সোমবার ২০ জুলাই ২০২৬

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষকের সোনালি স্বপ্ন এখন ঘেরের নিচে

লোনাপানির গ্রাসে কয়রা-পাইকগাছা

এফ. এম. রাজ্জাক, পাইকগাছা, খুলনা

প্রকাশিত: ১৩:০২, ১৯ জুলাই ২০২৬

লোনাপানির গ্রাসে কয়রা-পাইকগাছা

খুলনার উপকূলীয় কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদে একসময় লোনাপানির এমন আগ্রাসন ছিল না। বছরের অধিকাংশ সময় মাঠের পর মাঠজুড়ে শোভা পেত সোনালি আমন ও বোরো ধানের ফসল। কৃষকের গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মিঠা পানির মাছ আর ঘরে ঘরে ছিল স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন।


কিন্তু গত চার দশকে অপরিকল্পিতভাবে লোনাপানির প্রবেশ ও চিংড়ি চাষের বিস্তারের কারণে বদলে গেছে উপকূলের সেই চিরচেনা চিত্র। কৃষকের সেই সোনালি স্বপ্ন এখন অনেকটাই ঘেরের পানির নিচে। সবুজ প্রকৃতি হারিয়ে উপকূলীয় কৃষি অর্থনীতি পড়েছে সংকটে।


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে একশ্রেণির প্রভাবশালী মৎস্যচাষি এ অঞ্চলে লোনাপানির বাগদা চিংড়ি চাষ শুরু করেন। বড় জমির মালিকদের সঙ্গে সমঝোতা করে এবং নানা প্রলোভনের মাধ্যমে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জমি ইজারা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
পরবর্তীতে পোল্ডারের ভেতরের ফসলি জমিতে নদী থেকে লোনাপানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি ঘেরের বিস্তার ঘটতে থাকে। এর ফলে বহু কৃষিজমি ধীরে ধীরে ধান চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ স্থানীয় কৃষকদের।


স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় প্রভাবশালী ঘের মালিকরা পোল্ডারের পানি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত সরকারি স্লুইসগেট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। পানি প্রবেশ করানোর সুবিধার্থে কোথাও কোথাও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত করে পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। এতে একদিকে সরকারি অবকাঠামোর ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বাঁধ দুর্বল হয়ে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা চললেও প্রভাবশালী ঘের মালিকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
কৃষকদের অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী জমির মালিকদের প্রতিবছর নির্ধারিত হারে ইজারার অর্থ দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। জমির মালিকদের অনেক সময় নামমাত্র অর্থ দেওয়া হয়। কোনো জমি নিয়ে বিরোধ বা ঘেরে লোনাপানি প্রবেশে আপত্তি জানালে অনেক কৃষক ইজারার অর্থ থেকেও বঞ্চিত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ঘেরের দখল ও পানি ওঠানোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় বিরোধ, হামলা, সংঘর্ষ ও মামলা-মোকদ্দমার ঘটনা ঘটছে। এতে উপকূলীয় এলাকার সামাজিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে।
দীর্ঘ চার দশক ধরে চলা চিংড়ি চাষের কারণে উপকূলীয় এলাকায় কৃষি ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয়দের মতে, সুনির্দিষ্ট ও পরিবেশবান্ধব নীতিমালার অভাবে অনেক কৃষক তাদের পূর্বপুরুষের জমিতে আগের মতো ধান চাষ করতে পারছেন না।


বছরের পর বছর লোনাপানিতে ডুবে থাকায় বহু জমির মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা কমে গেছে। লবণাক্ততার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য। হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় অনেক মিঠা পানির মাছের প্রজাতিও।
এলাকাবাসী ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, চিংড়ি রপ্তানি দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখলেও এর সুফল সীমিত মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। বিপরীতে বহু মানুষ হারাচ্ছেন কৃষিজমি, কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তার সুযোগ।


তারা বলেন, কয়রা-পাইকগাছার কৃষিজমি রক্ষায় লোনাপানি ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিকল্পিত জোনিং (অঞ্চল নির্ধারণ) পদ্ধতি চালু করে কোথায় চিংড়ি চাষ হবে এবং কোথায় কৃষি কার্যক্রম চলবে তা নির্ধারণ করা জরুরি।
আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ, মিঠা পানির আধার সংরক্ষণ এবং কৃষি পুনর্বাসনের মাধ্যমে উপকূলের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ চান স্থানীয় বাসিন্দারা।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: