কখনো ভোল্ট থেকে সোনা হারিয়ে যাচ্ছে, কখনো গোডাউন থেকে চুরি হচ্ছে বিপুল পরিমান পণ্য। এর আগে ভল্ট ভেঙে প্রায় ২০ কেজি স্বর্ণবার চুরি হয়। ৭ কোটি টাকার পণ্য পাচারের ঘটনায় মামলা হয় ৪৩ জনের বিরুদ্ধে। যার রেশ এখনো কাটেনি। এরই মধ্যে নতুন করে কাস্টমসের নিজস্ব পণ্যাগার থেকে পণ্য পাচারের ঘটনা ঘটলো।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের নিজস্ব গোডাউন থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর নামে প্রায় ৩ কোটি টাকার পণ্য পাচারের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আটক কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাসহ তিনজনকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। একই ঘটনায় দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাসহ পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
এর আগে ২০১৯ সালে বেনাপোল কাস্টমসের ভল্ট ভেঙে ১৯ কেজি ৩১৮ গ্রাম স্বর্ণবার চুরির ঘটনায় কাস্টমসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। ৭ কোটি টাকার পণ্য পাচারের ঘটনায় মামলা হয়েছিলো ৪৩ জনের বিরুদ্ধে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভোল্ট থেকে কখনো সোনা হারিয়ে যাচ্ছে, কখনো গোডাউন থেকে চুরি হচ্ছে বিপুল পরিমান পণ্য। এর আগে ৭ কোটি টাকার পণ্য পাচারের ঘটনায় ৪৩ জনের বিরুদ্ধে মামলার রেশ এখনো কাটেনি। এরই মধ্যে নতুন করে কাস্টমসের নিজস্ব পণ্যাগার থেকে পণ্য পাচারের ঘটনা বেনাপোল কাস্টমস হাউসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও নজরদারিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
অভিযোগ সূত্র বলছে, বেনাপোল কাস্টমস হাউসের নিজস্ব গোডাউনে সংরক্ষিত বাজেয়াপ্ত পণ্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর কথা বলে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত পণ্য বের করে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। বিষয়টি জানতে পেরে সোমবার গভীর রাতে বেনাপোল বাজার এলাকা থেকে একটি কাভার্ডভ্যান ভর্তি পণ্যসহ কাস্টমসের এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও আরও দুইজনকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশÑবিজিবি।
বিজিবির আটক করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে ৬ হাজার ৮পিস শাড়ি, ৩৩ হাজার ২২২টি প্রসাধনী সামগ্রী, ৩৮৬পিস কম্বল, ২০৮পিস চাদও, ৮পিস ওড়না এবং ৬৩৪ পিস থ্রি-পিস। সব মিলিয়ে এসব পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা।
সূত্র বলছে, ঘটনার পর বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে। তদন্তে পণ্য পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিত মুখার্জি, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী এবং সিপাহী সাগর হোসেনসহ পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধের দায় কাস্টমস বহন করবে না। প্রাথমিক তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
কাস্টমস সূত্র বলছে, বিভিন্ন সময় আটক অবৈধ পণ্য কাস্টমসের গোডাউনে সংরক্ষণ করা হয়। পরে এসব পণ্য কখনো নিলামে বিক্রি করা হয়, আবার কখনো প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানো হয়।
গত ২৪ মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডÑএনবিআর পৃথক দুটি চিঠিতে বেনাপোল কাস্টমসের গোডাউনে থাকা বাজেয়াপ্ত পণ্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
এনবিআরের একটি চিঠিতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিত মুখার্জিকে পণ্য পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। অপর চিঠিতে পণ্য পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরীকে।
তবে এনবিআরের নির্দেশনার প্রায় এক মাস পর ২১ জুন গভীর রাতে ত্রাণের পণ্য পাঠানোর নাম করে দুটি কাভার্ডভ্যানে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্যও তোলা তোলা হয়।
পরে বিজিবি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে একটি কাভার্ডভ্যান আটক করে। বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় কাস্টমস কর্মকর্তাসহ তিনজনকে আটক করা হয়।
অপর কাভার্ডভ্যানটি আটকের খবর পেয়ে কাস্টমস এলাকা থেকে বের করা হয়নি। পরে সেটিতে তল্লাশি চালিয়ে ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেনাপোলের ব্যবসায়ীরা। বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, ‘এ যেন রক্ষকই ভক্ষক। কাস্টমসের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। কালো টাকার পাহাড় গড়ছে দুর্নীতিবাজরা।’
দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেবেন বলে আশা করেন তিনি।
বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) শেখ আব্দুল হাই জানান, সোমবার রাত ১১টার দিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে বিজিবি সদস্যরা তিনজনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে। মঙ্গলবার দুপুরে তাদের যশোর আদালতে পাঠানো হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে একজন কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা রয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এভাবে ভোল্ট থেকে কখনো সোনা হারিয়ে যাচ্ছে, কখনো গোডাউন থেকে চুরি হচ্ছে বিপুল পরিমান পণ্য। ৭ কোটি টাকার পণ্য পাচারের ঘটনায় ৪৩ জনের বিরুদ্ধে মামলার রেশ এখনো কাটেনি। এরই মধ্যে নতুন করে কাস্টমসের নিজস্ব পণ্যাগার থেকে পণ্য পাচারের ঘটনা বন্দরের নিরাপত্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।


























