সোমবার ২৯ জুন ২০২৬

১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মোল্লাহাটি নীলকুঠির খোঁজে

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৮:০৪, ২৯ জুন ২০২৬

মোল্লাহাটি নীলকুঠির খোঁজে

মোল্লাহাটি বনগাঁ মহকুমার একটি গ্রাম। এই গ্রামে একটি বড় নীলকুঠি ছিল। সেই নীলকুঠির পটভূমিকায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইছামতি’। দুইবার গেছি ওই গ্রামে আমি, বেড়াতে। বনগাঁ থেকে চাকদাহ রোড ধরে ১০ কিলোমিটার যাবার পর একটি রাস্তা নেমে গেল ডানে। এক কিলোমিটার গেলেই বারাকপুর। বিভূতি বাবুর বাড়ি। বারাকপুরের উত্তর ধার দিয়ে ইছামতি ডান হাতে সমান্তরালে রেখে মোল্লাহাটি পর্যন্ত চলে গেছে। একদিন সেখানেই ছিল নীল কুঠিয়ালদের কুঠি, নীল চাষের মাঠ। শত শত কৃষকের রাঙা রক্ত মোক্ষণ করে নীলকর ইংরেজরা বার করত নীল চাষ। কুঠিয়াল সাহেবদের দিন ফুরাল। পড়ে থাকল মাঠ। খড়ের মাঠ নাম নিয়ে দেড়শ বছর কাটল। এখন সেখানে জনবসতি। নতুন ভাবে গড়ে উঠেছে গ্রাম্য সমাজ। গোপালনগর বাঁওড় থেকে এসে মিশেছে ইছামতি নদীতে। সেই ইছামতি দূরে সরে গেছে। রেখে গেছে তার দুটি ধারা যাদের এখন বটতলার দোয়া এবং কলাতলার দোয়া বলা হয়। তার ধার দিয়েই রাস্তা। তিন কিলোমিটারের মাথায় সুন্দরপুর। সেখান থেকে বাজিতপুরের পথ ছেড়ে ডান ধারে আর একটি রাস্তা গেছে। দিগন্ত বিস্তৃত আবাদি মাঠ অতিক্রম করে আরও প্রায় ৩ কিলোমিটার গেলেই তবে মোল্লাহাটি। প্রথমেই পথের বাঁ ধারে ননী গোপালের গম কল। তার পাশেই শিবতলা। একটি বৃহৎ অশ্বত্থ গাছ। তার তলায় ইট গাঁথা ত্রিশূল পোতা। সেখানে হয় গাজন উৎসব ও মেলা চৈত্র সংক্রান্তিতে। ভাদ্র মাসে হয় মনসা পূজা, আর সে উপলক্ষ্যে মেলা। এরপর সংকীর্ণ গ্রাম্য ভাগাড় পথ বলা চলে না। পথের বাঁ ধারে ছাড়া ছাড়া কয়েকটি কুটির, সবাই আদিবাসী। কয়েকখান পাকা বাড়ি টালির চাল, ভাগাড়ের দু’পাশে দেখা যায়। একটু এগোলেই ডান হাতে সরকারি পাকা ডাকবাংলো। সামনে পিছনে বারান্দা। একটি বৃহৎ কক্ষ। পিছনের বারান্দায় একটি কামরা। খড়খড়ি লাগানো দরজা জানালার অবস্থা এখনও ভালো আছে। সাত বিঘা জমির ওপর এই বাড়ি। একটি স্যানিটারি পায়খানা আছে। বঙ্গভঙ্গের দুবছর আগে ব্রিটিশ আমলে এটি নির্মাণ করা হয়। এর পূর্বে ছিল খড়ের আটচালা ঘর। আগে এর তত্বাবধানকারী ছিল। তার মৃত্যুর পর আর কেউ দেখে না। পথের বাঁ ধারে একখানা দোকান। দোকানদারের নাম নঙ্কু বাবু, আদিবাসী যুবক। 
এরপর আরও সংকীর্ণ উঁচু নিচু পথ। কোথাও ইটের স্তূপ। ভাঙা ইটের টুকরা জঙ্গল অতিক্রম করে বিরাট স্তূপের কাছে গেলেই বোঝা যাবে এখানে একদিন বিশাল অট্টালিকা ছিল। তার ধারে দু’খানি খড়ের দো-চালা, দু’একটা আম কাঁঠালের গাছ দু’চার বছর পূর্বে পোতা হয়েছে। স্তূপের উপর উঠলেই দেখা যাবে দু’হাত উঁচু প্রাচীর বেষ্টিত চাতাল। সেখানে নীল পচানো হতো। এটাকে নীল চৌবাচ্চা বলা হয়। এর এক ধারে প্রাচীর ভেঙে গেছে। চালাঘর দুটি গোবিন্দ সাধুর আস্তানা। বছর কুড়ি তিনি এখানে আস্তানা গেড়েছেন। এই ঢিবির দক্ষিণ দিকের ঢালু অংশে আছেন আর এক বৈরাগী ও বৈরাগিণী আস্তানা গেড়ে। একখানা তিন চালা খড়ের ঘর। বৈরাগীর নাম গুরুপদ। তার বাড়ি ছিল পাঁচপোতায়। এর জমিজমা আছে। এই কুঠি সংলগ্ন বিঘা চারেক আবাদ করেন পাট ডাল ইত্যাদি। এই নীল কুঠিই একদিন ছিল ১৫২ কুটির প্রধান কার্যালয়। এই কুটির এলাকা ছিল উত্তর পূর্বে ইছামতি নদী, পশ্চিমে বামনডাঙ্গা এবং দক্ষিণে খাবরাপোতা। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়েই ছিল নীলের আবাদ ও তার কারখানা, কার্যালয় আর নীলকর সাহেবদের নীলকুঠি। এখন সবই ধ্বংসস্তূপ, ইট, কাঠ যে যা পেরেছে নিয়ে গেছে। এখনও নিচ্ছে। 
