বাংলায় সেই ভূমিকা পালন করতেন জাতীয় জীবনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।


সে সময়ের বহুল আলোচিত দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে ‘শ্রীঘৃত’ একটি উল্লেখযোগ্য নাম। ১৯২০ থেকে ১৯৪০-এর দশকের বিভিন্ন বাংলা সংবাদপত্র, সাময়িকপত্র ও পূজাসংখ্যায় শ্রীঘৃতের বিজ্ঞাপন নিয়মিত প্রকাশিত হতো। বিজ্ঞাপনগুলোতে পণ্যের বিশুদ্ধতা, উৎপাদন প্রণালি এবং গ্রাহকের আস্থাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য বিপণন কৌশল ছিল দেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের মন্তব্য বা প্রশংসাপত্র প্রকাশ করা।


শ্রীঘৃতের বিজ্ঞাপনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম যেমন দেখা যায়, তেমনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং শিক্ষাবিদ-রাজনীতিক শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নামও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়। এ থেকে বোঝা যায়, সে সময়ে ব্র্যান্ডটির গ্রহণযোগ্যতা সমাজের উচ্চশিক্ষিত ও সচেতন মহলেও প্রতিষ্ঠিত ছিল। যদিও এসব প্রশংসাপত্রের ভাষা ও প্রকাশের সময় বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে ভিন্ন ছিল, তবুও বিজ্ঞাপন ইতিহাসে এগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।


তৎকালীন বিজ্ঞাপনগুলোর ভাষা ছিল অত্যন্ত পরিমিত, শালীন এবং যুক্তিনির্ভর। শুধু পণ্যের স্বাদের কথা নয়, বরং উৎপাদন ও সংরক্ষণের মান নিয়েও প্রতিষ্ঠানটি সচেতনতার পরিচয় দিয়েছিল। একটি বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছিল- “যে-টিনে ঘি ভরা হয়, সেটিও প্রস্তুতকালে হস্তদ্বারা স্পৃষ্ট নহে, ময়লা বর্জিত, সুদৃশ্য টীন।” আজকের ভাষায় এটিকে ‘হাইজেনিক প্যাকেজিং’ বা স্বাস্থ্যসম্মত মোড়কজাতকরণের ধারণার একটি প্রাথমিক উদাহরণ বলা যায়। শতবর্ষ আগে খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপনে এমন বক্তব্য নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী ছিল।
বিজ্ঞাপন ইতিহাসের গবেষকদের মতে, ব্রিটিশ ভারতের নগর মধ্যবিত্ত সমাজে ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা তৈরির ক্ষেত্রে সংবাদপত্র ছিল সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রবাসী, ভারতবর্ষ, বসুমতী, শনিবারের চিঠি, দেশ-সহ বিভিন্ন জনপ্রিয় সাময়িকপত্রে দেশীয় খাদ্যপণ্য, ওষুধ, প্রসাধনী এবং পোশাকের বিজ্ঞাপন নিয়মিত প্রকাশিত হতো। শ্রীঘৃতও সেই ধারার একটি সফল উদাহরণ। এসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কেবল একটি খাদ্যপণ্য বিক্রি করেনি; বরং বিশুদ্ধতা, দেশীয় শিল্পের প্রতি আস্থা এবং আধুনিক ভোক্তা-সংস্কৃতির একটি নতুন ধারণাও প্রতিষ্ঠা করেছিল।
খাঁটি ঘি একসময় বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। অতিথি আপ্যায়ন, উৎসব, পূজা-পার্বণ, মিষ্টান্ন প্রস্তুত কিংবা দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ঘিয়ের ব্যবহার ছিল সম্মান ও সমৃদ্ধির প্রতীক। বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে ঘিয়ের ব্যবহার কিছুটা সীমিত হলেও খাঁটি ঘিয়ের প্রতি বাঙালির আকর্ষণ আজও পুরোপুরি ম্লান হয়নি। সেই সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকেই শ্রীঘৃতের বিজ্ঞাপনগুলো দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছিল।


আজ শতবর্ষ পুরোনো সংবাদপত্রের পাতা উল্টালে শ্রীঘৃতের বিজ্ঞাপনগুলো একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা হিসেবে নয়, বরং বাংলার সামাজিক ইতিহাস, ভোক্তা-সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞাপন শিল্পের বিবর্তনের মূল্যবান দলিল হিসেবে সামনে আসে। মানুষের বিশ্বাস অর্জনের জন্য প্রযুক্তি বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু সম্মানিত ব্যক্তিত্বের গ্রহণযোগ্যতাকে বিপণনের অংশ করে তোলার কৌশল শত বছর আগেও যেমন কার্যকর ছিল, আজও তেমনি রয়েছে। 
 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ: