ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। নদীপথনির্ভর জনপদ খুলনা তখনও আধুনিক শহরে পরিণত হয়নি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকদের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রেলপথ ও স্টিমার যোগাযোগ চালুর উদ্যোগ খুলনার ভাগ্যই বদলে দেয়।
১৮৭৯ সালে যশোর থেকে খুলনা পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ এবং একই সঙ্গে স্টিমার সার্ভিস চালুর প্রস্তুতি ছিল সেই পরিবর্তনের সূচনা। পরের বছর, অর্থাৎ ১৮৮০ সালে রেললাইন নির্মাণকাজ শুরু এবং ডেলটা ঘাট থেকে নিয়মিত স্টিমার সার্ভিস চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে খুলনা একটি আধুনিক নগরকেন্দ্রে রূপ নেওয়ার পথে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীকালে খুলনা জেলা ও জেলা সদর ঘোষিত হলে এই অবকাঠামোগত পরিবর্তনই শহর গঠনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ সরকার যশোর থেকে খুলনা পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। একই সময়ে নদীপথে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে স্টিমার সার্ভিস চালুর প্রস্তুতিও শুরু হয়। ১৮৮০ সালে ক্লে রোডের উত্তর সীমায় অবস্থিত ডেলটা ঘাট থেকে নিয়মিত স্টিমার চলাচল শুরু হয়। এই উদ্যোগের ফলে খুলনা একদিকে যেমন : যশোর ও কলকাতার সঙ্গে রেলপথে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে, অন্যদিকে নদীপথে দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ আরও সুসংহত হয়।
১৮৮০ সালেই যশোর থেকে খুলনা সদর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শুধু রেললাইন বসানোই নয়, এর সঙ্গে স্টেশন, রেলওয়ে কর্মচারীদের আবাসন, গুদামঘর ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। চার্লীগঞ্জের হাটসংলগ্ন নদীতীর থেকে শুরু করে চার্লী সাহেবের বাড়িসহ পুরো চার্লীগঞ্জ, হেলাতলার পশ্চিমাংশ, মিয়াবাগের সম্পূর্ণ এলাকা, শিববাড়ী গ্রামের বৃহৎ অংশ এবং শেখপাড়া গ্রামের উত্তরাংশ রেলওয়ের জন্য হুকুম দখল করা হয়। এভাবে খুলনার বিস্তীর্ণ একটি এলাকা রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং সেখানে দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু হয়।
রেলপথ নির্মাণের পাশাপাশি স্টিমার সার্ভিসকে সমন্বিতভাবে পরিচালনারও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নদীর তীর ধরে নড়াইল কাছারি থেকে সাত নম্বর ঘাট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা এবং রেলস্টেশনের উত্তর-পূর্ব কোণের একটি বড় জমি স্টিমার কোম্পানির জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। ওই জমির ওপর নির্মিত হয় পাকা দেয়াল ও টিনের ছাউনি বিশিষ্ট একটি স্টিমার স্টেশন। এই স্টেশন ছিল সে সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। স্টেশনের সামনের এক নম্বর ঘাট থেকে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী ভারী স্টিমার নিয়মিত যাতায়াত করত। ফলে রেল ও নদীপথের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ গড়ে ওঠে, যা খুলনার বাণিজ্য, প্রশাসন এবং জনজীবনে নতুন গতি এনে দেয়।
তবে এই উন্নয়নের পেছনে ছিল বহু মানুষের উচ্ছেদের ইতিহাস। রেলওয়ের জন্য অধিগৃহীত জমির কারণে চার্লীগঞ্জ, মিয়াবাগ, শিববাড়ী, শেখপাড়া ও আশপাশের এলাকার বহু পরিবারকে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়। চার্লীগঞ্জের ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর একটি অংশ অবশিষ্ট হাট এলাকায় গিয়ে বসতি স্থাপন করে। হেলাতলার পশ্চিমাংশের বাসিন্দারা পূর্বদিকে কিংবা অন্যত্র সরে যান।
