মানুষ যত দূরেই যাক, তার শৈশবের গ্রাম কখনও তাকে ছেড়ে যায় না। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, প্রকৃতি বদলায়; কিন্তু স্মৃতির ভেতরের গ্রামটি ঠিক আগের মতোই থেকে যায়। আমার কাছে যশোরের শার্শা উপজেলার সীমান্তবর্তী শালকোনা তেমনই একটি গ্রাম, যে গ্রাম আজও আমার মনোজগতের গভীরে সবুজ হয়ে বেঁচে আছে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় শালকোনা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। গ্রামের দুই পাশেই ভারত। সীমান্তের এত কাছাকাছি হয়েও আমাদের শৈশবে সীমান্তের কোনো কাঁটাতারের অনুভূতি ছিল না। ছিল শুধু বিস্তীর্ণ মাঠ, বিল, গাছপালা আর প্রকৃতির অবাধ বিচরণ। বর্ষায় বিলের জল আর আকাশ যেন একাকার হয়ে যেত। শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম কিংবা শরৎ, প্রতিটি ঋতুর ছিল আলাদা রূপ, আলাদা সৌন্দর্য।
ছোটোবেলায় শালকোনা ছিল ছায়ায় ঢাকা এক সবুজ গ্রাম। ছোট ছোট বন, ঝোপঝাড়, গুল্মলতা আর নানা প্রজাতির বৃক্ষ ঘিরে রেখেছিল পুরো জনপদকে। সেই বনেই দেখা মিলত শিয়াল, বেজি, খাটাশ, খরগোশ, শজারু, নানা জাতের সাপসহ অসংখ্য প্রাণীর। তখন প্রকৃতি ছিল মানুষের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী।
গ্রামের পাশের দোবিলা বিল বর্ষায় পানিতে টইটম্বুর হয়ে উঠত। সেখানে কই, মাগুর, শিং, শোল, চিতল, পাবদা, টাকি, কত যে দেশি মাছ পাওয়া যেত, তার হিসাব নেই। ডোঙা নৌকায় চড়ে শাপলা তুলেছি, পদ্মফুল তুলেছি। বিলের উত্তরেই ভারতের পাকা সড়ক। বয়রা থেকে বনগাঁর বাস চলতে দেখেছি। খেলতে খেলতে নৌকা নিয়ে কতবার যে ভারতের জলসীমায় চলে গেছি, তা আজও মনে পড়ে।
বিলে যাওয়ার পথে ছিল আমাদের প্রিয় ‘খটখটে বাগান’। সারাক্ষণ ভেসে আসত খটখট শব্দ। সেই শব্দ থেকেই তার নাম। বাগানে ঢোকার আগে ছিল বিশাল একটি ছাতিম গাছ। বর্ষাকালে তার ফুলের সুবাস বাতাসকে মুগ্ধ করে রাখত। দুই ধারে লাল ফুলে ভরা ‘মানসে মাদার’, ঝোপজুড়ে হলুদ তিৎপল্লা, কোথাও প্রাচীন জামগাছ, কোথাও বাঁশঝাড়, কোথাও উলুটি, বাচড়া আর বৈঁচির ঝোপ। গাঙশালিকের বাসা ছিল উঁচু পাড়ের গর্তে।
খটখটে বাগান যেন ছিল প্রকৃতির এক উন্মুক্ত ভেষজ ভাণ্ডার। সেখানে পাথরকুচি, থানকুনি, পিপুল, তেলাকচু, দস্তা কচু, বনমূলা, বনবেগুন, ঘ্যাটকল, পটকা, বনচণ্ডাল, ধুতরাসহ কত যে গাছ জন্মাত! একটি ছোট বরই গাছ পুরোপুরি ঢেকে ছিল আলেকলতায়। গ্রামের প্রবীণরা নিষেধ করতেন, এই লতার কোনো অংশ মুখে দেওয়া যাবে না। বিশ্বাস ছিল, তা মানুষের পেটের ভেতরেও লতা জন্মাবে। এখন বুঝি, সেটা ছিল লোকবিশ্বাস, কিন্তু তখন সেই গল্প আমাদের মনে এক রহস্যের জগৎ তৈরি করেছিল।
বিলের ওপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে দোয়েল উড়ে যেত। একটি তালগাছের কোটরে ছিল মাছরাঙার বাসা। মুহূর্তেই পানিতে ঝাঁপ দিয়ে মাছ ধরে আবার গর্তে ফিরে যেত। বর্ষায় বিলে প্রচুর শোলা জন্মাত। ভারতের পাড়ুই সম্প্রদায়ের মানুষ এসে সেই শোলা সংগ্রহ করতেন। সীমান্ত তখন বিভেদের চেয়ে জীবিকার সম্পর্কই বেশি বহন করত।
গ্রীষ্মের বিকেলে গ্রামের পশ্চিমের মাঠ ছিল আমাদের আনন্দভূমি। ওপারেই ভারতের বাজিতপুর। মাঠজুড়ে ফুটে থাকত সাদা আকন্দ ফুল। পাশে উইপোকার ঢিবি আর বিশাল শিমুল গাছ। বিকেলে সেখানে বসত ফিঙে। সন্ধ্যা নামলে যজ্ঞডুমুর গাছে ভিড় করত ছোট ছোট পাখি। এই মাঠেই বছরের পর বছর বাংলাদেশ-ভারত ফুটবল টুর্নামেন্ট হয়েছে। দুই দেশের মানুষ একসঙ্গে খেলা দেখেছে, আনন্দ করেছে। সীমান্ত তখনও মানুষকে পুরোপুরি আলাদা করতে পারেনি।
শরৎ এলে আউশ ধান কাটা শেষ হতো। বনের ঝোপে ফুটত তিৎপল্লার হলুদ ফুল। শীত শুরু হলে আসত অতিথি পাখি। গ্রামের অনেকেই ফাঁস জাল পেতে পাখি ধরতেন। একদিন এক চাচার সঙ্গে গিয়েছিলাম। কয়েকটি কাদাখোঁচা পাখি ধরা পড়েছিল জালে। একটি পাখি হাতে নিয়ে অনুভব করেছিলাম তার বুকের দ্রুত স্পন্দন। সেই মুহূর্তে আর তাকে আটকে রাখতে পারিনি। ছেড়ে দিয়েছিলাম মুক্ত আকাশে।
আজ শালকোনায় সেই প্রাচীন বৃক্ষগুলো আর নেই। আয়ুব হোসেন মেম্বারদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে ছিল বিশাল এক বটগাছ। হাজার হাজার বাদুড়ের আশ্রয় ছিল সেখানে। নিচে ছিল আতা ও পারিজাত। বর্ষায় বটের ঝুরি বেয়ে উঠত মাকাল লতা। শোনা যেত, বহু আগে সেখানে একটি মসজিদ ছিল। পরিত্যক্ত সেই মসজিদের ওপরই জন্ম নিয়েছিল বটগাছটি। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস ছিল, গাছটির কোনো ক্ষতি করলে অমঙ্গল নেমে আসে। তাই কেউ তার ডালও কাটতেন না। শেষ পর্যন্ত সময়ের কাছেই হার মানে সেই গাছ।
আনছার আলীর বাড়ির দক্ষিণ পাশের বিশাল অশ্বত্থ গাছে বাস করত অসংখ্য শকুন ও বড় বড় ভূতুম পেঁচা। আশপাশের কোথাও গরু-ছাগল মারা গেলে শকুনেরা সেখানে উড়ে যেত। আজ শকুনও নেই, গাছও নেই।
মিনাজ মোল্লার পুকুর ছিল আমাদের শৈশবের আরেক বিস্ময়। চারপাশে বাবলা, ভাটই, আতছড়ির ঝোপ। সেই পুকুরকে ঘিরে ছিল কত ভয়ের গল্প! বলা হতো, রাতের বেলা একা গেলে বিড়াল পিছু নেয়, কখনও ভূত সামনে এসে দাঁড়ায়। তাই সন্ধ্যা হওয়ার আগেই আমরা বাড়ি ফিরে আসতাম।
শালকোনা-শিববাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৭ সালে। তার আগে গ্রামের মানুষ বয়রা ও বাগদার বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। দেশভাগের পর সেই দুই এলাকা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে গ্রামের শিক্ষাজীবন নতুন পথে এগোয়।
একসময় শালকোনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু পরিবার বাস করত। দেশভাগের পর অধিকাংশই ভারত চলে যান। থেকে যায় মাত্র একটি পরিবার। দেশভাগের সেই ইতিহাস আজও গ্রামের স্মৃতির অংশ হয়ে আছে।
আটত্রিশ বছর আগে জীবিকার প্রয়োজনে শহরে চলে এসেছি। এখন গ্রামে যাওয়া হয় খুব কম। তবু প্রতি বছর ঈদের সময় মাঠে হাঁটি, বিলে যাই, পুরোনো পথ খুঁজি। দেখি, গাছ নেই, বন নেই, শকুন নেই, মাছ নেই, আগের মতো জলও নেই। প্রকৃতি যেন ধীরে ধীরে তার পুরোনো রূপ হারিয়ে ফেলেছে।
তবু আমার স্মৃতির শালকোনা এখনও আগের মতোই সবুজ। সেখানে এখনও ছাতিম ফুলের গন্ধ ভেসে আসে, দোবিলা বিলে পদ্ম ফুটে থাকে, মাছরাঙা পানিতে ঝাঁপ দেয়, দোয়েলের ঝাঁক মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়। সেই শালকোনা শুধু একটি গ্রাম নয়; সেটি আমার শৈশব, আমার শিকড়, আমার পরিচয়। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন এই গ্রাম আমার ভেতরে বেঁচে থাকবে, এক টুকরো হারিয়ে যাওয়া বাংলার প্রতিচ্ছবি হয়ে।


























