অভিযান, সতর্ক ও আটক ছাড়াও প্রশাসনিক নানা তৎপরতার পরও কমছে না দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য। উলটো দিনের পর দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে যশোর জেনারেল হাসপাতালের দালাল সিন্ডিকেট। সরকারি এই হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে নেওয়া কোনোভাবেই থামছেই। এককথায় দালাল সিন্ডিকেটে জিমি হাসাপাতালটি।
বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায় করছে দালালরা। এতে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই যশোরের এই সরকারি হাসপাতালে দালাল চক্র সক্রিয়। প্রতিদিন সকাল ৭টার পর থেকেই টিকিট কাউন্টার ও বহির্বিভাগের সামনে জড়ো হয় দালালরা। এরপর হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছড়িয়ে পড়ে তারা। রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কৌশলে যোগাযোগ করে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাসপাতালকেন্দ্রিক অন্তত দুটি সিন্ডিকেটের অধীনে অর্ধশতাধিক দালাল সক্রিয় রয়েছে। তাদের সঙ্গে কয়েকজন হাসপাতাল কর্মচারীর সখ্য রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কিছু সরকারি কর্মচারী নিজেরাই দালালি কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সময়মতো কমিশনের ভাগ পৌঁছে যাওয়ায় এ চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতারণার অভিযোগে অতীতে একাধিক দালাল পুলিশের হাতে আটক হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে তারা আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে অভিযান বা আটকেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
জানা গেছে, হাসপাতালের কিছু চিকিৎসকের সঙ্গে দালালদের যোগাযোগ রয়েছে। কমিশনের জন্য রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে নির্দিষ্ট ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম উল্লেখ করা হয়। কখনো চিকিৎসকের কক্ষের বাইরে অবস্থানরত দালাল, আবার কখনো সহকারীর মাধ্যমে রোগীকে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে চিকিৎসক ও দালাল উভয়েই কমিশন পেয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কোনো দালাল নিজ উদ্যোগে রোগী নিয়ে যেতে পারলে কমিশনের পরিমাণ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে যেখানে এক্স-রে করতে খরচ হয় মাত্র ২০০ টাকা, ইসিজি ৮০ টাকা এবং আলট্রাসনোগ্রাফি ১১০ টাকা, সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একই সেবার জন্য কয়েকগুণ বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে রোগীদের। এছাড়া রক্ত ও প্রস্রাবের বিভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ফলে সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক রোগী দালালের খপ্পরে পড়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাড়ি ফিরছেন।
একসময় দালালদের প্রতারণা থেকে রোগীদের রক্ষায় হাসপাতালে ব্যাপক সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটুর নির্দেশনায় হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে ১০টি প্রচার মাইক স্থাপন করা হয়। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত মাইকে দালালবিরোধী প্রচারণা চালানো হতো। পাশাপাশি টিকিট কাউন্টারের সামনে একটি তথ্যকেন্দ্র চালু করা হয়েছিল, যেখানে রোগীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হতো। তবে এখন সেই মাইকগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে। তথ্যকেন্দ্রেও কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী নেই। সেখানে বহিরাগতদের আড্ডা দিতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, হাসপাতালে ইতোমধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। অনিয়ম ও দুর্নীতি আগের তুলনায় অনেক কমেছে। দালালদের বিরুদ্ধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কিছুদিন আগেও দুইজন চিহ্নিত দালালকে পুলিশ আটক করেছে।
তিনি আরও বলেন, অচল মাইকগুলো পুনরায় চালুর বিষয়টি আগামী বাজেটে বিবেচনা করা হবে। এছাড়া হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে চুরি ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে নতুন করে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।


























