গত ডিসেম্বরে ঝিনাইদহের ঐতিহাসিক স্থানগুলো ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে গিয়েছিলাম শৈলকূপা। মূল গন্তব্য ছিল বাগুটিয়ায় বিপ্লবী নেত্রী ইলা মিত্র-এর পৈতৃক ভিটে। কিন্তু তার আগেই পথে হঠাৎ চোখে পড়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুরোনো স্থাপনা ‘আবাইপুর জমিদার বাড়ি’।
যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের সম্প্রসারণ কাজ চলায় বিকল্প পথ ধরতে হয়েছিল। যশোর থেকে খাজুরা বাজার হয়ে কালীগঞ্জের চতুরবাড়িয়া, মাগুরার শালিখার সিংড়া বাজার ও ধলেশ্বরগাতী পেরিয়ে আলমখালী বাজারে উঠে পৌঁছাই হাটগোপালপুরে। সেখান থেকে উত্তরের সড়ক ধরে হাটফাজিলপুরের পথে যেতেই রাস্তার পূর্ব পাশে দেখা মেলে আবাইপুর জমিদার বাড়ির। স্থানীয়দের কাছে এটি এখনো “শিকদার স্ট্রিট” নামেই বেশি পরিচিত।
একসময় এই অঞ্চলে শিকদার পরিবারের ছিল বিপুল প্রতাপ। জানা যায়, ১২০০ বঙ্গাব্দের মাঝামাঝি সময়ে জমিদার রামসুন্দর শিকদার বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলায় এই বিশাল জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন। তাদের পূর্বপুরুষদের উপাধি ছিল ‘তিলিকুণ্ড’। পরে রামসুন্দরের ঠাকুরদাদা কার্তিক শিকদার মুর্শিদাবাদের নবাবের কাছ থেকে ‘শিকদার’ উপাধি লাভ করেন। সেই থেকেই তারা শিকদার বংশ হিসেবে পরিচিতি পান।
রামসুন্দর শিকদার শুধু জমিদার ছিলেন না, ছিলেন দূরদর্শী উদ্যোক্তাও। তিনি এখানে সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, থিয়েটার হল এবং একটি বড় বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে আবাইপুর ধীরে ধীরে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। পাশের কুমার নদ ছিল তথকন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। যাইহোক, তার সাত পুত্র ছিল। ১২৭০ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ তিনি মৃত্যুবরণ করলে সন্তানরা যৌথভাবে জমিদারি ও ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকেন।
পরবর্তীতে ‘শিকদার এণ্ড কোম্পানি’ নামে তাদের পাট ব্যবসা বাংলাজুড়ে খ্যাতি অর্জন করে। বাংলা ১৩০৪ সালে ব্যবসায় তারা বড় সাফল্য লাভ করেন এবং ১৩১৯ সালে তাদের উৎপাদিত পাট বিশ্বমানের স্বীকৃতি পায়। কথিত আছে, সেই সাফল্যের জন্য তৎকালীন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন তাদের “প্রিন্স অব জুট বেলার্স” উপাধিতে ভূষিত করেন।
সময় অবশ্য কোনো ঐশ্বর্যই চিরস্থায়ী রাখে না। উত্তরসূরিদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যায়। কেউ বিদেশে চলে যান, কেউ সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায় শিকদারদের জমিদারি ঐতিহ্য। তবে পিতার স্মৃতিকে ধরে রাখতে রামসুন্দর শিকদারের পুত্ররা তার মৃত্যুর ২৫ বছর পর আবাইপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন “রামসুন্দর ইনস্টিটিউট” উচ্চ বিদ্যালয়।
প্রায় চারশো বিঘা জমির ওপর নির্মিত দ্বিতল এই প্রাসাদ এখন আর আগের জৌলুস ধরে রাখতে পারেনি। বিশাল ভবনের অনেকাংশই ধ্বংসপ্রায়। কোথাও দেয়াল ভেঙে পড়েছে, কোথাও সময়ের ক্ষয়ে মুছে গেছে কারুকাজ।
বর্তমানে প্রাসাদের একাংশে স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিস পরিচালিত হচ্ছে। অন্য অংশে এখনো বসবাস করেন জমিদার পরিবারের উত্তরসূরিরা। তাদের কাছেই সংরক্ষিত রয়েছে জমিদার বাড়ির ব্যবহৃত কিছু দুর্লভ নিদর্শন, একটি সচল বিশাল গ্রামোফোন বা কলের গান, পাথরের তৈরি হুক্কা, প্রাচীন তরবারি, পুরোনো শ্রীমদ্ভাগবত, বাদ্যযন্ত্র এসরাজ, শালকাঠের তৈরি দুটি পুরোনো মন্দির এবং রূপার জরির নকশা করা বেনারসি শাড়ির অংশবিশেষ। এসব এখন মূলত রামসুন্দর শিকদারের উত্তরসূরি রাজকুমার শিকদারের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।


























