একসময় কচুরিপানা আর আগাছায় ভরা ছিল পুকুরগুলো। বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকা সেই জলাশয়গুলো আজ খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের মানুষের ভাগ্য বদলের প্রধান অবলম্বন। বাণিজ্যিকভাবে শোল মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন শতাধিক পরিবার। তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান, বাড়ছে নারীদের আয়, আর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন মাছ কিনতে আসছেন পাইকাররা।
পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নের পূর্ব গজালিয়া, উত্তর গড়ের আবাদ, দক্ষিণ গড়ের আবাদ, কালুয়া ও বাদুড়িয়া গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, সকাল ও বিকেলে নির্দিষ্ট সময়ে পুকুরপাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন চাষিরা। তেলাপিয়া ও সিলভার কার্পসহ বিভিন্ন মাছ কেটে শোল মাছের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করা হয়। খাবার পানিতে ছড়িয়ে দিতেই শত শত শোল মাছ একসঙ্গে ভেসে ওঠে।
স্থানীয়রা জানান, পাঁচ-ছয় বছর আগেও এসব পুকুরের অধিকাংশই কচুরিপানায় ভরা ছিল। এখন প্রায় প্রতিটি পুকুরেই বাণিজ্যিকভাবে শোল মাছ চাষ হচ্ছে।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা রমেশ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘আগে পুকুরগুলো কোনো কাজে লাগত না। এখন সেই পুকুরই গ্রামের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে।’
চাকরির পেছনে ছুটে ব্যর্থ হয়ে অনেক তরুণ এখন মাছ চাষকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। স্থানীয় উদ্যোক্তা প্রসেনজিৎ রায় বলেন, ‘চাকরি না পেয়ে ছোট একটি পুকুর লিজ নিয়ে শোল মাছ চাষ শুরু করি। শুরুতে ভয় ছিল, কিন্তু এখন এই চাষ থেকেই পরিবারের সব খরচ চলছে।’
শুধু পুরুষ নন, শোল মাছ চাষে যুক্ত হয়েছেন গ্রামের অনেক নারীও। মাছের খাদ্য প্রস্তুত, পরিচর্যা ও অন্যান্য কাজে অংশ নিয়ে পরিবারের আয় বাড়াচ্ছেন তারা।
গৃহিণী পম্পা রানী বলেন, ‘প্রতিদিন মাছের খাবার তৈরির কাজ করি। এই আয় দিয়ে ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারছি। পরিবারের আয় বাড়াতে পারছি, এটিই সবচেয়ে বড় আনন্দ।’
চাষিদের মতে, তুলনামূলক কম জায়গায় এবং স্বল্প সময়ে লাভজনকভাবে শোল মাছ চাষ করা সম্ভব।
সফল চাষি সুভাষ চন্দ্র মণ্ডল জানান, মাত্র ছয় শতক আয়তনের একটি পুকুরে ২ হাজার ৬০০টি শোল মাছের পোনা ছেড়েছিলেন। সাত থেকে আট মাসের মধ্যে মাছগুলোর ওজন ৭০০ গ্রাম থেকে এক কেজি হয়। সব খরচ বাদ দিয়েও তিনি প্রায় দ্বিগুণ লাভ পেয়েছেন।
শোল মাছ চাষকে ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। মাছের খাদ্য প্রস্তুতকারী, পরিবহন শ্রমিক, পোনা সরবরাহকারী ও পাইকারদের অংশগ্রহণে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী বাজারব্যবস্থা।
স্থানীয় পাইকারি মাছ ব্যবসায়ী অনিল কুমার দাস বলেন, ‘খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন ব্যবসায়ীরা এখানে মাছ কিনতে আসেন।’
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সৈকত মল্লিক বলেন, ‘চাঁদখালী এলাকায় শোল মাছ চাষ দেশের অন্যতম সফল ও টেকসই মডেল হিসেবে গড়ে উঠছে। পরিকল্পিতভাবে এ চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে পাইকগাছা দেশের অন্যতম শোল মাছ উৎপাদন এলাকায় পরিণত হতে পারে।’
তিনি জানান, প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ অব্যাহত থাকলে এই অঞ্চলে শোল মাছের উৎপাদন আরও বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে।
স্থানীয়দের মতে, অব্যবহৃত পুকুরকে কাজে লাগিয়ে শোল মাছ চাষ শুধু কৃষকদের আয় বাড়ায়নি, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন গতি এনেছে। একসময় অবহেলিত জলাশয়গুলো এখন কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি এবং স্বাবলম্বিতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। চাঁদখালীর এই অভিজ্ঞতা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও একটি অনুসরণযোগ্য মৎস্য চাষের মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।


