মিয়াবাগ সম্পূর্ণভাবে রেলওয়ের আওতায় চলে যাওয়ায় সেখানকার অধিবাসীরা দক্ষিণ-পশ্চিমে সরে গিয়ে শিববাড়ীর পাশে নতুন বসতি গড়ে তোলেন। শেখপাড়ার উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো নিজ গ্রামের ভেতরেই নতুন করে জায়গা করে নেয়। এভাবেই পুরোনো জনপদ ভেঙে নতুন নতুন মহল্লা ও বসতির সৃষ্টি হতে থাকে।
শিববাড়ী গ্রামের নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী পাল, কুণ্ডু, কাকার এবং কয়েকটি বারুজীবী পরিবারও এই অধিগ্রহণের ফলে স্থানান্তরিত হয়। পাল সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার নদীর ওপারে দৌলতপুর অঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করলেও, অধিকাংশ পরিবার বয়রা এলাকায় উঠে এসে নতুন ‘পালপাড়া’ গড়ে তোলে। একইভাবে কুণ্ডু পরিবারের কিছু সদস্য রেনেখামারে বসতি স্থাপন করেন এবং অধিকাংশ পরিবার বয়রার দক্ষিণে বিলের ধারে গিয়ে ‘কুণ্ডুপাড়া’ নামে নতুন মহল্লা প্রতিষ্ঠা করেন। বারুজীবী পরিবারগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে খালিশপুর এলাকায় বসতি স্থাপন করে। আলোচিত এলাকার মুসলিম পরিবারগুলোর অধিকাংশই সোনাডাঙ্গায় গিয়ে নতুন বসতি গড়ে তোলে। এসব স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে খুলনার জনবিন্যাসে এক বড় পরিবর্তন ঘটে এবং পরবর্তী নগরায়ণের ভিত্তি তৈরি হয়।
রেললাইন নির্মাণের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। তৎকালীন যশোর রোড, যা ক্লে রোড থেকে জোড়াগেট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, তার একটি অংশ রেলওয়ের আওতায় চলে যায়। পরবর্তীকালে খুলনা জেলা সদর ঘোষিত হওয়ার পর রেল এলাকার দক্ষিণ পাশ দিয়ে নতুন একটি বিকল্প সড়ক নির্মাণ করা হয়। বর্তমান যশোর রোড, যা ডাকবাংলা থেকে জোড়াগেট পর্যন্ত বিস্তৃত, সেই সময়েই গড়ে ওঠে। এর মাধ্যমে শহরের নতুন সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি হয় এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা আরও সহজ হয়ে ওঠে।
প্রথম রেলস্টেশন নির্মিত হয় পুরোনো যশোর রোডের দক্ষিণ পাশে এবং ফেরিঘাট রোডের উত্তর প্রান্তের সামান্য পশ্চিমে। সেই সময় স্টেশনে যাতায়াতের প্রধান পথ ছিল পুরোনো যশোর সড়ক। ১৮৮৫ সালে এই স্টেশন পর্যন্ত রেলগাড়ি চলাচল শুরু হলে খুলনা কার্যত রেল যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর ফলে কলকাতা, যশোর এবং দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য এলাকার সঙ্গে মানুষের যাতায়াত সহজ হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে গতি আসে।
রেল ও স্টিমার- এই দুই যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগপৎ বিকাশ খুলনার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। নদীপথে পাট, ধান, লবণ, কাঠ ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন সহজ হয়। একই সঙ্গে রেলপথ এসব পণ্য দ্রুত দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি করে। ফলে খুলনা ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে থাকে। বাজার, গুদাম, সরকারি দপ্তর, আবাসিক এলাকা এবং নতুন নতুন পেশাজীবী শ্রেণির আবির্ভাবের মাধ্যমে একটি আধুনিক শহরের রূপ স্পষ্ট হতে শুরু করে।
খুলনার নগর ইতিহাসে ১৮৮০ সাল তাই একটি নতুন শহরের জন্মপর্ব। রেললাইন, স্টিমার ঘাট, নতুন সড়ক এবং প্রশাসনিক কাঠামোর বিকাশের পাশাপাশি মানুষের স্থানান্তর, নতুন মহল্লার সৃষ্টি এবং জনবসতির পুনর্বিন্যাস- সবকিছু মিলিয়ে এই সময়টি খুলনার নগরায়ণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। আজকের খুলনা মহানগরের পেছনে যে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এই রেল ও স্টিমারকেন্দ্রিক অবকাঠামো বিপ্লব।


























