যশোহরে এসে স্ত্রী নিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু আমার আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কেউ কেউ আমার সরল সোজা মা’কে বোঝালেন যে, স্ত্রী আমার কাছে আসলে আমি আর তাঁদের খোঁজ খবর নেব না। ঢাকাও পাঠাবেন না। তাই চিঠি লেখার পর মা আমাকে জানালেন,“আমি তোমার বউকে পাঠাব না। তোমার ইচ্ছা হয়, তুমি সেখানে বিয়ে কর।” তাই স্ত্রী নিয়ে আসার আশা ত্যাগ করলাম। প্রথম যৌবন, উচ্চপদ, রক্তউগ্র, হৃদয় কবিত্বময়। বহুদিন ধরে ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম। এর দুই মাস পরে আমার স্নেহময়ী মা মারা গেলেন।
.
বাড়িতে চারটি শিশু ভাই ও একটি শিশু ভগ্নী ও দ্বাদশ বর্ষীয়া বালিকা পত্নী। আমার মায়ের অপেক্ষা আমার খুড়ী- আমি তাঁকে “যাদু” বলে ডাকি- অধিক বুদ্ধিমতী। তিনি লিখলেন- “আমি বউকে নিয়ে তোমার কাছে আসতে চাই।” স্ত্রীও সেরূপ পত্র লিখলেন। যে স্ত্রীকে আনার জন্য এতদিন চেষ্টা করছিলাম, আজ তাকে নিয়ে আসা সম্বন্ধে ঘোরতর চিন্তায় পড়লাম। মা নেই। স্ত্রীকে আনতে গেলে সবাইকে আনতে হয়। বাড়িতে আরও লোক রয়েছে। সকলকে নিয়ে আসা ব্যয় সাধ্য। হাতে কিছুই নেই। তার উপর নৌকায় আঠার দিনের পথ। বড়ই চিন্তিত হলাম। কিছুই স্থির করতে পারছি না।
যাইহোক, তত্ত্বাবধায়ক বাবুর বাসায় প্রায় দিন নাচের আয়োজন হয়। প্রতিদিন সেখানে আমার নিমন্ত্রণ। এ অবস্থায় নিমন্ত্রিত হয়ে এক সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে নাচ দেখছি। একটি নর্তকী নাচছে। আর এক নর্তকী বসে আছে। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল—“আপনাকে আজ এত চিন্তামগ্ন মনে হচ্ছে কেন?” সে কথাটা এমন করুণকণ্ঠে বলল যে তাতে আমার প্রাণ স্পর্শ করল। আমি বললাম আমি সত্যিই বড় চিন্তিত আছি। সে আবার সে আবার স্নেহে জিজ্ঞাসা করল- “কিসের চিন্তা, আমাকে বলবেন কি?” আমি একটু হেসে চুপ করে থাকলাম। কিন্তু সে জিদ করতে লাগল। তখন তাকে কথাটা খুলে বললাম।
সে বলল, আপনি কি স্থির করেছেন? আমি বললাম, কিছুই স্থির করতে পারছি না। সে বলল, আপনার স্ত্রীকে আনতে হবে। আপনি তাঁকে আসতে চিঠি লিখুন। আমি বললাম, হাতে হাতে টাকা নেই। সে বলল, কত টাকার প্রয়োজন? আমি বললাম অন্ততঃ দু’শ টাকা। সে বলল, যদি কিছু মনে না করেন, আমি কাল দু’শ টাকার নোট পাঠিয়ে দেব। আপনি সুবিধা মতে সময়ে তা পরিশোধ করবেন।
আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। সে আমার মনের ভাব বুঝে বলল—“আমি বুঝতে পারছি আপনি আমার মত পতিতার মুখে এ কথা শুনে অবাক হয়েছেন। কিন্তু পতিতা হলেও আমি মানুষ। আপনার এই বয়স, উচ্চপদ। সমস্ত যশোহরে আপনার রূপগুণের প্রশংসা ধরে না। আপনি বহুদিন এভাবে ভাবে থাকতে পারবেন না। শেষে বড় কষ্ট পাবেন।
সে এই কথাগুলো এমন সরল ভাবে, এমন করুণ কণ্ঠে, এমন কাতরতার সাথে বলল যে, কথা গুলো আমার হৃদয়ের স্তরে স্তরে প্রবেশ করল। আমি ভাবতে লাগলাম—“এরাই কি পতিতা?” আমি বললাম— “তোমাদের মধ্যে যে এ ধরনের সহৃদয়তা আছে আমি বিশ্বাস করতাম না। আমি শীঘ্রই বেতন পাব। টাকা ধার করবার প্রয়োজন হবে না।” পরদিন সকালে আমার ভৃত্য একটি পত্র এনে হাতে দিল। দেখলাম তারই পাঠানো পত্র এবং তাতে দু’শ টাকার নোট। আমার চোখে একবিন্দু জল চলে এলো। আমি আবার ভাবলাম– “এরাই কি পতিতা?” বলা বাহুল্য তার লোকের দিয়ে অর্থাৎ পত্র বাহকের কাছে নোটগুলো ফিরিয়ে দিলাম।
তার আর একটি আচরণের কথা বলব। হেডমাষ্টার বাবু নিজের শিশু পুত্রদের সঙ্গে বগি হাঁকিয়ে কোনও ডেপুটি বাবুর বাড়ি যাচ্ছেন। এই পতিতার বাড়ির সামনের মোড় ফিরতে গাড়ি উলটিয়ে রাস্তার নীচে পড়ে গেল। পিতা ও পুত্রেরা সকলেই আঘাত পেলেন। সে দ্রুত এসে সকলকে তার বাড়িতে নিয়ে সেবা-শুশ্রূষা করতে লাগল এবং ডাক্তার আনতে লোক পাঠাল। ডাক্তার এসে আহতদের চিকিৎসা দিয়ে পটি ও ব্যান্ডেজ ইত্যাদি দিলে তাঁরা সুস্থ হয়ে অন্য গাড়িতে বাড়িতে যান। হেডমাষ্টার বাবু পূর্বে ব্রাহ্মভাবে মনরো সাহেবের দ্বারা কতভাবে এদের নির্যাতন করেছিলেন। কিন্তু তার এ আচরণে তিনি এত খুশি হলেন, যে তিনি তাকে সেই দিন থেকে তাঁর কন্যার মত জানতেন, এবং যখন তখন তার বাড়িতে যেতেন। কেবল একটি মাত্র নিয়ম ছিল-তিনি উপস্থিত হলেই, তাকে তার বৈঠকের চাদটি বদলিয়ে দিতে হত। তিনি তার গান শুনতেন, পড়া শুনতেন, তাকে পড়াতেন, সঙ্গীত শিক্ষা দিতেন। তাঁর “ব্রাহ্ম ভ্রাতারা” তাঁর উপর রাগ করতেন, কারণ তিনি ব্রাহ্ম সমাজের সভাপতি। একদিন ভাইদের এক ‘ডেপুটেশন উপস্থিত হল। কিন্তু তিনি পরিষ্কার জবাব দিলেন- “আমি আমার মেয়েকে ছাড়তে পারি কিন্তু তাকে অস্নেহ করতে পারি না। তোমাদের আমাদের তুলনায় সে দেবী।


























