রোববার ১৯ জুলাই ২০২৬

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতিহাস, সংগ্রাম ও বিস্মৃত এক ঐতিহ্যের ঠিকানা

ইলা মিত্রের পৈতৃক ভিটে

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৮:৪৭, ২৩ মে ২০২৬

ইলা মিত্রের পৈতৃক ভিটে

ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার আবাইপুর থেকে হাটফাজিলপুরের দিকে গেলে এক শান্ত, নির্জন গ্রামীণ অথচ পাকা পথ। হাটফাজিলপুর বাজার থেকে উত্তর-পশ্চিমে কয়েক কিলোমিটার গেলে এমপির মোড়। সেখান থেকে দক্ষিণে সরু পথে দুই কিলোমিটার, তারপর পুব দিকে জিকে প্রজেক্টের খালের ধার ঘেঁষে আরও দেড় কিলোমিটার দেখা মেলে দুটি পুরোনো বাড়ি। আশপাশে বনে-জঙ্গলে ঘেরা নিস্তব্ধতা। বাড়ি দুটির একটি হাজি কিয়ামউদ্দীনের, অন্যটি পরিচিত হাফেজ সাহেবের বাড়ি নামে। এখন সেখানে বসবাস করেন তাদের উত্তরাধিকারীরা। সময়ের স্রোতে ভাটার টানে এই দুই ঘর আজ সাধারণ গ্রামীণ বাড়ি হিসেবেই দাঁড়িয়ে থাকলেও, এঁদের ভেতর লুকিয়ে আছে বাঙালির সংগ্রামী ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


এ বাড়িগুলোই একসময় ছিল বাংলার অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল নগেন্দ্রনাথ সেন ও তাঁর স্ত্রী মনোরমা সেনের বসতভিটে। সরকারি দায়িত্ব পালনে কলকাতা-কেন্দ্রিক জীবনযাপন করলেও তিনি নিয়মিত ফিরে আসতেন নিজের এই পৈতৃক ভিটায়। সেখানেই শৈশবে এসেছেন তাঁর মেয়ে ইলা সেন, যিনি পরবর্তীকালে ‘ইলা মিত্র’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন তেভাগা আন্দোলনের বীর নেত্রী হিসেবে। এই প্রত্যন্ত গ্রামে কাটানো শৈশব তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে যোগ করেছিল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, দুঃখ-বেদনা ও সংগ্রামের বাস্তব চিত্র, যা হয়ত পরে তাঁর বিপ্লবী চেতনার ভিত আরও মজবুত করেছিল।
নগেন্দ্রনাথ সেনের বিশাল ভূসম্পত্তি ছিল বাগুটিয়া এলাকায়। গ্রামটি নাম পেয়েছে, সম্ভবত ‘বাগ’ (বাগান বা জঙ্গলঘেরা অঞ্চল) + ‘টিয়া/উটিয়া’ (বসতি বা ভূখণ্ড)—এই গঠন থেকে; অর্থাৎ, “বাগানঘেরা বসতি” অর্থবহ স্থান নামটিরই প্রতিফলন এখানে। সেই বাগানঘেরা বসতিই ছিল ইলা মিত্রের পূর্বপুরুষদের জীবনের কেন্দ্র।


কিন্তু দেশভাগের অস্থির সময় সম্পত্তির ভাগ্য বদলে যায়। নগেন্দ্রনাথ সেন কলকাতায় অবস্থান করায় তাঁর গোমস্তা কালীপদ চক্রবর্তী নামমাত্র মূল্যে বহু জমি বিক্রি করে দেন। সেই সুযোগে কিছু লোক বিপুল সম্পদ হাতিয়ে নেয়, যা আজও স্থানীয়দের মুখে মুখে শোনা যায় ইতিহাসের মতো। পরে তাঁর শাশুড়ি সরোদিনী সেনও কিছু জমি বিক্রি করেন, যে-সব জমির মালিকানাও প্রকৃতপক্ষে তাঁর ছিল না। পাকিস্তান আমলে বাদশাহ মিয়া নামে এক পুলিশ কর্মকর্তার দখলে যায় সেন পরিবারের আরও অনেক জমি, যেখানে এখন দিঘি ও পুকুর খনন করে মাছচাষ করা হয়।


এই গ্রামেই দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য মহিয়সীর স্মৃতি। নাচোলের নারী-পুরুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে ‘রানী মা’ হিসেবে পরম শ্রদ্ধায় যাকে স্মরণ করে সমগ্র ভারত উপমহাদেশ, সেই ইলা মিত্রের শেকড় লুকিয়ে আছে বাগুটিয়ার মাটিতে। অথচ পরিতাপের বিষয়, এখনো অধিকাংশ মানুষই জানেন না, তাদেরই গ্রামের এক পরিবারে জন্মেছিলেন এমন এক বিপ্লবী, যিনি তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অপরাজেয় নাম।


গত ডিসেম্বর মাসে তাঁর পৈতৃক ভিটে দর্শণে গিয়েছিলাম। বাড়ির ভেতর গিয়ে দাঁড়ালাম। ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিল, ইতিহাস কখনো কখনো আমাদের হাতছাড়া হতে হতে বেঁচে থাকে কেবল ধুলোমাখা বাড়ির দেয়ালে, হারিয়ে যাওয়া নথির আড়ালে, কিংবা প্রবীণদের স্মৃতির ভাঁজে। তাই প্রশ্ন জাগে, যে নারী জীবনযুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম করে গেছেন নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়, তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটে কি এভাবেই পড়ে থাকবে বেদখলে?
স্বাধীন দেশের মানুষ হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হলো : ইতিহাসের প্রতি সম্মান জানানো, সেই সংগ্রামী মানুষের প্রতি দায় স্বীকার করা। তাই ইলা মিত্রের স্মৃতি রক্ষায় তাঁর পৈতৃক ভিটে ও সম্পত্তি উদ্ধার করে একটি স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হলে তা শুধু তাঁকে সম্মান জানানোই নয়, এই মাটির মানুষেরও গর্বের বিষয় হবে। আগামী প্রজন্ম জানতে পারবে এই মাটিই জন্ম দিয়েছে এক মহীয়সী বাঙালিকে, যিনি ছিলেন গণমানুষের বিপ্লব ও মুক্তির প্রতীক। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: