মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২৬

১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৭৫ বছর আগে পদ্মার তলদেশে টেলিগ্রাফের  তার পেতেছিলেন বাঙালি প্রকৌশলী শিবচন্দ্র নন্দী

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৩:৪৭, ২ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ১৩:৪৭, ২ আগস্ট ২০২৬

১৭৫ বছর আগে পদ্মার তলদেশে টেলিগ্রাফের  তার পেতেছিলেন বাঙালি প্রকৌশলী শিবচন্দ্র নন্দী

আজকের দিনে মুহূর্তেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বার্তা পৌঁছে যায়। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছে। কিন্তু এমন এক সময় ছিল, যখন দূরবর্তী স্থানে দ্রুত সংবাদ পাঠানোর একমাত্র ভরসা ছিল টেলিগ্রাফ। ‘টরেটক্কা’ শব্দটি তখন ছিল পরিচিত এক শব্দ। টেলিগ্রাফ যন্ত্রের সেই শব্দের মধ্য দিয়েই ছুটে যেত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সেই সূচনালগ্নে ভারত উপমহাদেশে যে কজন পথিকৃৎ ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন বাঙালি প্রকৌশলী শিবচন্দ্র নন্দী। প্রায় ১৭৫ বছর আগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি পদ্মা নদীর তলদেশে টেলিগ্রাফের তার স্থাপন করে এক অনন্য কীর্তি গড়েছিলেন।


উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতবর্ষে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার সূচনা হয়। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের রসায়ন ও মেটেরিয়া মেডিকার অধ্যাপক উইলিয়াম ও’শনেসি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুমতি নিয়ে ১৮৫১ সালে টেলিগ্রাফ স্থাপনের কাজ শুরু করেন। তাঁকেই ভারতে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার জনক বলা হয়। এই ঐতিহাসিক কর্মযজ্ঞে তাঁর প্রধান সহযোগী ছিলেন এক মেধাবী বাঙালি যুবক, শিবচন্দ্র নন্দী। পরবর্তীকালে তিনিই ভারতের প্রথম বাঙালি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের একজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।


প্রাথমিক পর্যায়ে কলকাতা থেকে ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপন করা হয়। ১৮৫১ সালে ডায়মন্ড হারবার থেকে কলকাতায় প্রথম টেলিগ্রাফ বার্তা পাঠানোর দায়িত্ব পালন করেন শিবচন্দ্র নন্দী। কলকাতার অপর প্রান্তে সেই ঐতিহাসিক বার্তা গ্রহণের সময় উপস্থিত ছিলেন উইলিয়াম ও’শনেসি এবং তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি। এই সফল পরীক্ষার মধ্য দিয়েই ভারতবর্ষে আধুনিক টেলিযোগাযোগের নতুন যুগের সূচনা ঘটে।
তবে শিবচন্দ্র নন্দীর সবচেয়ে বড় কীর্তি ছিল কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত টেলিগ্রাফ সংযোগ স্থাপন। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পদ্মা নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন কেবল স্থাপন করতে হয়েছিল। তখনকার পদ্মা ছিল ভয়ংকর স্রোতস্বিনী নদী। আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির অভাবে সেই কাজ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু অসীম সাহস, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিবচন্দ্র নন্দী সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। তাঁর এই সাফল্যের ফলে ব্রিটিশ সরকারের প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয় সাশ্রয় হয়েছিল, যা সে সময়ের হিসেবে ছিল বিপুল অর্থ।
শুধু প্রকৌশলী হিসেবেই নয়, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও শিবচন্দ্র নন্দীর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি একসময় এশিয়াটিক সোসাইটি-এর কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয়ে তিনি নিজেকে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।


কিন্তু কর্মময় জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল বেদনাময়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে প্লেগ মহামারিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ভারতবর্ষ। সেই মহামারিতেই ১৯০৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন শিবচন্দ্র নন্দী। বলা হয়, যেদিন তিনি মারা যান, সেদিন কলকাতার টেলিগ্রাফ অফিস বন্ধ রাখা হয়েছিল। থেমে গিয়েছিল টেলিগ্রাফ যন্ত্রের পরিচিত ‘টরেটক্কা’ শব্দ। যেন প্রযুক্তির এক পথিকৃতকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছিল সেই সময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা।


আজ টেলিগ্রাফ ইতিহাসের অংশ। তার জায়গা দখল করেছে ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ। কিন্তু আধুনিক এই প্রযুক্তির ভিত্তি নির্মাণে যাঁরা পথ দেখিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের নামই আজ বিস্মৃত। শিবচন্দ্র নন্দী তাঁদেরই একজন। কলকাতার বউবাজারের ‘শিবু নন্দীর লেন’ এখনও তাঁর স্মৃতি বহন করে চলেছে। বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে টেলিগ্রাফ যুগের নানা নিদর্শন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে বসেছে সেই বাঙালি প্রকৌশলীর নাম, যিনি প্রায় ১৭৫ বছর আগে পদ্মার উত্তাল স্রোতের নিচে টেলিগ্রাফের তার বসিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: