১৯২৭ সালে ভারতের গুজরাটের বরদলৈ অঞ্চলে কৃষকদের ঐতিহাসিক কর-বিরোধী আন্দোলন সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। প্রায় একই সময়ে তৎকালীন যশোর জেলার চিত্রা নদীতীরবর্তী অখ্যাত গ্রাম বন্দবিলায় সংঘটিত হয়েছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলন, যা ইতিহাসে ‘বন্দবিলা সত্যাগ্রহ’ নামে পরিচিত। ইউনিয়ন বোর্ড গঠনের বিরুদ্ধে সাধারণ কৃষক, শ্রমজীবী ও গ্রামীণ মানুষের এই অসহযোগ ও কর-বিরোধী আন্দোলন তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছিল।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের প্রেরণায় বাংলার বিভিন্ন স্থানে যে পল্লীসংস্কার সমিতি গড়ে উঠেছিল, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয় বন্দবিলায়। ১৯২৫ সালের দিকে যশোরের বিশিষ্ট স্বাধীনতাসংগ্রামী বড় বিজয় রায়ের অনুগামী ছোট বিজয় কৃষ্ণ রায়ের নেতৃত্বে এই কেন্দ্র গড়ে ওঠে। অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কেন্দ্রটি জেলার মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯২৭ সালের শেষদিকে বাংলা সরকার ইবহমধষ ঠরষষধমব ঝবষভ এড়াবৎহসবহঃ অপঃ, ১৯১৯-এর আওতায় বন্দবিলায় একটি ইউনিয়ন বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। কিন্তু গ্রামবাসীরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায়নি। তাদের ধারণা ছিল, ইউনিয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদিকে যেমন নতুন কর আরোপ করা হবে, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি করে জাতীয় আন্দোলনের শক্তিকে দুর্বল করা হবে।
বন্দবিলার নেতা ছোট বিজয় রায় বিষয়টি নিয়ে কলকাতায় গিয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, জ্ঞানাঞ্জন নিয়োগীসহ জাতীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এলাকার সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর সুভাষচন্দ্র বসু আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। এরপর ইউনিয়ন বোর্ড নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্রামবাসীরা সংগঠিত আন্দোলন শুরু করেন।
প্রথমদিকে যশোর জেলা কংগ্রেস কমিটি এই আন্দোলনের প্রতি অনুকূল ছিল না। তবে সুভাষচন্দ্র বসুর হস্তক্ষেপের পর কংগ্রেস নেতৃবৃন্দও আন্দোলনে যুক্ত হন। যশোরের কৃষ্ণবিনোদ রায় ও তাঁর যুবসংঘও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়।
সরকারি উদ্যোগে প্রথম দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দেখা যায়, সারাদিনে মাত্র ৩৬টি ভোট পড়েছে। ভোটকেন্দ্রের পরিবর্তে অধিকাংশ মানুষ ভিড় জমিয়েছিলেন কংগ্রেস কার্যালয়ে। ফলে নির্বাচন বাতিল করতে বাধ্য হয় প্রশাসন। পরে খাজুরা গ্রামে দ্বিতীয়বার ভোটগ্রহণের আয়োজন করা হলে সরকার নানা প্রলোভন, অনুরোধ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেও কাউকে ভোটকেন্দ্রে আনতে পারেনি। একটিও ভোট না পড়ায় নির্বাচন কার্যত ভেস্তে যায়।
এরপর সরকার মনোনীত নয়জন সদস্যকে নিয়ে ইউনিয়ন বোর্ড গঠন করে এবং নতুন কর ধার্য করে। এর প্রতিবাদে আন্দোলন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। শুরু হয় কর-বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন। গ্রামবাসীরা সম্মিলিতভাবে কর প্রদান বন্ধ করে দেন।
পরবর্তী প্রায় দুই বছর ধরে এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। সরকার কর আদায়ের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালালেও জনসাধারণের প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সভা, সমাবেশ, মিছিল, বৈঠক, ম্যাজিক লণ্ঠনের মাধ্যমে প্রচার এবং প্রাদেশিক কংগ্রেস নেতাদের অংশগ্রহণে বন্দবিলা সারা বাংলায় আলোচিত হয়ে ওঠে। জনরোষের আশঙ্কায় অনেক চৌকিদার, দফাদার ও কর আদায়কারী চাকরি ছেড়ে দেন। ইউনিয়ন বোর্ডের অধিকাংশ সদস্যও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। আন্দোলনের ব্যাপকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, এর প্রতিধ্বনি ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
১৯২৯ সালের অক্টোবর মাসে সরকার আন্দোলন দমনের জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বিপুলসংখ্যক পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে কর বকেয়ার অজুহাতে গ্রামবাসীদের গৃহস্থালি সামগ্রী, মাছ ধরার জাল, হালের বলদসহ বিভিন্ন সম্পত্তি ক্রোক করতে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাজেয়াপ্ত সম্পদের মূল্য ধার্যকৃত করের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। কিন্তু এই নিপীড়নের মধ্যেও আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখেন।
ক্রোক করা সম্পত্তি নিলামের জন্য বিভিন্ন হাটে তোলা হলেও সাধারণ মানুষ তা বর্জন করেন। যখনই জানা যেত যে নিলামে তোলা গবাদি পশু বা দ্রব্যাদি বন্দবিলার সত্যাগ্রহী কৃষকদের, তখনই ক্রেতারা নিলাম থেকে সরে দাঁড়াতেন। ফলে সরকারের নিলাম কার্যক্রম বারবার ব্যর্থ হয়।
আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। ছোটো বিজয় রায়, বিনোদ বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোমোহন ভট্টাচার্যসহ অনেককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ডা. হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভোলানাথ পালিত, সুধীর কুমার মুখোপাধ্যায়, বিজয় কুমার চট্টোপাধ্যায়, নিবারণ মজুমদার ও মোহাম্মদ হোসেন আলীসহ বহু কর্মীও শাস্তির মুখোমুখি হন। যদিও অনেকের মতে, ছোট বিজয় রায় দীর্ঘ সময় গ্রেপ্তার এড়িয়ে থেকেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন।
সরকার আন্দোলন দমনের জন্য স্থানীয় বিদ্যালয়ের অনুদান বন্ধ করে দেয় এবং আন্দোলনপন্থী সংবাদপত্রগুলোর ওপরও নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কৌশল প্রয়োগ করা হয়। তবুও আন্দোলনের শক্তি পুরোপুরি ভাঙা যায়নি।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ইউনিয়ন বোর্ডের মাধ্যমে কর বৃদ্ধির আশঙ্কা খুব বেশি বাস্তবায়িত না হওয়ায় দরিদ্র কৃষকদের একাংশ আন্দোলনের প্রতি আগ্রহ হারাতে শুরু করে। অন্যদিকে ১৯৩০ সালে মহাত্মা গান্ধীর আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক জাতীয় রাজনীতিকে নতুন দিকে প্রবাহিত করে। ফলে, বন্দবিলার ইউনিয়ন বোর্ড বিরোধী আন্দোলন ধীরে ধীরে সর্বভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে যায় এবং ১৯৩০ সালের মার্চ নাগাদ এর গতি স্তিমিত হয়ে পড়ে।
এই ঐতিহাসিক সত্যাগ্রহের প্রাণপুরুষ ছোট বিজয় রায় ১৯৮২ সালের ৮ জানুয়ারি নিজ গ্রাম বন্দবিলায় মৃত্যুবরণ করেন। দেশভাগের পরও তিনি জন্মভূমি ত্যাগ করেননি। স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৩২ সালের আন্দোলন এবং ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনেও তিনি কারাবরণ করেন। শেষবার কারাগারে থাকার সময় তাঁর স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন।
বন্দবিলা সত্যাগ্রহ আজ প্রায় বিস্মৃত। অথচ এটি ছিল বাংলার গ্রামীণ জনসমাজের এক বিরল গণ-অসহযোগ আন্দোলন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ সংগঠিত হয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিল। ইতিহাসের এই অধ্যায় যশোর অঞ্চলের রাজনৈতিক সচেতনতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং গণপ্রতিরোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আজও স্মরণীয়।


























