গ্রামীণ বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল যাত্রাপালা। আজকের ডিজিটাল যুগে বিনোদনের অসংখ্য মাধ্যম হাতের নাগালে থাকলেও ষাটের দশকের গ্রামীণ সমাজে চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন কলের গান, রেডিও কিংবা টেলিভিশন এত সহজলভ্য ছিল না। মানুষ খেলাধুলা, যাত্রা, থিয়েটার কিংবা মাঝেমধ্যে সিনেমা দেখে তাদের বিনোদনের চাহিদা পূরণ করত। তবে শীতের কুয়াশা ভরা দীর্ঘ রাত জেগে যাত্রাপালা দেখা ও শোনার যে নির্মল আনন্দ, তা ছিল গ্রামীণ জনজীবনের এক অনন্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।
যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার ৭ নম্বর খেদাপাড়া ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রাম ছিল সেই ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। এই গ্রামেই ১৯২৮ সালে ব্রিটিশ আমলে এক মধ্যবিত্ত গৃহস্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন যাত্রা জগতের নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক ও শিল্পী বাবু বলাই চন্দ্র সরকার। দীর্ঘ সাংস্কৃতিক জীবনের পর তিনি ২০০৩ সালের ৪ মে পরলোকগমন করেন। তবে আজও তিনি এ অঞ্চলের মানুষের স্মৃতিতে একজন শ্রদ্ধেয় শিল্পী ও সংস্কৃতি সেবক হিসেবে বেঁচে আছেন।
অসম বয়সি বাবু রতন মণ্ডল (বাঁশিয়াল) ও স্থানীয় শিক্ষক মহলের সহযোগিতায় বলাই চন্দ্র সরকার গড়ে তোলেন ‘ভৈরব অপেরা পার্টি’। দলের স্বত্বাধিকারী ছিলেন বাবু পুলিন বিশ্বাস। ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করতেন মামুদকাটি গ্রামের বাবু চৈতন্য দাস এবং সহকারী ম্যানেজার ছিলেন রঘুনাথপুর গ্রামের বাবু বাবুরাম রায়।
ষাটের দশকে যাত্রাশিল্পের বিকাশ কালে ভৈরব অপেরা পার্টি একের পর এক ঐতিহাসিক, সামাজিক ও শিক্ষামূলক যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করে ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। ব্রজেন দে, গোপাল ভাঁড়, ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়-সহ বিভিন্ন খ্যাতিমান পালাকারদের রচিত যাত্রা মঞ্চায়নের মাধ্যমে দলটি দর্শকদের মন জয় করেছিল। জানা যায়, ১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের সহায়তার জন্য শীতকালজুড়ে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে টিকিটের বিনিময়ে যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হতো। সেই আয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
বলাই চন্দ্র সরকার অভিনীত উল্লেখযোগ্য যাত্রাপালার মধ্যে ছিল— ‘কয়েদী’, ‘ফুল্লরা’, ‘দাসীপুত্র’, ‘সতীরঘাট’, ‘রক্ততিলক’, ‘বিপ্লবী বাঙালি’, ‘ছিন্ন শির’, ‘বীরাঙ্গনা’, ‘তাসের ঘর’, ‘সূর্যসাক্ষী’, ‘চণ্ডীতলার মন্দির’, ‘হাসির হাটের কান্না’, ‘একটি পয়সা’, ‘মা মাটি মানুষ’, ‘ময়লা কাগজ’, ‘সিঁদুর নিও না মুছে’, ‘কলঙ্কিত মসনদ’ এবং ‘কালো সিঁদুর’।
ভৈরব অপেরা পার্টির যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হয়েছে হরিহরনগর স্কুল প্রাঙ্গণ, রাজগঞ্জ, কেশবপুর, মনিরামপুর, মশিহাটি কলেজ প্রাঙ্গণ, তুলারামপুর, ছাতিয়ানতলা, নড়াইলের রূপগঞ্জ এবং যশোর টাউন হলের কৃষি প্রদর্শনী মাঠসহ বহু স্থানে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী গ্রামের দুর্গাপূজা, কালীপূজা ও লক্ষ্মীপূজার মণ্ডপের সামনেও নিয়মিত যাত্রাপালার আয়োজন হতো।
যাত্রার প্রতি বলাই চন্দ্র সরকারের ভালোবাসা ছিল অসাধারণ। ঐতিহাসিক যাত্রাপালার জন্য তিনি কলকাতা থেকে নিজ উদ্যোগে পোশাক, কস্টিউম, তরবারি, হ্যাজাক লাইট, সামিয়ানা এবং নানা উপকরণ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নিতে গেলে তাঁর বাড়ির সমস্ত সামগ্রী লুট হয়ে যায়। এরপরও তিনি হাল ছাড়েননি। দিগদানা গ্রামের অধীর বিশ্বাস ও সুধীর বিশ্বাসের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ভাড়া নিয়ে আবারও ভৈরব অপেরা পার্টিকে সচল করেন।
তৎকালীন সময়ে নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন পুরুষ শিল্পীরাই। ভৈরব অপেরা পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন মামুদকাটি, রঘুনাথপুর, রোহিতা, বাসুদেবপুর, ডুমুরখালি ও খেদাপাড়াসহ আশপাশের গ্রামের অসংখ্য প্রতিভাবান শিল্পী। তাদের মধ্যে দুলাল চন্দ্র দাস, গোবিন্দ দাস, আনন্দ দাস, নীলরতন মণ্ডল, শৈলেন্দ্রনাথ সরকার, দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস, তারাপদ বিশ্বাস, পঞ্চানন বিশ্বাস, শংকর গোপাল বিশ্বাস, কৃষ্ণপদ মণ্ডল, কালিপদ বিশ্বাস, হারান মণ্ডল, তারক মণ্ডল, মুকুন্দ মণ্ডল, জিতেন্দ্রনাথ মণ্ডল, অনিল দাস, কালিপদ দাস, ধীরেন্দ্রনাথ দাস, কানাইলাল দাস, দুলাল দাস, মোহাম্মদ আলী, আব্বাস আলী, গোকুল নাথ, হরিপদ সরকার, কৃষ্ণপদ সরকার, কৃষ্ণপদ চক্রবর্তী ও সদরুদ্দীন সরদার উল্লেখযোগ্য।
দলের সঙ্গে বহিরাগত শিল্পীরাও যুক্ত ছিলেন। নৃত্যশিল্পী সূর্যকান্ত এবং যশোরের জনপ্রিয় নারী শিল্পী রানু দাস, শিলা ও তনুজা বিশেষ অনুষ্ঠানে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অংশগ্রহণ করতেন।
আজ যখন যাত্রাপালার সেই সোনালি দিন অনেকটাই ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ। তাঁর হাত ধরে গড়ে ওঠা ভৈরব অপেরা পার্টি একসময় হাজারো মানুষের বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে এবং গ্রামীণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।


























