ঊনবিংশ শতাব্দীর যশোর ছিল প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ। কিন্তু সেই সময়ের সমাজজীবনের অনেক দিক আজকের পাঠকের কাছে বিস্ময়কর, এমনকি অস্বস্তিকরও মনে হতে পারে। সমাজের উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জীবনযাপন, আমোদ-প্রমোদ, সামাজিক মর্যাদার ধারণা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা চিত্র উঠে এসেছে সমকালীন লেখকদের স্মৃতিকথা ও গ্রন্থে। বিশেষ করে শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গীয় সমাজ’ এবং কবি নবীনচন্দ্র সেনের আত্মস্মৃতিতে ঊনবিংশ শতাব্দীর যশোরের সমাজজীবনের এমন কিছু বাস্তব চিত্র সংরক্ষিত রয়েছে, যা ইতিহাসের মূল্যবান দলিল।
শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর গ্রন্থে যশোরের অবস্থাশালী সমাজের একটি ব্যতিক্রমী দিক তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, সে সময় যশোর শহরে আদালতের আমলা, মোক্তার ও অন্যান্য পদস্থ ব্যক্তিদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে বলা হতো- ‘ইনি ইহার রক্ষিত স্ত্রীলোকের পাকা বাড়ি করিয়া দিয়াছেন।’ অর্থাৎ রক্ষিতা নারীর জন্য একটি পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিপত্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি যতই বিস্ময়কর মনে হোক না কেন, তৎকালীন সমাজের একাংশে এটি ছিল সামাজিক অবস্থান প্রকাশের এক ধরনের অলিখিত মানদণ্ড।
এই সমাজবাস্তবতার মধ্যেই ১৮৬৯ সালের ২৪ জুলাই মাত্র একুশ বছর বয়সে যশোরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে যোগ দেন পরবর্তী কালের খ্যাতিমান কবি নবীনচন্দ্র সেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ সাটক্লিফের সুপারিশে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনিক চাকরিতে যোগ দেন তিনি।
যশোরে প্রথম আগমনের অভিজ্ঞতা তিনি স্মৃতিচারণায় অত্যন্ত প্রাণবন্ত ভাষায় তুলে ধরেছেন। কলকাতা থেকে রেলপথে চাকদহ পর্যন্ত এসে সেখান থেকে প্রায় পঞ্চাশ মাইল পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল এক অদ্ভুত ধরনের ঘোড়ার গাড়িতে। রসিকতার সুরে তিনি লিখেছেন, সেই যানকে স্থানীয় লোকজন অত্যুক্তি করে ঘোড়ার গাড়ি বলত। সারাদিনের ধুলাবালি, ঝাঁকুনি আর কষ্টকর ভ্রমণের পর বিকেল পাঁচটার দিকে তিনি যশোরে পৌঁছে আইনজীবী কেশবলাল ধরের বাসায় ওঠেন।
পরদিন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মনরো সাহেবের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎও ছিল স্মরণীয়। মনরো সাহেব শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বই বুঝিয়ে দেননি, বরং যশোর শহরের একটি মানচিত্র এঁকে কার সঙ্গে মিশতে হবে, কার সঙ্গে মিশতে হবে না, কে মদ্যপ, কে নিয়মিত বেশ্যালয়ে যায়- এসব বিষয় নিয়েও দীর্ঘ উপদেশ দিয়েছিলেন। নতুন এক তরুণ কর্মকর্তার জন্য এটি ছিল প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি তৎকালীন সমাজ সম্পর্কে এক ধরনের বাস্তব পাঠ।
যশোরে দায়িত্ব পালনের সময় নবীনচন্দ্র সেন এমন একটি ঘটনার মুখোমুখি হন, যা তৎকালীন সরকারি কর্মকর্তা ও শহরের অবস্থাশালী ব্যক্তিদের আমোদ-প্রমোদের এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। এক সন্ধ্যায় বিদ্যারত্ন মহাশয়ের বাড়িতে আয়োজিত এক আসরে তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে গান, বাদ্য, নৃত্য এবং মদ্যপানের আসর জমে ওঠে। নবীনচন্দ্র নিজে একটি রূপার বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। নৃত্যশিল্পীকে বকশিশ হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার বাবু অলংকৃত করে তাঁর দিকে এগিয়ে দিলে তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বস্তি প্রকাশ করেন। এই আচরণ উপস্থিত অনেকের কাছে অপমানজনক বলে বিবেচিত হয়।
এর পরেই ঘটনাটি ভয়াবহ মোড় নেয়। গভীর রাতে মাতাল অবস্থায় ইঞ্জিনিয়ার বাবু, হেডমাস্টার এবং একজন তত্ত্বাবধায়ক নবীনচন্দ্র সেনের বাসায় গিয়ে তাঁর ভৃত্য ও পাচক ব্রাহ্মণকে মারধর করেন এবং ঘরের আসবাবপত্র উঠানে ছুড়ে ফেলেন। খবর পেয়ে নবীনচন্দ্র বাসায় ফিরতে সাহস পাননি। পরে হেডমাস্টার তাঁকে প্রায় জোর করেই বিছানা থেকে তুলে বাইরে নিয়ে আসেন। মাতাল ইঞ্জিনিয়ার বাবুর হাতে ছিল বিশাল লাঠি। তাঁকে ঘিরে বিদ্রুপ, হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এদিকে প্রহৃত ব্রাহ্মণ পাচক অভিযোগ দায়েরের জন্য দরখাস্ত প্রস্তুত করেন। এতে ইঞ্জিনিয়ার বাবুর পাশাপাশি উপস্থিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও সাক্ষী করা হয়। এতে নবীনচন্দ্র সেন মারাত্মক বিপাকে পড়ে যান। পরে বহু অনুরোধ, বোঝাপড়া এবং নানা কৌশলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। শেষ পর্যন্ত বিদ্যারত্নের বদলি এবং পাচক ব্রাহ্মণকে তাঁর সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সম্ভাব্য ফৌজদারি মামলার আশঙ্কা এড়ানো সম্ভব হয়।
নবীনচন্দ্র সেনের এই স্মৃতিচারণ ঊনবিংশ শতাব্দীর যশোরের সমাজজীবনের এক বিরল দলিল। এখানে যেমন দেখা যায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দায়িত্ববোধ, তেমনি দেখা যায় ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন, মদ্যপ আসর, সামাজিক প্রভাব খাটানো এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বাস্তব চিত্র।

