বিচারে যে-সব হতভাগ্য কৃষকরা শাস্তিভোগ করতেন তাদের আটক রাখা হতে এখানকার ঘরে। আর যাদের প্রাণদণ্ড দেওয়া হতো, তাদের ফাঁসি দেওয়া হতো আরামডাঙ্গার বটগাছে ফাঁসি লটকে। এই স্তূপের পশ্চিম পাশে বিরাট পুকুর ছিল। তার ছিল বাঁধানো ঘাট। এখন সেটা ডোবা। পাশে ছিল বিরাট আম বাগান, এখন নেই। এখন সেখানে কৃষি ক্ষেত। সেই আম বাগানের মধ্যেই রয়েছে আর টি গায়া মেম-্এর সমাধি। বাউল সর্দার এখন ওই জমির মালিক। এখানকার উত্তরে, পুকুরের উত্তরে ছিল লারমোর সাহেবের সমাধি। সমাধি অপসৃত। এই কুটির আর এক ইংরেজ ছিল মালিক, তার নাম জেমস ফরলং। জমির মালিক এখন দুলাল সর্দার। এখন সবই আবাদি জমি। পাট, মসুরি ফলছে। ইছামতি এখান থেকে সরে গেছে। তার নাম হয়েছে পাঁচপোতার বাঁওড়। তার উত্তর দিয়ে বসে গেছে ক্ষীণ ইছামতি। নীল কুঠিতে পানি সরবরাহের জন্য গরুর সাহায্যে পানি তোলা হত। তার চিহ্নও বর্তমান। এখনকার লোক বলে চিনি কল। 
মোল্লাহাটির কুটির এখন আর কোনো আকৃতি এখন নেই। আছে ভগ্নস্তূপ আর ইটের ছড়ানো টুকরা। আর যে-সব মজুর এনেছিল নীলকর সাহেবরা সাঁওতাল পরগনা থেকে কুঠিতে কাজ করার জন্য, তারা এখন অনেকে এখন জমির মালিক। কিন্তু তারা চাষাবাদ বুঝতে না পারার কারণে অনেক জমি তাদের বেহাত হয়ে গেছে। তবে এখনও প্রায় ৭৫ ঘর সাঁওতাল বাস করেন মোল্লাহাটিতে। তাদের মধ্যে জমিজমা আছে কিছু লোকের। 
একদিন এই মোল্লাহাটিই হয়ে উঠেছিল এই অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র। তখন বনগ্রামের অত গুরুত্ব ছিল না। সবসময় লোকজনের আনাগোনা ছিল এখানে। ইছামতীর বুকে আলোড়ন তুলে চলত নীলকর সাহেবদের বজরা, ছিপ, পানসি। কত কৃষকের অশ্রু ঝরে সরস করে তুলত এই মোল্লাহাটির মাটি। অনাচার, অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা চলত একদিকে আর অন্য দিকে ফুটতো আনন্দের ফোয়ারা। নীলকর সাহেবদের নাচ, গান, ভোগ বিলাস। আজ সেই নিঝুম নিস্তব্ধ প্রান্তরে সেই অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করছে এই স্তূপ আর তিল তিল করে বিলুপ্তির সীমানায় অগ্রসর হচ্ছে। হয়ত ভবিষ্যতে আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। লুপ্ত হয়ে যাবে একদিন নীলকর সাহেবদের সব স্মৃতিচিহ্ন। যেমন করে মুছে গেছে নীলকর সাহেবদের পূর্বে সেই মুসলমান যুগের মোল্লাহাটির সব কাহিনির সব স্মৃতি। শুধু নামটাই এখন উচ্চারিত হচ্ছে। ইতিহাসের পাতায় তার সাক্ষ্য রাখতে-স্থান, কাল, পরিবেশ, জনসমাজ সবই এখন নতুনভাবে নতুন ভঙ্গিমায় পট পরিবর্তন করেছে। কোথায় সেই বৃহৎ অট্টালিকা, কোথায় সেই ঝাউ গাছের সারি, সুসজ্জিত পুষ্পোদ্যান, শানবাঁধানো পুকুর, আর উত্তাল তরঙ্গসংকুল প্রশস্ত ইছামতী নদী। তার বার্তা দেওয়ার জন্যও কাউকে পাওয়া যাবে না। নিস্তব্ধ দুপুরে শোনা যায় ঘুঘুর ঐকতান আর রাতে শৃগালের প্রহর ঘোষণা। দূরে আদিবাসীদের পল্লীর নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে চিৎকার করতে থাকবে একাধিক সারমেয়। ইতিহাস হারিয়ে যাবে মহাকালের আবর্তে। 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: