সোমবার ০৬ জুলাই ২০২৬

২০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরের তাঁতশিল্প

দাদন প্রথা ও হেঙ্কেল সাহেবের ন্যায়সংগ্রাম

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৮:৫২, ৫ জুলাই ২০২৬

দাদন প্রথা ও হেঙ্কেল সাহেবের ন্যায়সংগ্রাম

এক সময়ের যশোর ছিল তাঁতশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই সময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থে এখানে গড়ে উঠেছিল কাপড় সংগ্রহের বিশেষ ব্যবস্থা। আজকের মানচিত্রে যে-সব এলাকা সাতক্ষীরার অন্তর্ভুক্ত- কলারোয়ার সোনাবাড়িয়া আর সাতক্ষীরা শহরের কাছে বুড়ন- এই দুই জায়গাতেই ছিল কোম্পানির কাপড় সংগ্রহের কেন্দ্র।


এই কেন্দ্রগুলোতে কোম্পানির কর্মচারীরা বসবাস করতেন। তাঁদের প্রধান কাজ ছিল আশপাশের গ্রামের জোলা ও তাঁতিদের কাছ থেকে কাপড় সংগ্রহ করা। তবে এই সংগ্রহ ছিল না একেবারে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া। তাঁতিদের আগে থেকেই ‘দাদন’ বা অগ্রিম টাকা দেওয়া হতো, আর সেই টাকার বিনিময়ে নির্দিষ্ট দামে কাপড় দিতে বাধ্য থাকতেন তাঁতিরা। ফলে অনেক সময় তাঁতিদের স্বাধীনভাবে বাজারে কাপড় বিক্রির সুযোগ থাকত না।


এই দাদন প্রথাকে ঘিরে প্রায়ই বিরোধ তৈরি হতো। স্থানীয় তাঁতিরা নানাভাবে বঞ্চিত হতেন, আর অভিযোগ জমা পড়তে থাকত প্রশাসনের কাছে। এই অবস্থায় এগিয়ে আসেন যশোরের তৎকালীন কর্মকর্তা হেঙ্কেল সাহেব। তিনি শুধু অভিযোগ গ্রহণ করেই থেমে থাকেননি, বরং কোম্পানির নিজস্ব কর্মচারীদের অত্যাচারের বিষয়টিও তুলে ধরেন রাজস্ব বোর্ডের নজরে।
হেঙ্কেল সাহেবের এই উদ্যোগ ছিল বেশ সাহসী। কারণ কোম্পানির কর্মচারীরাই তখন অনেকটা ‘আইনের ঊর্ধ্বে’ অবস্থান করতেন। তাঁরা কিছু তাঁতিকে নিজেদের ‘লোক’ হিসেবে চিহ্নিত করে নিয়েছিলেন। এই তাঁতিদের ওপর অন্য কারও কর্তৃত্ব ছিল না। এমনকি তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ উঠলেও, তা নিষ্পত্তির জন্য কোম্পানির কর্মচারীদেরই অনুমতি লাগত। ফলে কার্যত এই কর্মচারীরাই হয়ে উঠেছিলেন সর্বেসর্বা।
এই অন্যায্য পরিস্থিতির বিরুদ্ধে হেঙ্কেল সাহেব বারবার প্রতিবাদ জানান। যদিও তৎক্ষণাৎ বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি, তবুও তাঁর প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি। ক্রমে সরকার বাধ্য হয় কিছু নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করতে, যাতে উভয় পক্ষের বিরোধ কিছুটা হলেও কমানো যায়।
হেঙ্কেল সাহেব ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকা একজন প্রশাসক। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা আর সুশাসনের জন্য তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা পরবর্তীকালে বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে। লর্ড কর্ণওয়ালিস-এর আমলে যে প্রশাসনিক সংস্কারগুলো কার্যকর হয়, তার পেছনে হেঙ্কেলের প্রস্তাব ও অভিজ্ঞতার বড় ভূমিকা ছিল।
তাঁরই উদ্যোগে ১৭৮৬ সালে যশোর একটি পৃথক জেলায় রূপান্তরিত হয়- যা ছিল বঙ্গদেশের প্রথম জেলা। আর এই জেলার প্রথম কালেক্টরও ছিলেন হেঙ্কেল সাহেব নিজেই। নতুন এই জেলার প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য তিনি যেভাবে কাজ করেছেন, তা আজও ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: