শুক্রবার ২৬ জুন ২০২৬

১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নীল বিদ্রোহের নায়ক দিগম্বর বিশ্বাসের পুনর্বাসনের দলিল

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৮:৪৫, ২৫ জুন ২০২৬

আপডেট: ১৮:৪৬, ২৫ জুন ২০২৬

নীল বিদ্রোহের নায়ক দিগম্বর বিশ্বাসের পুনর্বাসনের দলিল

বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে নীল বিদ্রোহ এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। আর এই বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও নায়ক ছিলেন দিগম্বর বিশ্বাস। নীলকরদের শোষণ, নির্যাতন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি যে সাহসিকতার সঙ্গে কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন, তা তাঁকে বাংলার ইতিহাসে স্থায়ী আসন দিয়েছে। কিন্তু পরিহাসের বিষয়, যে মানুষটি হাজারো কৃষকের অধিকার রক্ষার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, জীবনের শেষভাগে তাকেই হতে হয়েছিল বাস্তুচ্যুত, নিঃস্ব এবং আশ্রয়হীন।


নীল বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার দিগম্বর বিশ্বাস ও তাঁর সহযোগীদের নিজেদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। শুধু ইংরেজ শাসকরাই নয়, অনেক প্রভাবশালী জমিদারও তাঁদের বিরূপ দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেন। ফলে এক সময় দিগম্বর বিশ্বাস নিজের ভিটেমাটি হারান। যশোরের চৌগাছা অঞ্চলে জন্ম ও কর্মভূমি থাকা সত্ত্বেও তিনি সেখানে নিরাপদ আশ্রয় পাননি। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার কারণে তাঁকে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াতে হয়।


অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে এক সময় তিনি আশ্রয় খুঁজে পান বনগাঁর নিকটবর্তী ছয়ঘরিয়া গ্রামে। জীবনের শেষ অধ্যায়ে মানবিক সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তৎকালীন বনগাঁ’র ভবানীপুর নীল ভূমি বাজেয়াপ্ত তালুকের নীলকুঠি এলাকার পত্তনিদার বা জমিদার ছিলেন ছয়ঘরিয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তি বিশ্বনাথ ঘোষ। তাঁর দুই পুত্র ছিলেন চন্দ্রকান্ত ঘোষ ও কালিকান্ত ঘোষ। এই কালিকান্ত ঘোষই ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ভূমিকা পালন করেন। তিনি দিগম্বর বিশ্বাসের দুর্দশা উপলব্ধি করে তাঁকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেন।
১৮৭০ সালের ২১ অক্টোবর কালিকান্ত ঘোষ তাঁদের খরিদকৃত সম্পত্তির অন্তর্গত নীলকুঠি বাড়ির সাড়ে চৌদ্দ বিঘা জমি এবং একটি অভগ্ন পাকা দালান-বাড়ি দিগম্বর বিশ্বাসের ব্যবহারের জন্য বন্দোবস্ত করে দেন। সে সময়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নদীয়া জেলার বনগ্রাম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি কবুলিয়ত দলিল সম্পাদিত হয়। দলিলের শর্ত অনুযায়ী ৫০ টাকা মূল্যে এবং বছরে ৩০ টাকা তেরো আনা খাজনা ছয় কিস্তিতে পরিশোধের ভিত্তিতে এই বন্দোবস্ত কার্যকর করা হয়।
বর্তমান বনগাঁ বিডিও অফিসের বিপরীতে নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক কুঠিবাড়িটিই হয়ে ওঠে দিগম্বর বিশ্বাসের নতুন আবাস। যে নীলকুঠি একদিন বাংলার কৃষকের শোষণ ও নির্যাতনের প্রতীক ছিল, ভাগ্যের পরিহাসে সেই কুঠিবাড়িই পরিণত হয় নীল বিদ্রোহের এক মহান নেতার শেষ আশ্রয়ে।
তৎকালীন ছয়ঘরিয়া ও জয়পুরের পশ্চিমাংশ ছিল মূলত নদীগর্ভ থেকে জেগে ওঠা চরভূমি। জনবসতি ছিল সীমিত, অবকাঠামোও ছিল অনুন্নত। এমন এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে দিগম্বর বিশ্বাস নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করেছিলেন। 
আজও নীল বিদ্রোহের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে আমরা দিগম্বর বিশ্বাসের সংগ্রামী নেতৃত্বের কথা স্মরণ করি। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ পর্বের এই বেদনাময় বাস্তবতা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। ছয়ঘরিয়ার কুঠিবাড়ি বাংলার কৃষক আন্দোলনের এক অমর নায়কের নির্বাসন, সংগ্রাম ও পুনর্বাসনের সাক্ষী। 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: