রোববার ১৯ জুলাই ২০২৬

২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুর্শিদাবাদের খোশবাগে একদিন

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৪:৪৯, ১৮ জুলাই ২০২৬

মুর্শিদাবাদের খোশবাগে একদিন

মীর জাফর আলী খান বাহাদুর। ইতিহাসে তিনি বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর হিসেবে কুখ্যাত। তাঁর প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছিলাম, ইতিহাসের চাবুক কতখানি শক্তিশালী। লোকমুখে ওঁর প্রাসাদের নাম ‘নিমকহারাম দেউড়ি’।


দার্জিলিং থেকে জিপ নিয়ে ফেরার পথে ২০১৫ সালের মে মাসে গিয়েছিলাম মুর্শিদাবাদ। প্রচণ্ড গরম। সেই সময় দুপুরে পৌঁছালাম। খেয়ে তারপর ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে বের হলাম ঘুরতে।
বহরমপুর থেকে ভাগীরথী পার হয়ে চলেছি খোশবাগ দর্শনে। নাঃ, নদীপথে নয়। সে দিন গেছে। এখন এপার ওপার ফ্লাইওভারে নদী পারাপার, নাওয়ের বদলে চার চাকা কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে যাওয়া যায়। খোশবাগ। এখানেই চিরশান্তির ঘুমে শুয়ে আছেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। নবাব সিরাজৌদ্দল্লা। যেমন বর্ণময় জীবন, তেমনই মর্মান্তিক তাঁর অন্তিম পরিণতি। আমার মুর্শিদাবাদের প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণের কেন্দ্রে শুরু থেকেই ছিলো খোশবাগ। সাদামাটা চিরশয্যায় শায়িত বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব, সিরাজৌদ্দল্লা। বেনিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে ভারতে ব্রিটিশ শাসন কায়েম হওয়ার যুগ সন্ধিক্ষণ। সেদিন পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজৌদ্দল্লার পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে দু-শো বছরের জন্য পরাধীন হয়েছিল এই উপমহাদেশ, স্বাধীনতা হারিয়েছিল একটি জাতি। বলা যায়, এই আবেগ, এই গুরুত্বই ভূমিকায় নিয়ে আসে খোশবাগকে। খোশবাগ নবাব আলিবর্দী খাঁর পারিবারিক সমাধিস্থল। তাঁর পরিবারের প্রায় সকলেই শায়িত এখানে। রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল এই ঐতিহাসিক মহার্ঘ সম্পদ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দায়িত্ব নেওয়ার পর অবস্থা বদলেছে। দেশের অন্যান্য ঐতিহাসিক মূল্যবান স্মৃতিসৌধগুলির মতো করেই মুর্শিদাবাদের খোশবাগ, কাটরা মসজিদ, হাজারদুয়ারী, ইমামবড়া, মোতিঝিল, বাচ্চাওয়ালি তোপ ইত্যাদি রক্ষণাবেক্ষণ করছে এই বিভাগ। আর দফতরের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষিত গাইডও রাখা হয়েছে প্রত্যেকটি কেন্দ্রে।
একদা বাংলা-বিহার-ওড়িশার রাজধানী বলে কথা! ধ্বংস ও অবলুপ্তির পরও যা আছে, তা দেখার জন্য কমপক্ষে ৩/৪ দিন জরুরি। 
খোশবাগ দিয়ে আমার যাত্রা শুরু। ভাগীরথীর তীরে এই গোলাপবাগান ছিল নবাব আলীবর্দী খাঁয়ের পারিবারিক অবকাশ যাপনের প্রিয় ক্ষেত্র। পরিবারের সবাইকে নিয়ে বজরায় করে এখানে আসতেন তিনি। গোলাপের খুশবু থেকেই খোশবাগ নামকরণ। বড় আনন্দের ছিল সেই দিন। আলীবর্দীর পেয়ারের নাতি সিরাজ। সিরাজ চাইলে আকাশের চাঁদ এনে দিতে পারেন তিনি। 
