শুক্রবার ০৩ জুলাই ২০২৬

১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালিয়ার মাটি থেকে কলকাতার মহানায়িকা সুচিত্রা সেন

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১১:৪৫, ২ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ১৪:৩২, ২ জুলাই ২০২৬

কালিয়ার মাটি থেকে কলকাতার মহানায়িকা সুচিত্রা সেন

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মহানায়িকা হিসেবে যাঁর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তিনি সুচিত্রা সেন। রুপালি পর্দায় তাঁর অসামান্য সাফল্য তাঁকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে। কিন্তু তাঁর জীবনকাহিনির পেছনে রয়েছে আরও দীর্ঘ এক সামাজিক ও পারিবারিক ইতিহাস, যার সূত্রপাত যশোর জেলার কালীগঙ্গা নদীতীরবর্তী কালিয়া অঞ্চলে, বিস্তার পাবনা শহরে এবং পরিণতি কলকাতার চলচ্চিত্রজগতে।


সুচিত্রা সেনের প্রকৃত নাম ছিল রমা দাশগুপ্ত। পারিবারিক পরিমণ্ডলে তিনি রমা বা কৃষ্ণা দাশগুপ্ত নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন পাবনা পৌর বোর্ডের একজন কর্মচারী। কর্মসূত্রে পাবনায় বসবাস করলেও দাশগুপ্ত পরিবারের আদি নিবাস ছিল তৎকালীন যশোর জেলার কালিয়া গ্রামে, যা বর্তমানে নড়াইল জেলার অন্তর্গত। কালীগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত কালিয়া, ছোট কালিয়া ও বেন্দা ছিল পূর্ববঙ্গের অন্যতম প্রধান বৈদ্য-অধ্যুষিত অঞ্চল। শিক্ষাদীক্ষা, চিকিৎসাশাস্ত্র, সংস্কৃতচর্চা এবং সামাজিক প্রগতির জন্য এ অঞ্চল সুদূরকাল থেকেই খ্যাত ছিল।
ঔপনিবেশিক যুগে কালিয়ার বৈদ্য সম্প্রদায় দ্রুত আধুনিক শিক্ষার দিকে অগ্রসর হয়। ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, নারীশিক্ষার প্রতি উৎসাহ এবং পেশাগত বৈচিত্র্য তাদেরকে পূর্ববঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। কিন্তু, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও পারিবারিক সম্পত্তির ক্রমাগত খণ্ডিতকরণের ফলে বহু পরিবারকে জন্মভূমি ত্যাগ করে নতুন জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে হয়। কেউ গিয়েছেন জেলা শহরে, কেউ কলকাতায়, আবার কেউ বাংলার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছেন। করুণাময় দাশগুপ্তের পূর্ব পুরুষরাও সেই অভিবাসী ধারার অংশ ছিলেন।
এই কালিয়া- বেন্দা অঞ্চল শুধু সুচিত্রা সেনের পূর্বপুরুষদের আবাসভূমি নয়; এখান থেকেই উঠে এসেছেন বহু খ্যাতিমান ব্যক্তি। ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের পথিকৃৎ উদয় শঙ্কর ও সেতার সম্রাট রবি শঙ্কর-এর পূর্বপুরুষদের শিকড়ও এই অঞ্চলে। এখানকার সন্তান ছিলেন বিচারপতি কুলদাচরণ দাসগুপ্ত, কমিউনিস্ট নেতা রণেন সেন, নারী আন্দোলনের নেত্রী কনক মুখোপাধ্যায় এবং সুরকার কমলদাশগুপ্ত। এই ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশই ছিল সুচিত্রা সেনের পারিবারিক উত্তরাধিকারের অংশ।
করুণাময় দাশগুপ্তের কর্মজীবনের কারণে পরিবারটি পাবনায় স্থায়ী হয়। সেখানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠেন রমা দাশগুপ্ত। পাবনার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাটে। সে সময় পাবনা ছিল সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানেই বেড়ে উঠেছেন সাহিত্যিক পরিমল গোস্বামী, চিন্তাবিদ শচীন চৌধুরী, কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, দার্শনিক শিবনারায়ণ রায় এবং কবি মনীন্দ্র রায় -এর মতো ব্যক্তিত্ব। এই সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা রমা দাশগুপ্ত পরবর্তীকালে এক নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেন।
বিবাহসূত্রে তিনি যুক্ত হন প্রখ্যাত সেন পরিবারে। তিনি ছিলেন ঢাকার গেণ্ডারিয়ার বিশিষ্ট নাগরিক আদিনাথ সেনের নাতবধূ। এই বিবাহের পর কলকাতায় তাঁর নতুন জীবনের সূচনা হয়। কলকাতার চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করে তিনি ‘সুচিত্রা সেন’ নামে খ্যাতি অর্জন করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলা সিনেমার সর্বাধিক জনপ্রিয় অভিনেত্রীতে পরিণত হন। উত্তম-সুচিত্রা জুটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের জন্ম দেয়।
সুতরাং, সুচিত্রা সেনের বংশপরিচয়ের ইতিহাস যশোর-নড়াইলের কালিয়া অঞ্চলের বৈদ্য সমাজ থেকে শুরু হয়ে পাবনার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত জীবন অতিক্রম করে কলকাতার সাংস্কৃতিক রাজধানীতে পৌঁছে যাওয়া এক দীর্ঘ সামাজিক যাত্রার কাহিনি। কালিয়ার নদীবিধৌত জনপদ, পাবনার নাগরিক সংস্কৃতি এবং কলকাতার চলচ্চিত্রজগৎ- এই তিনটি ভূগোল ও তিনটি ঐতিহাসিক পরিমণ্ডল মিলেই নির্মিত হয়েছে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের উত্তরাধিকার।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: