বাংলার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ একটি বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে। দেশভাগের আগে পূর্ব বাংলার রেল নেটওয়ার্ক কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল। সে সময় ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের প্রধান রেলপথ শিয়ালদহ থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গে যাতায়াতের জন্য কলকাতার পার্শ্ববর্তী রেলপথগুলো ব্যবহৃত হতো। কিন্তু দেশভাগের ফলে এই সুসংহত রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং পূর্ব বাংলার রেল নেটওয়ার্ককে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।
১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের নাম পরিবর্তন করে “পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে” (পিইআর) নামকরণ করে। তবে এরও আগে দেশভাগের পর সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দেয় খুলনার সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ নিয়ে। কারণ উত্তরাঞ্চল থেকে খুলনায় পৌঁছানোর জন্য পূর্বে ট্রেনকে দর্শনা থেকে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে হতো। দর্শনা পেরিয়ে ট্রেন রানাঘাট জংশন ও বনগাঁ জংশনের ওপর দিয়ে বেনাপোল হয়ে যশোর ও খুলনায় প্রবেশ করত।
দেশভাগের আগে শিয়ালদহ-খুলনা রেলপথ ছিল অবিভক্ত বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল রুট। কলকাতা থেকে বনগাঁ, বেনাপোল, যশোর হয়ে খুলনা পর্যন্ত রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় উনিশ শতকের শেষভাগে। বেঙ্গল সেন্ট্রাল রেলওয়ে কোম্পানি ১৮৮৪ সালে কলকাতা (শিয়ালদহ) থেকে খুলনা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ সম্পন্ন করে। এর ফলে কলকাতা ও খুলনার মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ গড়ে ওঠে এবং যশোর এই রেলপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে পরিণত হয়।
দেশভাগের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ইস্টার্ন পাকিস্তান রেলওয়ের প্রধান লাইন শিয়ালদহ থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত থাকলেও সীমান্ত বিভাজনের কারণে তা খণ্ডিত হয়ে পড়ে। উত্তরাঞ্চলের চিলাহাটি স্টেশন এবং দক্ষিণাঞ্চলের দর্শনা স্টেশন পাকিস্তানের অংশে থাকলেও মাঝখানের বৃহৎ অংশ ভারতের ভূখণ্ডে রয়ে যায়। চিলাহাটির ওপারে ছিল ভারতের হলদিবাড়ি স্টেশন এবং দর্শনার ওপারে ছিল বানপুর স্টেশন। পরবর্তীকালে ভারতীয় রেলওয়ে সীমান্তের নিকটে গেদে স্টেশন নির্মাণ করে।
এই পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলে সরাসরি রেল চলাচল কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। খুলনা ছিল ব্রডগেজ লাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শেষ স্টেশন, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর জন্য ভারতীয় রেলপথ ব্যবহার করতে হতো। স্বাধীন রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করতে ইস্টার্ন পাকিস্তান রেলওয়ে দ্রুত দর্শনা থেকে যশোর পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
জরুরি ভিত্তিতে নির্মিত দর্শনা-যশোর সংযোগ রেলপথ ১৯৫১ সালের ২১ এপ্রিল ট্রেন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এই নতুন রেলপথ চালু হওয়ার ফলে চিলাহাটি থেকে খুলনা পর্যন্ত সম্পূর্ণ পথ পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে চলে আসে। ফলে উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত স্টেশন চিলাহাটি থেকে দক্ষিণাঞ্চলের শেষ ব্রডগেজ স্টেশন খুলনা পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচলের পথ সুগম হয় এবং ভারতীয় ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরশীলতা দূর হয়।
দর্শনা-যশোর রেললাইন নির্মাণ দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই রেলপথ খুলনা, যশোর এবং উত্তরবঙ্গের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগকে শক্তিশালী করে এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রেল নেটওয়ার্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের রেল ইতিহাসে তাই ১৮৮৪ সালে কলকাতা-যশোর-খুলনা রেলপথের প্রতিষ্ঠা যেমন একটি মাইলফলক, তেমনি ১৯৫১ সালে দর্শনা-যশোর সংযোগ রেলপথ চালু হওয়াও দেশভাগ-পরবর্তী রেল যোগাযোগ পুনর্গঠনের এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।


























