বুধবার ২৪ জুন ২০২৬

১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাদেডিহির সুলতানি আমলের সেই ভুলে যাওয়া কবরগুলো

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৮:৩৪, ২৩ জুন ২০২৬

বাদেডিহির সুলতানি আমলের সেই ভুলে যাওয়া কবরগুলো

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারবাজার থেকে মাত্র অর্ধ কিলোমিটার দূরে পূর্ব দিকে গেলেই, একেবারে পাকা সড়কের পাশেই অবস্থিত বাদেডিহি নামের একটি ছোট্ট গ্রাম। দূর থেকে দেখলে গ্রামের চেহারায় তেমন কোনো বিশেষত্ব চোখে পড়ে না, কিন্তু সরু একটি গলি ধরে একটু ভিতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সুলতানি আমলের কয়েকটি পুরোনো কবর।


গত বছর ওই গ্রামে গিয়েছিলাম জুলাই মাসে। রোদ তখন মাথার উপর। পথ ধরে যখন আমরা সেখানে পৌঁছাই, তখন গা ছমছম করছিল। চারপাশে ঝোপ-জঙ্গল, আর তার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি কবর। পাতলা ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত এই কবরগুলো অযত্ন আর অবহেলায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নব্বই দশকে এখানে খনন চালিয়েছিল, কিছু পুরোনো ইতিহাস উন্মোচনের আশায়। খননের পরে কবরগুলো আবার মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। তারপর কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে সবকিছু।


কোন কবরটি কার, তা বোঝার আর কোনো উপায় নেই। কারণ কবরগুলোর গায়ে কোনো ফলক নেই, নেই কোনো নাম, কোনো চিহ্ন। চারপাশে এখন বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। 
তবে বারবাজার অঞ্চলটি সুলতানি আমলে একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর ও ধর্মীয় কেন্দ্র ছিল, যেখানে বহু মসজিদ, দিঘি এবং দরবেশ-আউলিয়াদের আস্তানা গড়ে উঠেছিল। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত মত অনুযায়ী, বাদে ডিহির পুরোনো কবরগুলোর অনেকগুলো সম্ভবত, মুসলিম সাধক, দরবেশ বা আউলিয়াদের, সুলতানি আমলের প্রশাসনিক বা সামরিক ব্যক্তিদের, অথবা সেই সময়কার বসতির প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের হতে পারে।


বারবাজার এলাকায় “বারো আউলিয়া” বা বারোজন সাধকের বসতি ছিল বলে একটি ঐতিহ্যগত ধারণা রয়েছে। সেই সূত্রে বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে থাকা পুরোনো কবরগুলোকেও অনেকে ওই আউলিয়া বা তাঁদের অনুসারীদের সঙ্গে যুক্ত করে থাকেন। তবে অধিকাংশ কবরের পরিচয় সম্বলিত শিলালিপি এখন আর নেই বা নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে নির্দিষ্টভাবে কার কবর তা বলা কঠিন।
কিন্তু আজ তাঁদের কথা কেউ আর জানে না। তাঁদের কোনো উত্তরপুরুষ হয়ত বেঁচে নেই এই অঞ্চলে, নাহলে অন্তত ঝোপ-জঙ্গল সাফ করত, মাথার ওপর একটি ছায়া দিত, ইতিহাসের কিছুটা পরিচয় তুলে ধরত। কবরগুলো যত প্রাচীন হোক, যত গুরুত্বপূর্ণ হোক, যতদিন না তার উত্তরসূরি থাকে, যতদিন না ভালোবাসা ও যত্ন থাকে, ততদিন সেই ইতিহাস ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় সময়ের ধুলোয়। কয়েকজন মহৎ মানুষ এখানে শুয়ে থাকলেও, আমরা জানি না, কারণ আমরা আর খুঁজে দেখতে যাই না। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: