মঙ্গলবার ০৯ জুন ২০২৬

২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও উন্নত হয়নি দশপাখিয়া-বাড়িয়ালী সড়ক

সড়কের বেহাল দশায় দুই কিলোমিটারের গন্তব্যে দশ কিলোমিটারের ঘুরপথ

উবাঈদ সামি

প্রকাশিত: ১৫:০৭, ৮ জুন ২০২৬

সড়কের বেহাল দশায় দুই কিলোমিটারের গন্তব্যে দশ কিলোমিটারের ঘুরপথ

দশপাখিয়া থেকে বাড়িয়ালী। দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার। যশোরের চৌগাছা উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের ওই দুটি গ্রামে এবং দুইটি ইউনিয়নকে সংযুক্ত করছে এই সড়কটি। অথচ দেশ স্বাধীনের পর ৫৪ বছর পেরোলেও গ্রামীণ এই সড়কটির কোনো উন্নয়ন হয়নি। স্থানীয়র জানান, পিচ ঢালাই দূরে থাক সড়কটিতে কখনো সলিংও হয়নি (হেরিং বন্ড)। ফলে বর্ষাকালে কাদাপানি ও শুষ্ক মৌসুমে ধূলোর যন্ত্রণায় দুভোর্গ পোহান হাজারো মানুষ। এ ছাড়া বেহলা সড়কের কারণে দশ কিলোমিটার ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। 


দশপাখিয়া থেকে বাড়ীয়ালী সড়কটি পাশাপোল ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে ফুলসারা ইউনিয়ন পরিষদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। এই পথেই প্রতিদিন হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, ব্যবসায়ী সবার ভরসা এই রাস্তা। কিন্তু রাস্তার বেহাল দশার কারণে এখন বিকল্প পথে দশ কিলোমিটার ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। এই রাস্তাদিয়ে পাঁচ হাজার বিঘা জমির ফসল ঘরে তোলা হয়।


দশপাখিয়াতে রয়েছে- দশপাখিয়া বাজার, দশপাখিয়া পুলিশ ফাঁড়ি, দশপাখিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়। অপরদিকে, বাড়ীয়ালীতে রয়েছে বাড়ীয়ালী বাজার, বাড়ীয়ালী ইউনিয়ন ভূমি অফিস, পাশাপোল (বাড়ীয়ালী) ইউনিয়ন পরিষদ, পাশাপোল (বাড়ীয়ালী) ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র হাসপাতাল, বাড়ীয়ালী ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, বাড়ীয়ালী তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্র, বাড়ীয়ালী হাউলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাড়ীয়ালী যুব পাঠাগার ও বাড়ীয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও এতিমখানা ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা। ফলে দুই এলাকার মানুষকে সেবা নিতে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করতে হয়।  
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময় রাস্তাটিতে মাইল মিটার বসানো হয়েছিল। কার্পেটিংয়ের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যান অবাইদুল ইসলাম সবুজ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজটি বন্ধ করে দেন। স্থানীয়দের দাবি, তিনি রাস্তার বরাদ্দ কেটে নিয়ে নিজ গ্রামের দিকে কাজ সরিয়ে নিয়েছেন। ফলে দশপাখিয়া-বাড়ীয়ালী অংশটি অবহেলিত থেকে গেছে।  
এ বিষয়ে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান অবাইদুল ইসলাম সবুজের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।   
সরেজমিনে দেখা গেছে, সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তাটি কাদায় একাকার হয়ে যায়। কোথাও হাঁটু সমান গর্ত। গরুর গাড়ি তো দূরের কথা, পায়ে হেঁটে চলাও কঠিন। শুকনো মৌসুমে আবার ধুলায় অন্ধকার হয়ে থাকে পুরো এলাকা। রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে অনেকে গরুর গাড়ি ব্যবহার করেন।  


বাড়ীয়ালী হাউলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমাদের স্কুল বাড়ীয়ালী পশ্চিম পাড়া থেকে দুই কিলোমিটার। কিন্তু রাস্তা খারাপ বলে ফুলসারা ও সলুয়া ঘুরে যেতে হয়। এতে ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। সময় ও ভাড়া দুটোই বেশি লাগে। বৃষ্টি হলে স্কুলেই যেতে পারি না।  


দশপাখিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানিয়া খাতুন জানায়, কাদার মধ্যে পড়ে জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় বই খাতা ভিজে যায়।”
বাড়ীয়ালী বাজারের ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলেন, এই রাস্তার কারণে মালামাল আনা নেওয়া করতে পারি না। ভ্যান খরচ তিনগুণ বেড়ে গেছে। রোগী মারা গেলেও সময়মতো হাসপাতালে নিতে পারি না। 
দশপাখিয়া গ্রামের গৃহবধূ রাশেদা বেগম বলেন, গর্ভবতী নারীদের এই পথে হাসপাতালে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। ঝাঁকিতে অনেকের সমস্যা হয়। আমরা কি মানুষ না? আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই।  
পাশাপোল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের বলেন, রাস্তাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বারবার উপজেলা পরিষদে বলেছি। কিন্তু বরাদ্দ আসে না। কেন আসে না তা বর্তমান জন প্রতিনিধিরা ভালো বলতে পারবেন।

 
চৌগাছা উপজেলা প্রকৌশলী সিদ্ধার্থ কুমার কুণ্ডু বলেন, দশপাখিয়া-বাড়ীয়ালী সড়কের দৈর্ঘ্য ২ কিলোমিটার। বর্তমান আমাদের হাতে যশোরের কোন প্রকল্প নেই, তবে এমপি মহোদয়ের হাতের থোক বরাদ্দের কিছু কাজ আছে। আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রাস্তাটি সংস্কারের জন্য প্রস্তাব পাঠানোর ব্যবস্থা করব। বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু হবে।  
স্থানীয় বাসিন্দা শাহ্ আলম বলছেন, দুই কিলোমিটার রাস্তার জন্য বারো কিলোমিটার ঘোরা আর কতদিন? শিশু, বৃদ্ধ, রোগী সবার কষ্টের সীমা নেই। নির্বাচন এলে প্রতিশ্রুতি মেলে, কিন্তু ভোট শেষে সবাই ভুলে যায়।  


দশপাখিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হক বলেন, গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে আমাদের দাবি, দ্রুত রাস্তাটি কার্পেটিং করে চলাচলের উপযোগী করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। না হলে বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।  
একটি রাস্তার অভাবে হাজারো মানুষের জীবন থমকে আছে। কবে শেষ হবে এই দুর্ভোগ, সেই অপেক্ষায় দশপাখিয়া ও বাড়ীয়ালীর মানুষ।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: