বুধবার ০১ জুলাই ২০২৬

১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘উনিশ শতকে বাংলার কৃষক পরিবারের বাড়ি’

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৩:৩০, ৩০ জুন ২০২৬

‘উনিশ শতকে বাংলার কৃষক পরিবারের বাড়ি’

১৮৭৪ সালে প্রকাশিত রেভারেন্ড লালবিহারী দে-র ‘গোবিন্দ সামন্ত অর দ্য হিস্টরি অব এ বেঙ্গল রাইয়ত’ (পরবর্তীকালে বেঙ্গল পিজান্ট লাইফ) এবং যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির আত্মচরিত উনিশ শতকের বাংলার গ্রামীণ জীবন ও কৃষক পরিবারের বসতভিটার পরিকল্পনা সম্পর্কে অমূল্য তথ্য সংরক্ষণ করেছে। এই দুটি গ্রন্থের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, সে সময়ের গ্রামের বাড়ি কেবল বসবাসের স্থান ছিল না; বরং তা ছিল কৃষিনির্ভর জীবন, পরিবেশ, স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি সুপরিকল্পিত আবাসব্যবস্থা।


লালবিহারী দে বর্ধমান জেলার কাঞ্চনপুর গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারের বাড়ির যে চিত্র এঁকেছেন, তাতে দেখা যায়, বাড়ির মূল প্রবেশপথ ছিল পূর্বমুখী। ছোট একটি কাঠের দরজা পেরিয়ে ঢুকলেই থাকত খোলা উঠোন, যা ছিল পুরো বাড়ির কেন্দ্রবিন্দু। উঠোনের পশ্চিমে অবস্থিত ছিল ‘বড় ঘর’। এটিই ছিল পরিবারের প্রধান বাসগৃহ- সবচেয়ে বড়, পরিষ্কার ও মজবুত কুটির। বাঁশের কাঠামো, খড়ের ছাউনি এবং তালগাছের গুঁড়ির বরগা দিয়ে নির্মিত এই ঘরের মেঝে আশপাশের জমি থেকে প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু ছিল। ঘরের একাংশ শোবার জন্য এবং অন্য অংশটি ভাঁড়ারঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যেখানে মাটির হাঁড়িতে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণ করা হতো। সামনের বারান্দাটি ছিল অতিথি আপ্যায়ন ও বৈঠকের স্থান।


উঠোনের দক্ষিণে থাকত ঢেঁকিশালা। এখানে কৃষিকাজের নানা সরঞ্জাম রাখা হতো এবং বারান্দায় স্থাপিত থাকত ধান ভানার ঢেঁকি। দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ছিল রান্নাঘর বা পাকশালা, যার বারান্দাতেই রান্নার ব্যবস্থা করা হতো। উঠোনের উত্তরে লম্বা গোয়ালঘর, মাঝখানে ধানের গোলা বা ‘মরাই’ এবং খড়ের পালুই কৃষি জীবনের সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকত। বাড়ির পূর্বদিকে পুকুর ছিল দৈনন্দিন ব্যবহার্য পানির উৎস। তবে পানীয় জল আনা হতো গ্রামের বাইরের বড় দিঘি থেকে। নারীদের গোপনীয়তার কথা বিবেচনা করে ঘাটের পাশে তালগাছ ও ঝোপঝাড় রাখা হতো। রান্নাঘরের পেছনে আবর্জনা ফেলার গর্ত ছিল, যা পরে জৈবসারে পরিণত হতো। অর্থাৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও ছিল এই আবাস পরিকল্পনার একটি অংশ।


যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির আত্মজীবনীতে গ্রামীণ বসতভিটার পরিকল্পনার আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, পূর্বদিকে পুকুর, পশ্চিমে বাঁশঝাড় এবং দক্ষিণে খোলা জায়গা রাখা ছিল একটি প্রচলিত নিয়ম। বাঁশঝাড় ঝড় ও তীব্র রোদ থেকে বাড়িকে রক্ষা করত, আর দক্ষিণ দিক খোলা থাকায় বাতাস চলাচল সহজ হতো। বাড়ির জলনিকাশ উত্তর বা পূর্বদিকে রাখারও একটি সুপ্রচলিত রীতি ছিল। তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায়, পুকুর সাধারণত উত্তর-দক্ষিণে লম্বা করে খনন করা হতো, যাতে উত্তর ও দক্ষিণের বাতাসে পানিতে ঢেউ সৃষ্টি হয়ে জল সতেজ থাকে।
তিনি আরও লিখেছেন, উনিশ শতকের একটি মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের পরিচয় নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমত, বসতভিটা এবং সংলগ্ন কিছু জমি নিষ্কর বা করমুক্ত হওয়া। দ্বিতীয়ত, বাড়ির পাশে নিজের পুকুর থাকা, যা স্নান, পানির ব্যবহার এবং মাছ চাষ- সবকিছুর জন্য কাজে লাগত। তৃতীয়ত, বাড়ির সঙ্গে একটি ফলের বাগান থাকা, বিশেষ করে কয়েকটি আমগাছকে সমৃদ্ধ গৃহস্থালির অন্যতম পরিচয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো।


এই দুই লেখকের বিবরণ একত্রে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, উনিশ শতকের বাংলার গ্রামীণ বাড়িঘর নির্মাণে কেবল বসবাসের সুবিধা নয়, কৃষিকাজ, স্বাস্থ্যবিধি, পরিবেশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং পারিবারিক জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয়তাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হতো। উঠোনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আবাস পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় জলবায়ু ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: