মাগুরার সীতারামের নাম কে না চেনে। তিনি অপূর্ব বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। তার কথা আমরা কম বেশি সবাই জানি। কিন্তু তাঁর মা- বীরঙ্গনা দয়াময়ীর বীরত্বের কাহিনি আমরা কম জানি।
যশোর জেলার মধুমতী নদীর তীরে শ্যামপুর গ্রাম। সেই গ্রামে বাস করতেন উদয়নারায়ণ রায়। তিনি ছিলেন জমিদার। তার পূর্বপুরুষের বহু অর্থ ছিল। নিজের চেষ্টাও তিনি বহু জমিজমা করে বেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। শ্যামপুর গ্রামের এক প্রান্তে ছিল তাঁর বাড়ি। চারদিক বনজঙ্গলে ঘেরা, গভীর বাঁশবন, অশ্বত্থ, বট, পাকুড়, দেবদারু নানা গাছে ঢাকা। এক দিঘির পাড়ে ছিল উদয়নারায়ণের প্রকাণ্ড বাড়ি। সেই বাড়িতে সব সময় আত্মীয়-স্বজন থাকত। উদয় নারায়ণকে সবাই শ্রদ্ধা ও ভক্তি করত। অসাধারণ বুদ্ধিমান যোদ্ধা এবং সাহসী ছিলেন উদয়নারায়ণ। লাঠি খেলতে, ঘোড়ায় চড়তে, তলোয়ার ধরতে তাঁর সমকক্ষ বীর বড় একটা দেখা যেত না। তাঁর হাঁক-ডাকে দশটি গ্রামের লোক তাঁকে মাতব্বর বলে মানত। এই বীর উদয়নারায়ণের পত্নীর নাম ছিল দয়াময়ী। উদয়নারায়ণ রায় ছিলেন উত্তররাঢ়ীয় কায়স্থ।
সপ্তদশ শতাব্দীতেও বাংলাদেশের অবস্থা বিশেষ সুবিধাজনক ছিল না। চোর-দস্যু-ডাকাতের উপদ্রব ছিল অত্যন্ত বেশি। তখন চলিত কথা ছিল, ‘যার লাঠি তার মাটি’। প্রত্যেক জমিদার বাড়িতে থাকত বরকন্দাজ। যে-কোনো ধনী ব্যক্তি তাঁর বাড়িঘর রক্ষার জন্য বাড়িতে বরকন্দাজ রাখতেন এবং তাদের লাঠির জোরে জমি দখল করতেন, দস্যু-ডাকাত দমন করতেন। সেকালে পুরুষদের মত সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েরাও লাঠি ধরতে, তলোয়ার চালাতে, বর্শা ছুড়ে মারতে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। না করে উপায়ও ছিল না। কখন ডাকাত পড়ে, কখন পর্তুগিজ ফিরিঙ্গিরা গ্রাম লুঠ করে, তার ঠিক ছিল না। তখনকার দিনে মধুমতী শ্যামপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যেত প্রবলবেগে। সেই নদীর স্রোতে উজান ও ভাটি বুঝে দস্যুরা এক এক গ্রামে এসে পড়ত এবং লুঠতরাজ আর রাহাজানি করে পালিয়ে যেত। সেকালে রহিম খাঁ পাঠান যশোর জেলার একজন বিখ্যাত দস্যু ছিল। তার দলে হিন্দু ছিল, মুসলমান ছিল, হিন্দুস্থানি, ভোজপুরি, ফিরিঙ্গি, সব জাতির এবং সব দেশের লোক ছিল। রহিম খাঁ দীর্ঘকায়, বলিষ্ঠ এবং রণনিপুণ ব্যক্তি ছিল। সে ছিল আফগান সৈনিক, নবাবের ফৌজ; কিন্তু গোপনে দস্যুবৃত্তি করত। একথা জানাজানি হলে তাকে নবাব সরকার থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। রহিম তাতে দমল না। সে পুনরায় আরম্ভ করল দস্যুবৃত্তি। দলে লোক জুটল। নিবিড় বনে নানা স্থানে নানা জেলায় ছিল তাদের আড্ডা। এই সব ডাকাত দলের মধ্যে একটা বিষয় লক্ষ্য করার ছিল এই যে, তাদের মধ্যে কোনরূপ জাতিভেদ বা দলাদলি ছিল না। হিন্দু-মুসলমান ভেদ ছিল না। রহিম খাঁ সাহেব উদয় নারায়ণকে দেখতে পারত না। তার কারণ ছিল— উদয়নারায়ণ কয়েকবার রহিম খাঁর দলকে জব্দ করেছিলেন। পাঠান রহিম খাঁ প্রতিশোধের সুযোগ খুঁজছিল। উদয়নারায়ণের ভয়ে সে শ্যামপুরের আশেপাশের গাঁয়ে ডাকাতি করতে পারেনি। একবার উদয়নারায়ণ দূর গাঁয়ে তাঁর কাছারি-বাড়ি গিয়াছেন খাজনা ও অন্যান্য বিষয়ের খোঁজখবর করতে। বাড়িতে অল্পসংখ্যক বরকন্দাজ আর শিশু পুত্রকন্যা, ছিলেন পত্নী দয়াময়ী। এ সংবাদ রহিম খাঁর দলের অজানা ছিল না। তারা জানতে পারল-উদয়নারায়ণের দেশে ফিরতে প্রায় দুই-তিন মাস বিলম্ব হবে। মহা-উৎসাহে মেতে উঠল দস্যুদল। এমন সুযোগ কি ছাড়া যায়! কৃষ্ণপক্ষের রাত, গভীর অন্ধকার। শ্যামপুর পল্লী নীরব নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে শিয়াল ডাকছে। কুকুরেরা কোন গৃহস্থ-বাড়ির ঢেঁকিশাল থেকে ঘেউ-ঘেউ শব্দ করছে। দস্যুদল একটা খালের ধার দিয়ে চলল উদয়নারায়ণের বাড়ি। বাড়ির চারদিকে বেড়ার গভীর পরিখা। পানি থৈ-থৈ করছে। পরিখার পরে বাড়ির চারদিক বেড়া দেয়া প্রাচীর। শুধু সামনের দিক দিয়ে একটা প্রকাণ্ড পথ বাড়ির তোরণ পর্যন্ত গিয়েছে। দুইধারে আম ও বকুল গাছের সারি। কাছারি-বাড়ি, বরকন্দাজদের থাকবার ঘর। সদর দরজার দুই ধারে রহিম খাঁ নিজে তার দলের সাহসী ও দুর্র্ধষ ডাকাতদের নিয়ে উদয়নারায়ণের বাড়ি ডাকাতি করতে চলল। সঙ্গে সে ছোট একটা ডিঙি নৌকা এনেছিল। তা দিয়ে তারা পরিখা পার হল এবং প্রাচীর বেয়ে, কেউ বা গাছে উঠল দেয়াল টপকিয়ে, কেউ বাড়ির ভেতরের মন্দিরের চূড়া ধরে দলে দলে চারদিক হতে বাড়ির ভিতরে নামতে লাগল, কেউ দরজার কপাট ভাঙতে শুরু করল। অপরদিকে সদর দেউড়িতে দেখা দিল আর একদল ডাকাত। তাদের সঙ্গে আরম্ভ হল হাতাহাতি লড়াই। চারদিকের গোলমাল, হৈ-চৈ ও ভীষণ চিৎকারে দয়াময়ীর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি শিশু সীতারামকে নিয়ে পরিচারিকাসহ শুয়েছিলেন। জেগে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলেন তারা বাড়ি আক্রমণ করেছে-অন্দরের দিকে ছুটে আসছে। ভীষণ তাদের মূর্তি! কারও এক হাতে মশাল, অন্য হাতে বল্লম, কারও হাতে তলোয়ার৷
তিনি পরিচারিকাকে বললেন- শিশুদের রক্ষা কর। আমি ডাকাত তাড়াব- নয় মরব। কি এত বড় আস্পর্ধা– আমাদের বাড়ি লুঠ করবে রহিম খাঁ পাঠান। অসহ্য। দয়াময়ী শক্ত করে কাঁচুলি পরলেন, পুরুষের মত কাপড় পরলেন- তারপর এক হাতে সুতীক্ষ্ণ দীর্ঘ তরবারি আর অন্য হাতে বল্লম নিয়ে চললেন ডাকাত তাড়াতে! পরিচারিকা চিৎকার করে উঠল- মা-মা- এমন দুঃসাহসের কাজ করবেন না। চলুন খিড়কির দরজা দিয়ে পালাই। দয়াময়ী গর্জে উঠলেন- পালাব? কার ভয়ে বলত? কখনো নয়–কখনো নয়!-আর একটিও কথা না বলে চললেন তিনি ডাকাতদের অন্দর- মহল হইতে তাড়িয়ে দিতে। যেই পথে তিনি নীচে নামছিলেন, সেই পথে সিঁড়ি দিয়ে ডাকাতেরা উপরে উঠছিল। সেই পথেই দেখা হইল দস্যুদের সঙ্গে। স্তিমিত আলোকে এই রণরঙ্গিনী নারীকে দেখে দস্যুরা চমকিয়ে উঠল—দুই পা পিছিয়ে গেল। দয়াময়ী সেই মুহূর্তে বর্শা ছুড়ে মারলেন এক ডাকাতকে লক্ষ্য করে। বর্শা ডাকাতের বুকে বিঁধে গেল। উঃ আঃ করতে করতে প্রাণ হারাল। অপর দস্যুরা ভয়ে দৌড়ে পলাল। দয়াময়ী নীচে ছুটে চললেন সদর দেউড়ির দিকে। খা’র সাথে বরকন্দাজদের লড়াই চলছিল ভীষণভাবে। এমনি সময়ে সেখানে এসে বল্লম হতে দাঁড়ালেন তেজস্বিনী মহিমময়ী, নির্ভীকা বীরাঙ্গনা দয়াময়ী। সে কী অপূর্ব মূর্তি। বরকন্দাজদের সর্দার রঘুনাথ তাঁকে দেখে নতমস্তকে প্রণাম করে বলে উঠল- মা, আপনি! আপনি কেন? দৃপ্তকণ্ঠে দয়াময়ী জবাব দিলেন- হাঁ বাবা, আমি। কর্তা নেই বলে কি ডাকাতের আক্রমণে ভয় পাব? ভাল করে লড়াই কর। আমিও তোমাদের সঙ্গে থেকে লড়ব।
দলে দলে গ্রামের লোক রায় বাড়িতে ডাকাত পড়েছে শুনে এসে যোগ দিল ডাকাত তাড়াতে! দয়াময়ী আরম্ভ করলেন লড়াই। তাঁকে দেখে গ্রামের লোকের মধ্যে মহা-উৎসাহের সঞ্চার হল! মধ্যস্থলে তাঁকে রেখে তারা মহা-বীরত্বের সাথে ডাকাতদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগল। রহিম খাঁর দলের লোকেরা ভয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিল। ডাকাতরা দয়াময়ীর তলোয়ারের ঘায়ে একে একে প্রাণ দিতে লাগল। একদিকে রঘুনাথ সর্দার আর অপরদিকে দয়াময়ী। এই দুইজনের অসাধারণ বীরত্ব ও শৌর্যের নিকট ডাকাতেরা হার মেনেছিল। কি অপূর্ব তাঁদের লড়াই-শিক্ষা।
রহিম সর্দার গর্জে উঠল- কি, একটা জেনানার কাছে হার মানব? এই বলে সে কয়েকজন সাহসী পাঠানকে সঙ্গে নিয়ে মন্দিরের চত্বরের দিকে ছুটে আসল। সে তিরবেগে ছুটে আসছিল দীর্ঘ তলোয়ার হাতে- ভীষণ দৈত্যের মত তার আকৃতি! সে বলল ঘিরে ধরে ফেল জেনানাকে। এগিয়ে যাও। এদিকে এক নিমেষে রহিমের বুকে বিদ্ধ হল দয়াময়ীর নিক্ষিপ্ত বল্লম। যেমনি সে চিৎ হয়ে পড়ে গেল, অমনি তরবারির এক আঘাতে দয়াময়ী তার মাথা কেটে ফেললেন। মৃত্যুর পূর্বে ‘ইয়া আল্লা!’এই একটিমাত্র শব্দ রহিমের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল। তারপর সব শেষ। রঘুনাথ সর্দার অবাক্ বিস্ময়ে দেখল দয়াময়ীর বীরঙ্গনা মূর্তি। সর্বাঙ্গে রুধির-ধারা। বস্ত্র রুধির-লিপ্ত, কেশ মুক্ত, নয়নদ্বয় থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে অগ্নিকণা। হাতে রুধির লিপ্ত শানিত তরবারি। কালান্তক যন সদৃশ রহিম খা’র এরূপ মৃত্যুতে ডাকাতের দল পালাতে লাগল। কেউ কেউ ধরা পড়ল- অনেকে পালিয়ে বাঁচল। সীতারাম ছিলেন এমন বীরাঙ্গনার পুত্র। এমন মা- না হলে কি অমন ছেলে হয়?


























