শুক্রবার ২৬ জুন ২০২৬

১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাঘের আক্রমণে নিভেছে স্বামীর জীবন

ছোট্ট চায়ের দোকান আঁকড়ে বাঁচার সংগ্রাম ‘বাঘ বিধবা’ মাহফুজার

অনাথ মন্ডল, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)

প্রকাশিত: ১৩:১৬, ২৫ জুন ২০২৬

ছোট্ট চায়ের দোকান আঁকড়ে বাঁচার সংগ্রাম ‘বাঘ বিধবা’ মাহফুজার

জীবনের প্রতিটি সকাল শুরু হয় এক কাপ চা দিয়ে। কিন্তু সেই চায়ের কাপের আড়ালে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ সংগ্রাম, বেদনা আর বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াই। শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব কালিনগর গ্রামের বাসিন্দা মাহফুজা খাতুন, যিনি স্থানীয়দের কাছে ‘বাঘ বিধবা’ হিসেবে পরিচিত, আজও স্বামীর স্মৃতি বুকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন।


জীবিকার তাগিদে ২০০২ সালে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন মাহফুজার স্বামী সাত্তার গাজী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস-বনের গভীরে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান তিনি। সেই ঘটনার পর মুহূর্তেই বদলে যায় মাহফুজার জীবন। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের।
স্বামী হারানোর পর ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন মাহফুজা। নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস না থাকায় নদীতে জাল টানতেন, কখনো মানুষের বাড়িতে কাজ করেছেন বাচ্চা দুটোর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য। বর্তমানে উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের উত্তর কদমতলা গ্রামের হাজী সাহেবের বাড়ির পাশে সরকারি জায়গা বসবাস করেন। তারপরও দিনমজুরির কাজ করে সংসার চালাতে হয়। তাদের নিজস্ব কোনো জায়গা জমি নেই।
সারা দেশের জ্বালানি তেলের সংকট মুহূর্তে উপজেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সংগ্রহ করতে হতো। শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ডেলমা ফিলিং স্টেশন থেকে সপ্তাহে তিনটি ইউনিয়নের ৩ দিন তেল দেওয়া হতো। তেল আগে নেওয়ার জন্য ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকরা আগের দিন থেকে সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষায় থাকতো।
সেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের ক্লান্তি কিছুটা লাঘব করতে রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান বসান মাহফুজা। বাঁশ-তাঁবুর ছাউনি আর কয়েকটি বেঞ্চ-এতেই গড়ে উঠেছে তার ক্ষুদ্র ব্যবসা। গভীর রাত থেকে শুরু করে পরের দিন রাত ৯ থেকে ১০টা পর্যন্ত সিদ্ধ ডিম, পানি, কলা, কেক, চা বিস্কুট বিক্রি করতেন মাফুজা খাতুন। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বেচাকেনা হতো। কিছুদিন পরে জ্বালানি তেলের সংকট কেটে যায়। ঐ কয়েক দিনে তিনি কিছু টাকা জমায়। বর্তমানে সেই টাকা দিয়ে নিজের বসত ঘরের সাথে ছোট একটি চায়ের দোকান দিয়েই সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। প্রতিদিন ভোরে দোকান খুলে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করলেও আয় খুবই সীমিত। তবুও হাল ছাড়েননি এই সংগ্রামী নারী।
মাহফুজা বলেন, স্বামী চলে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল সব শেষ হয়ে গেছে। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে বাঁচার শক্তি পেয়েছি। নিজের সাহসেই টিকে আছি। অনেক কষ্ট করেছি, এখনও করছি। স্বামী বেঁচে থাকাকালীন কোনো সময় বাইরে এসে কাজ করতে হয়নি, মানুষের সামনে দাঁড়াতে হয়নি। এখন বয়স হয়েছে, শরীরে রোগ ব্যাধি বাসা বেঁধেছে আর কাজ করতে পারি না। তেল সংকটের সময় চায়ের দোকান দিয়ে কিছু টাকা জমিয়ে ছিলাম। তা দিয়ে বাড়ির সাথে ছোট একটি চায়ের দোকান করেছি। সেই দোকান থেকেই যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছি। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালানো দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্য, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কিছু সহযোগিতা পেলে দোকানটি আরও বড় করতে পারবেন। তাতে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে।
প্রতিবেশীরা জানান, মাহফুজা অত্যন্ত পরিশ্রমী ও আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন একজন নারী। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি কখনো ভিক্ষাবৃত্তি বা অন্যের করুণার ওপর নির্ভর করেননি। নিজের শ্রম দিয়ে সন্তানদের লালন-পালন এবং সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন।
সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চলে এখনও অনেক পরিবার রয়েছে, যাদের সদস্যরা বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন। এসব পরিবারের অধিকাংশই আর্থিক সংকটে ভুগছে। তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি বলে মনে করেন, লেখক-গবেষক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু। 
এদিকে, সমাজকর্মী হাফিজের ভাষ্য, বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীরা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকভাবেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। তাদের জন্য সরকারি সহায়তার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন।
বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সিডিও এর নির্বাহী পরিচালক গাজী আল ইমরান বলেন, বাঘ বিধবা মায়েরা সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে চা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন এটা অত্যন্ত মানবিক। উপকূলের জীবন সংগ্রামে এগিয়ে নিতে মানবিক এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম পল্টু বলেন, আমাদের ইউনিয়নে অনেক বাঘ বিধবা রয়েছে, তাদের যতটুকু সহযোগিতা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে করা দরকার আমি সব সময় চেষ্টা করি। মাহফুজা খাতুন আমার ওয়ার্ডের বাড়ি। তার স্বামী বেঁচে থাকলে হয়ত বাইরে আসতে হতো না। কিন্তু এখন তাকে এভাবেই সংগ্রাম করে বাঁচতে হবে। আমি যতটুকু পারি সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।
জীবনের সব কষ্টকে সঙ্গী করেও হার মানেননি মাহফুজা খাতুন। তার গল্প শুধু একজন বাঘ বিধবার নয়; এটি সংগ্রাম, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য উদাহরণ। সমাজ ও রাষ্ট্রের আরও সহায়তা পেলে মাহফুজার মতো অসংখ্য নারী হয়ত নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন। এক কাপ চা আর একরাশ সংগ্রাম নিয়ে এগিয়ে চলা মাহফুজার জীবনকথা তাই সুন্দরবন উপকূলের হাজারো নারীর অদম্য জীবনীশক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: