টমাস ম্যাচেল বেঙ্গল ইন্ডিগো কোম্পানিতে এক নীলকর হিসাবে যোগ দেন ১৮৪৬ সালে এবং থাকতে শুরু করেন গ্রামবাংলারেই বিভিন্ন নীলকুঠিতে। নীলকর জীবনের রোজনামচা তিনি লিখে রাখতেন তাঁর জার্নালে। সেই সঙ্গে জার্নালের পাতায় পাতায় আঁকতেন গ্রাম্য জীবনের ছবি। উনিশ শতকের গ্রামবাংলার এমন প্রত্যক্ষ ও সচিত্র দৈনন্দিন ধারাবিবরণী বোধহয় আর একটিও নেই। যশোর, হাঁসখালি, ত্রিবেণি, বনগাঁ, পেট্রাপোল, বেনাপোল, কৃষ্ণনগর, বড়গড়িয়া, মুর্শিদাবাদের পটকাবাড়ি তিনি গেছেন। তাঁর সেই বিবরণ রয়েছে তাঁর বইতে। ১৮৫০ সালের ৩ জুন তিনি এসেছিলেন যশোরের বেনাপোল নীলকুঠিতে।
তিনি লেখেন, ‘চার্লির সঙ্গে বেনাপোল গেলাম। সেখানে পৌঁছে দেখলাম চাকররা রাতের ডিনার তৈরিতে ব্যস্ত। তাই আমরা ভাবলাম একটু হাটের থেকে ঘুরে আসি। আজ হাটবার। জনসমাগম হয়েছে ভালোই। আমরা বিভিন্ন ধরনের মানুষ দেখছি আর নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছি। এমন সময় বৃদ্ধা এক মাছবিক্রেতার কাছে এক ফকির এল। তার চেহারা পাগলের মতো। সে এসেই অত্যন্ত অভদ্রভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে তারস্বরে চিৎকার করতে লাগল। আমি সেজের কাছ থেকে কুকুরের চাবুকটা নিয়ে তাকে সেইটা দেখিয়ে চুপ করতে বললাম। কিন্তু মুহূর্ত মধ্যে সে আমাকে লক্ষ্য করে তার হাতের লাঠিটা চালিয়ে দিল। চার্লি যদি ঠিক সেই সময়ে লাফিয়ে এসে নিজের লাঠি দিয়ে মারটা না ঠেকাত তা হলে আমার যে কী হতো তা ভগবানই জানেন। লোকটা এত জোরে লাঠি চালিয়েছিল যে চার্লির শক্ত কাঠের লাঠিটা তার অভিঘাতে ভেঙে টুকরো হয়ে গেল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে লোকটাকে আমরা কাত করে ফেললাম, আর চার্লি তার কুকুরের চাবুক দিয়ে তাকে এমন পেটান পেটাল যে মিস্টার ফকির বাকি জীবন তার শরীরে চার্লির হস্তাক্ষর নিয়ে ঘুরবে। লোকটি এতক্ষণ গাঁজা টানছিল আর হাটের মেয়েদের কাছে গিয়ে গিয়ে তাদের বিভিন্নভাবে অপদস্থ করছিল। এ দেশের লোকেদের একটা অদ্ভুত কুসংস্কার আছে, কেউ পাগলামোর ভান করলে তাকে এরা ধরে নেয় স্বর্গপ্রেরিত মানুষ। লড়াইয়ের প্রথম দিকে লোকটা মহাতেজে চিৎকার করছিল ‘মারো, মারো’। কিন্তু কিছু মুহূর্ত পরেই তার গলার স্বর পালটে গিয়ে হল, ‘দোয়া দোয়া সাহেব’। কিন্তু চার্লি থামল না। যতক্ষণ না পর্যন্ত লোকটি প্রকৃতভাবে শান্ত হল ততক্ষণ পর্যন্ত চাবুক চালিয়ে গেল। অবশেষে ফকির তার পাগলামো আর দৈবশক্তি সব এখানে ফেলে রেখে খোঁড়াতে খোঁড়াতে পালিয়ে গেল। আধ ঘণ্টা পরেই অবশ্য সে তার গাঁজায় দম দিয়ে আগের মতোই বদমাইশি করে বেড়াতে লাগল। তবে যেই লোকজন তাকে বলতে লাগল ওই যে সাহেব আসছে সে তক্ষুনি সেখান থেকে হাওয়া হয়ে গেল।
সবচেয়ে আজব ব্যাপার হলো, নেটিভরা এই বদমাইশগুলোর সব রকম বদমাইশি শুধু সহ্য করে তা নয় এমনকি এদেরকে নিজেরদের ঘর থেকে খালি হাতে কখনও ফেরায় না। কয়েকদিন আগে এরকমই এক ফকির পাগলামো করে এক হতভাগ্যের হাত ভেঙে দিয়েছিল কিন্তু তাকে কেউ কিছু বলেনি। এ জন্যই এই দুর্বৃত্তগুলো বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর অন্যের শ্রমের উপর ভাগ বসিয়ে দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকে। তাদের শয়তানিকে পাগলামো বলে চালানো হয়। একদিকে সাধারণ গরিব কুলি যখন উদয়াস্ত কঠোর পরিশ্রম করে, তখন এই লোকগুলো ঘুরে বেড়িয়ে ভালো ভালো খাবার জুটিয়ে ফেলে। লোকজনের সামনে সুযোগ পেলেই নিজের বড়াই করা, তাদেরকে অভিশাপের ভয় দেখানো, সুযোগ পেলেই পরধন আত্মসাৎ ইত্যাদি করে এরা ভালোই থাকে। তবে সাহেবদের ভয়ে ইদানীং এরা একটু সমঝে থাকে।’


























