উনিশ শতকের বাংলার সমাজ, অর্থনীতি ও জনজীবন সম্পর্কে সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত সবচেয়ে বিস্তৃত তথ্যসংগ্রহের কাজটি করেছিলেন ব্রিটিশ প্রশাসক উইলিয়াম উইলসন হান্টার। ১৮৭৫ থেকে ১৮৭৭ সালের মধ্যে প্রকাশিত তাঁর বিশ খণ্ডের গ্রন্থ অ ঝঃধঃরংঃরপধষ অপপড়ঁহঃ ড়ভ ইবহমধষ শুধু প্রশাসনিক তথ্যের ভাণ্ডার নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ জীবন, বসতি, স্থাপত্য ও সামাজিক বিন্যাসেরও এক মূল্যবান দলিল। বিভিন্ন জেলার সংবাদ সংগ্রাহকদের তথ্যের মানে কিছু পার্থক্য থাকলেও সমগ্র বাংলার গ্রামসমাজের একটি সামগ্রিক চিত্র এই সংকলনে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
এই তথ্যগুলো থেকে জানা যায়, বুকানন হ্যামিলটনের সমীক্ষার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরেও বাংলার সাধারণ মানুষের বসতবাড়ির কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। ধনী জমিদার বা সচ্ছল গৃহস্থদের বাইরে অধিকাংশ মানুষের ইটের তৈরি বাড়ি ছিল না। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ গ্রামীণ মানুষ তাদের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী মাটি, বাঁশ, খড়, কাঠ ও কঞ্চি দিয়ে কাঁচা ঘর নির্মাণ করতেন। উপকরণে অঞ্চলভেদে কিছু পার্থক্য থাকলেও বসতবাড়ির মৌলিক কাঠামো ছিল প্রায় অভিন্ন।
তৎকালীন বাংলার একটি পরিবারের বাসস্থান সাধারণত একাধিক কুটির নিয়ে গড়ে উঠত। প্রতিটি কুটিরের নির্দিষ্ট ব্যবহার ছিল। কোথাও শোয়ার ঘর, কোথাও রান্নাঘর, কোথাও বৈঠকখানা, আবার আলাদা গোয়ালঘর, গোলাঘর কিংবা ঢেঁকিশাল থাকত। অনেক ক্ষেত্রে একই উঠোনকে কেন্দ্র করে একাধিক পরিবারের বসবাসের ব্যবস্থাও দেখা যেত। ফলে বাড়ি বলতে শুধু একটি ঘর নয়, বরং একটি সুসংগঠিত পারিবারিক পরিসরকে বোঝাত।
হান্টারের বর্ণনায় বিভিন্ন জেলার বসতবাড়ির বৈশিষ্ট্যও ধরা পড়েছে। নদীয়ায় একজন সাধারণ রায়তের বাড়িতে সাধারণত তিনটি কুটির থাকত—শোয়ার ঘর, বৈঠকখানা ও গোয়াল। ঘরের দেয়াল তৈরি হতো মাটি কিংবা কঞ্চির ওপর মাটির প্রলেপ দিয়ে, আর ছাদ হতো বাঁশের কাঠামোর ওপর খড়ের ছাউনি।
যশোরের সাধারণ দোকানদাররা তুলনামূলকভাবে কিছুটা মজবুত ঘর নির্মাণ করতেন। কাঁঠাল কাঠ বা তালগাছের গুঁড়ি দিয়ে কড়ি-বরগা তৈরি করে তার ওপর মাটির দেয়াল তোলা হতো। তবে দরিদ্র মানুষের বসতি ছিল বাঁশ, মাটি ও খড়ের তৈরি সাধারণ কাঁচা ঘর।
ঢাকার গ্রামীণ চাষিদের বাড়িতে সাধারণত চারটি পৃথক ঘর থাকত। বড় ঘর ছিল পরিবারের কর্তার শোয়ার জন্য, রসুইঘর রান্নার কাজে ব্যবহৃত হতো, গোলাঘরে শস্য সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যরাও রাত্রিযাপন করতেন এবং আলাদা ঢেঁকিশাল থাকত। তবে প্রতিটি ঘরই প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক কাজে ব্যবহৃত হতো। বাড়ির বারান্দা ছিল বৈঠকখানা, আর গবাদিপশুর জন্য দিনের ও রাতের ব্যবহারে পৃথক দুটি গোয়ালঘরও থাকত।
দিনাজপুরেও চারটি ঘর নিয়ে একটি পরিবারের বাসস্থান গড়ে উঠত। সেখানে গৃহঘর, পাকের ঘর, গোলাঘর এবং খানখা বা বসার ঘর ছিল প্রধান অংশ। অন্যদিকে রাজশাহির অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারগুলোতে পরিবারের প্রতিটি বিবাহিত পুরুষের জন্য আলাদা শোয়ার ঘর নির্মাণ করা হতো। এর সঙ্গে থাকত পৃথক রান্নাঘর, গোয়ালঘর, ঢেঁকিঘর, গোলাঘর এবং অবিবাহিত পুরুষদের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা। এতে পরিবার কাঠামো ও সামাজিক অবস্থানের প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
সরকারি পরিসংখ্যানভিত্তিক এই সংকলন প্রথম দর্শনে নীরস তথ্যপুঞ্জ মনে হলেও, এর ভেতরেই উনিশ শতকের বাংলার গ্রামীণ সমাজের এক জীবন্ত চিত্র লুকিয়ে আছে। বুকানন হ্যামিলটন যেখানে মূলত পৃথক কুটিরের নির্মাণশৈলীর ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন, সেখানে হান্টারের বিবরণে পরিবার, উঠোন ও বিভিন্ন কার্যকরী স্থাপনার পারস্পরিক সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
আজও বাংলার গ্রামে যে উঠোনকেন্দ্রিক বসতবাড়ির ঐতিহ্য দেখা যায়—চারপাশে রান্নাঘর, শোয়ার ঘর, গোয়াল, গোলাঘর কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ঘরের বিন্যাস- তার ঐতিহাসিক ভিত্তি যে অন্তত উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল, হান্টারের তথ্য তারই সাক্ষ্য বহন করে। তবে এসব ঘর এলোমেলোভাবে নির্মিত হতো না; লোকায়ত জ্ঞান, বাস্তুপরিকল্পনা এবং পরিবেশ-উপযোগী স্থাপত্যচর্চা ছিল এই গ্রামীণ কুটির-নির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই ঐতিহ্যকে আরও গভীরভাবে বুঝতে হলে সরকারি নথির পাশাপাশি দেশীয় বিবরণ ও সমসাময়িক চিত্র-উপাত্তের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।


























