যশোরের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ব্যারিস্টার নন্দ কুমার ঘোষ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি ছিলেন একাধারে আইনজীবী, কংগ্রেস নেতা, ক্রীড়া সংগঠক এবং সংস্কৃতিপ্রেমী ব্যক্তি। যদিও কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় তিনি কলকাতায় ব্যারিস্টার হিসেবে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, তবুও জন্মভূমি যশোরের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁকে স্থানীয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
যশোর শহরের বাগমারা সড়কে ছিল তাঁর আবাসস্থল। তিনি কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং যশোরের ক্রীড়া জগতকে সংগঠিত ও বিকশিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৩৫ সালে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় “যতীন্দ্র মোহন ক্লাব” (জেএমসি)। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ক্লাবটি যশোরের ক্রীড়া অঙ্গনে অত্যন্ত সক্রিয় ছিল এবং এর অধীনে বিভিন্ন ফুটবল ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো।
জেএমসি ক্লাবের হয়ে তৎকালীন সময়ের বহু খ্যাতিমান খেলোয়াড় মাঠ মাতিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেষ্ট দত্ত, কানা কেষ্ট, বিনয় বিশ্বাস, পুটু কুণ্ডু, পুষ্পেন সরকার, আলমগীর সিদ্দিকী ও আব্দুল জলিল উল্লেখযোগ্য। যশোরের ফুটবল ইতিহাসে এঁদের অবদান আজও স্মরণীয়।
ব্যারিস্টার নন্দ কুমার ঘোষ সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি যশোরের বিখ্যাত ‘মধুচক্র’ সিনেমা হলের স্বত্বাধিকারী ছিলেন। পরবর্তীকালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘নিরালা’ রাখা হয়। দীর্ঘদিন যশোরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এ সিনেমা হল বর্তমানে বিলুপ্ত।
নন্দ কুমার ঘোষের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক গুরুত্বের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ১৯৩৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরের ঘটনায়। সেদিন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যশোর সফরে এসে তাঁর বাড়িতে যান এবং সেখানে নৈশভোজ গ্রহণ করেন। পরে সেখান থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এই ঘটনা যশোরের রাজনৈতিক ইতিহাসেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে যশোর ছিল ফুটবলের একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র। তখনো যশোরে আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মিত হয়নি। সম্মিলনী স্কুলের মাঠ এবং জলকলের মাঠ ছিল ফুটবল খেলার প্রধান ভেন্যু। জলকলের মাঠের চারপাশে ব্রিটিশ সামরিক ব্যারাক থাকায় সেখানে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। শনি ও রবিবারে মাঠটিতে ঘোড়দৌড়েরও আয়োজন করা হতো।
সেই সময় যশোরের ফুটবল অঙ্গনে ‘জেএমসি’, ‘চিত্তরঞ্জন ক্লাব’, ‘টাউন ক্লাব’, ‘পুলিশ ক্লাব’, ‘ওয়াইএমসি’ এবং ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের দলসমূহ নিয়মিত অংশগ্রহণ করত। জেএমসি ক্লাবের অফিস ছিল চৌরাস্তা মসজিদের পাশে রবীন্দ্রনাথ সড়কের একটি পুরোনো দোতলা ভবনে। আর ক্লাবের খেলার মাঠ ছিল বর্তমান গেটলট মিনিবাস স্ট্যান্ড এলাকার জেএমসি মাঠে, যেখানে বর্তমানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে।
জেএমসি শুধু ফুটবলেই নয়, সাঁতার প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ছিল। ব্যারিস্টার নন্দ কুমার ঘোষের বাড়ির পুকুরে কলকাতার বিখ্যাত সাঁতারু প্রফুল্ল ঘোষের সঙ্গে জেএমসির সাঁতারু আজিজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কৃত হন। এ ঘটনা তৎকালীন যশোরের ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণচাঞ্চল্যেরই প্রমাণ বহন করে।
যশোর শহরের উপকণ্ঠ শেখহাটি-সুলতানপুরের মাঠে নিয়মিত শিল্ড ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। সেখানে ‘চিত্তরঞ্জন’, ‘টাউন ক্লাব’, ‘জেএমসি’ এবং ব্রিটিশ সামরিক দলের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যেত। ১৯৪৫ সালে জেএমসি একটি স্মরণীয় সাফল্য অর্জন করে। তারা শক্তিশালী ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের দলকে পরাজিত করে ‘জেএমসি শিল্ড’ জয় করে। বিজয়ের স্মারক সেই শিল্ড দীর্ঘদিন ক্লাব ভবনের দোতলার বারান্দায় প্রদর্শিত ছিল।
দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে যশোরের ক্রীড়া অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ‘জেএমসি’ ও ‘চিত্তরঞ্জন’ ক্লাবের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ‘এভারগ্রীন’ ও ‘ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব’-এর মতো নতুন সংগঠনের উত্থান ঘটে, যা যশোরের ক্রীড়াচর্চার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।


























