রোববার ২৮ জুন ২০২৬

১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মশিয়াহাটীর শিক্ষা, যোগাযোগ  ও সামাজিক জাগরণের ইতিহাস

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৩:৫১, ২৭ জুন ২০২৬

মশিয়াহাটীর শিক্ষা, যোগাযোগ  ও সামাজিক জাগরণের ইতিহাস

অভয়নগর উপজেলার মশিয়াহাটী আজ যে জনপদ হিসেবে পরিচিত, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, সামাজিক ঐক্য এবং শিক্ষা বিস্তারের এক গৌরবময় ইতিহাস। একসময় মশিয়াহাটী থেকে নওয়াপাড়া বাজারে যাওয়ার কোনো সড়কপথ ছিল না। স্থানীয় মানুষকে বিল-ঝিল পেরিয়ে এবং অন্যের বাড়ির আঙিনা দিয়ে অত্যন্ত কষ্টে যাতায়াত করতে হতো। এই দুর্ভোগ দূর করতে যশোর লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান শ্রী সুরেশচন্দ্র হালদারের উদ্যোগে ১৯৩১-৩২ খ্রিষ্টাব্দে নওয়াপাড়া থেকে মণিরামপুরের নেহালপুর পর্যন্ত একটি মাটির রাস্তা নির্মিত হয়। এর ফলে মশিয়াহাটী ও আশপাশের এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে হাটগাছার প্রকৌশলী শ্রী সুফলচন্দ্র বৈরাগীর প্রচেষ্টায় মশিয়াহাটীতে প্রথম বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপিত হয়। গ্রামীণ জীবনে বিদ্যুতের আগমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। এরপর ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে মশিয়াহাটীতে পূবালী ব্যাংকের একটি শাখা উদ্বোধন করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হয়ে ওঠে।
তবে মশিয়াহাটীর সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় শিক্ষা আন্দোলনকে ঘিরে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এলাকার নমশূদ্র সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা নেহালপুরে গিয়ে পড়াশোনা করত। কিন্তু সেখানে ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ শিক্ষকদের একটি অংশের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে আসেন পোড়াডাঙ্গা গ্রামের সমাজসংস্কারক রাইচরণ মজুমদার।
তাঁর আহ্বানে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে মশিয়াহাটীর আশপাশের নয়টি গ্রামের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নিজস্ব একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জানুয়ারি কুলটিয়া গ্রামের কেন্দ্রস্থলে ঠাকুরতলার পূজার মাঠে ‘কুলটিয়া মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল তৎকালীন নমশূদ্র সমাজের আত্মমর্যাদা ও শিক্ষার অধিকারের সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
একই বছরের মার্চ মাসে মশিয়াহাটীতে আরও বৃহৎ একটি সভার আয়োজন করা হয়। এতে মশিয়াহাটী ছাড়াও খুলনা ও যশোর অঞ্চলের প্রায় পাঁচ হাজার নমশূদ্র মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন খুলনার দেড়ূলী গ্রামের যোগেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। বিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে সেখানে একটি অভিনব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নমশূদ্র সম্প্রদায়ের প্রত্যেক কন্যার বিবাহে বরপক্ষকে দুই টাকা এবং প্রতিটি সামাজিক নিমন্ত্রণে প্রতি মণ চালের খরচের বিপরীতে আট আনা করে বিদ্যালয়ের তহবিলে প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়। অর্থ প্রদান না করলে বিয়ে বা নিমন্ত্রণ অনুষ্ঠান অনুমোদিত হতো না। সমাজের সম্মিলিত অংশগ্রহণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহের এ উদ্যোগ ছিল তৎকালীন সময়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে নবপ্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি মশিয়াহাটীতে স্থানান্তরিত হয় এবং ‘মশিয়াহাটী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়’ হিসেবে নতুন পরিচয় লাভ করে। বিদ্যালয়টি দ্রুতই অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
মশিয়াহাটীর শিক্ষা আন্দোলনের আরেক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন অক্ষয় কুমার সরকার। তিনি ছিয়ানব্বই গ্রামের প্রথম উচ্চ মাধ্যমিক পাস নমশূদ্র ব্যক্তি এবং অভয়নগর উপজেলার প্রথম নমশূদ্র শিক্ষক হিসেবে পরিচিত। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে মাসিক মাত্র ছয় টাকা বেতনে তিনি মশিয়াহাটী উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় পণ্ডিত হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। তাঁর এই পদক্ষেপ পরবর্তীকালে নমশূদ্র সমাজের শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মশিয়াহাটী বিদ্যালয়ের সুনাম অল্প সময়ের মধ্যেই দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এরই প্রমাণ হিসেবে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার ব্রাহ্ম সমাজের বাংলা ও আসাম অনুন্নত শ্রেণির উন্নতি বিধায়িনী সমিতির প্রধান পরিচালক ডা. প্রাণকৃষ্ণ এবং শ্রী রাজমোহন দাস নওয়াপাড়া থেকে পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে আসেন। তাঁদের এই সফর বিদ্যালয়ের গুরুত্ব ও শিক্ষাবিস্তার আন্দোলনের প্রতি সমকালীন সমাজসংস্কারকদের আগ্রহের সাক্ষ্য বহন করে। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: