বরিশাল বাংলাদেশের একমাত্র বিভাগ যেখানে আজ পর্যন্ত কোনো রেলপথ নির্মিত হয়নি। শুধু তাই নয়, ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই বরিশালে রেললাইন ছিল না। অথচ ব্রিটিশ আমল থেকে দীর্ঘদিন ধরে “বরিশাল এক্সপ্রেস” নামে একটি ট্রেন চলাচল করত। নাম শুনে মনে হতে পারে ট্রেনটি বরিশাল পর্যন্ত যেত। বাস্তবে তা নয়। ট্রেনটি কখনও বরিশালে প্রবেশ করেনি। তবুও বরিশালের মানুষের কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই এর নামকরণ করা হয়েছিল ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’।
উনিশ শতকের শেষভাগে নদীপথে বরিশাল থেকে খুলনা কিংবা যশোরে এসে যাত্রীরা এই ট্রেনে উঠে কলকাতায় যেতেন। সে কারণেই শিয়ালদহ-যশোর-খুলনা রুটে চলাচলকারী ট্রেনটির নামের সঙ্গে বরিশালের পরিচয় যুক্ত করা হয়েছিল। আপ ও ডাউন মিলিয়ে ট্রেনটির নম্বর ছিল ৩১ ও ৩২। এটি খুলনা থেকে সকাল সাড়ে আটটায় ছেড়ে বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছাত।
১৮৮২ সালে খুলনা একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। চব্বিশ পরগনার সাতক্ষীরা মহকুমা এবং যশোর জেলার বাগেরহাট মহকুমা নিয়ে নতুন এ জেলার সৃষ্টি হয়। বাণিজ্যিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশ আমলে খুলনা দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। তবে জেলা ঘোষণার পর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে। এর ফলে এ অঞ্চলে রেলপথ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
সেই সময় বাংলাদেশের প্রাচীনতম জেলা যশোরেও কোনো রেলপথ ছিল না। খুলনাতেও রেল যোগাযোগের অভাব ছিল। ব্রিটিশ সরকার তাই রেলপথ নির্মাণে বিভিন্ন কোম্পানিকে উৎসাহিত করে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় বেঙ্গল সেন্ট্রাল রেলওয়ে কোম্পানি। প্রতিষ্ঠার পরপরই কোম্পানিটি সম্ভাব্য রেলপথের জরিপ ও ভূমি যাচাইয়ের কাজ শুরু করে এবং ১৮৮২ সালেই নির্মাণ ব্যয়ের হিসাব সরকারকে জমা দেয়। রুটটির সম্ভাব্য লাভজনকতা বিবেচনায় ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যশোর-খুলনা অঞ্চলে রেলপথ স্থাপনের লক্ষ্যে একযোগে দুটি লাইনের কাজ শুরু হয়। ১৮৬২ সালে নির্মিত শিয়ালদহ-জগতি রেলপথের রানাঘাট থেকে বনগাঁ পর্যন্ত একটি ব্রডগেজ লাইন সম্প্রসারণ করা হয়। একই সঙ্গে শিয়ালদহ থেকে দমদম হয়ে বনগাঁ পর্যন্ত আরেকটি নতুন রেললাইন নির্মাণ করা হয়। ফলে বনগাঁ গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
এরপর বনগাঁ থেকে পেট্রাপোল ও বেনাপোল হয়ে রেলপথ যশোরে আনা হয়। যশোর থেকে নওয়াপাড়া, বেজেরডাঙ্গা ও ফুলতলা হয়ে রেললাইন পৌঁছে যায় খুলনা পর্যন্ত। খুলনাকেই নির্ধারণ করা হয় এই রেলপথের প্রান্তিক স্টেশন হিসেবে। ১৮৮৪ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর একই বছর ট্রেন চলাচল শুরু হয়। ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’-এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যশোর ও খুলনা অঞ্চলে রেলযুগের সূচনা ঘটে।
রেলপথ আগমনের ঘটনা সে সময়ের মানুষের কাছে ছিল এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। হিসহিস শব্দে বাঁশি বাজিয়ে যখন বরিশাল এক্সপ্রেস স্টেশনে প্রবেশ করত, তখন আশপাশের এলাকা কৌতূহলী মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠত। রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার ফলে খুলনায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে এবং যশোর শহর নতুন অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্যে জেগে ওঠে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বেনাপোল সীমান্তের মাধ্যমে শিয়ালদহের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে বেনাপোল থেকে খুলনা পর্যন্ত অংশটি কার্যত বিচ্ছিন্ন রেলপথে পরিণত হয়। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকার দ্রুত যশোর থেকে দর্শনা পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ১৯৫১ সালের ২১ এপ্রিল এ রেললাইন চালু হলে খুলনা অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানের মূল রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর ফলে খুলনা থেকে চিলাহাটি পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন ব্রডগেজ রেলযোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়।


