গাইড ছেলেটি বলে যাচ্ছিলেন ইতিহাস। ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম খোশবাগ। গেটের মুখে গাড়ি থামিয়ে টিকিট কেটে ঢোকা, গাইড পেয়ে গেলাম সেখানেই। ইটের বাঁধানো পথ সোজা চলে গেছে। দুপাশে সবুজ গালিচার মতো নরম ঘাস। প্রাচীন গাছেরা দাঁড়িয়ে। বড় শান্ত ও নির্জন খোশবাগ। চারপাশ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। 
খোশবাগে সমাধিস্থ আছেন নবাব আলীবর্দী, তাঁর বেগম, সিরাজের ছোট ভাই ও দুই মাসি, যার একজন ঘসেটি বেগম। ইনি ইতিহাসে কুখ্যাত সিরাজের বিরুদ্ধে অন্যতম ষড়যন্ত্রী হিসেবে। ইতিহাস অবশ্য তাঁকেও ক্ষমা করেনি। এছাড়াও এখানে সমাধিস্থ নবাব পরিবারের আত্মীয়স্বজন, ঘনিষ্ঠ সহচর, পারিষদ, খাস পরিচারক এক-দুজন। তাঁদেরই কেউ কেউ আবার ছিলেন সিরাজ হত্যার মূলে। খোশবাগের প্রায় ৩০/৩১টি সমাধির ক্ষেত্রে মাত্র দুজনের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছিল – আলীবর্দী ও মেহেরুন্নেসা। বাকি সব অপঘাত। হত্যা, ষড়যন্ত্র, প্রতিহিংসা, লোভ ও লালসার ফসল। কালের নিয়মে ভাগীরথী সরে গেছে অনেক দূরে। পারাপার আজও চলছে। শত ইতিহাসের সাক্ষী ভাগীরথী বহতা আপন ছন্দে। কান পাতলে আজও শোনা যায় কান্না আর হাহাকার।
সর্বত্রই ক্যামেরা নিয়ে যাবার অনুমতি আছে, দুটি জায়গা ছাড়া – হাজারদুয়ারী ও জগৎ শেঠের বাড়ি। হাজার দুয়ারীর মূল অংশে পৌঁছানোর আগে অনেকটা ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। এই সিঁড়ির ওপর থেকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে গাইড দেখালেন, ওই ওখানে ছিল হিরাঝিল। ভাগীরথী শুনে যেন মুচকি হেসে বলল, সব যাবে কালের অতলে, আমি বয়ে যাবো চিরন্তন। জগৎ শেঠের বাড়িও এখন সংগ্রহশালা। জগৎ শেঠ ছিলেন সেই সময় মুর্শিদাবাদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এক নাম। প্রায় নিয়ামক বলা যায়। তাঁর এই প্রভাব প্রতিপত্তি ব্রিটিশ আমলেও বহাল ছিলো। এই সংগ্রহশালায় প্রবেশের পর প্রথম যেটা মনে এলো, নবাবি শান সৌকর্যের সঙ্গে শেঠ পরিবারের রুচির তফাত। অর্থানুকূল্য এখানেও কিছু কম নেই। তবে ওই যে, শিল্প ও সৌন্দর্যবোধ, সে তো শুধু টাকায় হয় না। এখানে দেখা তিনটি জিনিস বিশেষভাবে মনে আছে। একটি মসলিন শাড়ি, যা কিনা একটি দেশলাই বাক্সে ভরে ফেলা যায়। একটি খাবারের প্লেট, দেখতে অতি সাধারণ, যদিও বিশেষত্ব মারাত্মক। খাবারে বিষ মেশানো হয়েছে কিনা, সেটা এই প্লেটে রাখলেই ধরা পড়ে যাবে, বদলে যাবে খাবারের রং। যুগটা তখন সর্বার্থেই যে ষড়যন্ত্রকারীদের দখলে, বুঝতে অসুবিধা হয় না। 
পরে গেলাম মীর জাফরের কবর স্থানে। অনেকে তার কবর দেখে প্রস্রাব করতে চান-সেকারণে কবরের ফলক তুলে ফেলা হয়েছে। 


 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: