রোববার ১৯ জুলাই ২০২৬

২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুড়লীর পুণ্যাহ ও যশোরের  রাজস্ব ইতিহাস

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৭:৩২, ১৮ জুলাই ২০২৬

মুড়লীর পুণ্যাহ ও যশোরের  রাজস্ব ইতিহাস

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলার রাজস্ব প্রশাসনে ‘পুণ্যাহ’ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক আয়োজন। নতুন বাংলা বছরের শুরুতে জমিদারদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা হতো এই উৎসবের মাধ্যমে। যশোরেও এই প্রথা চালু ছিল। তখন যশোরের কালেক্টর ছিলেন টিলম্যান হেঙ্কেল। তাঁর আমলে যশোরের মুড়লী এলাকায় অনুষ্ঠিত একটি পুণ্যাহ উৎসবের ব্যয়ের হিসাব আজও ইতিহাসের একটি মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। এই হিসাব থেকে যেমন সেই সময়ের প্রশাসনিক রীতি সম্পর্কে জানা যায়, তেমনি উৎসবটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে প্রত্যেক জমিদারিতেই বছরে একবার পুণ্যাহ উৎসব আয়োজনের প্রচলন ছিল। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান ছিল না; বরং নতুন অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, পুণ্যাহ অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে নতুন বছরের খাজনা আদায় করা হতো না। তাই এই অনুষ্ঠান ছিল মূলত রাজস্ব আদায়ের উদ্বোধন এবং প্রজাদের কাছে এক ধরনের সরকারি ঘোষণা।
জমিদার-কাছারিতে পুণ্যাহ উপলক্ষ্যে নানা আয়োজন করা হতো। অতিথি আপ্যায়ন, বাদ্যযন্ত্র, আলোকসজ্জা, নাচ-গান এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার জন্য নির্দিষ্ট অর্থ ব্যয়েরও একটি প্রচলিত রীতি ছিল। এর মাধ্যমে জমিদার ও কোম্পানি প্রশাসন নিজেদের কর্তৃত্ব এবং প্রশাসনিক উপস্থিতি দৃশ্যমান করতেন। একই সঙ্গে প্রজাদের কাছে নতুন বছরের রাজস্ব পরিশোধের বার্তাও পৌঁছে দেওয়া হতো।
টিলম্যান হেঙ্কেল যশোরের কালেক্টর থাকাকালে মুড়লীতে পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন এবং ওই দিনটিকেই রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত তারিখ হিসেবে ঘোষণা করেন। এটি ছিল প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত। কারণ ওই দিন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন বছরের খাজনা আদায়ের কার্যক্রম শুরু হতো।
১৭৯০ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত ওই পুণ্যাহ উৎসবের ব্যয়ের একটি তালিকা ইতিহাসে সংরক্ষিত রয়েছে। সেই তালিকা থেকে জানা যায়, অনুষ্ঠানকে আকর্ষণীয় করে তুলতে বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল। আগুন প্রজ্বলনের কাজে ব্যয় হয়েছিল ৬৫ রুপি। সম্ভবত সন্ধ্যাকালীন আলোকসজ্জা বা আনুষ্ঠানিক অগ্নি প্রদীপ প্রজ্বলনের জন্য এই অর্থ খরচ করা হয়। টম-টম বা বাদ্যযন্ত্রের জন্য ব্যয় হয়েছিল ৭ রুপি। এছাড়া বালিকাদের নৃত্য পরিবেশনের জন্য ৩৫ রুপি এবং বালকদের নৃত্যের জন্য ১৫ রুপি ব্যয় করা হয়েছিল। এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, পুণ্যাহ কেবল প্রশাসনিক অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল উৎসবমুখর একটি সামাজিক আয়োজনও।
তবে এই ব্যয় নিয়ে আপত্তি তোলে সরকার। সরকারি কর্তৃপক্ষ মনে করেছিল, এ ধরনের খরচের নজির আগে ছিল না। ফলে তারা ওই ব্যয়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কালেক্টরদের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতেই পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। তাই ধারণা করা হয়, প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় কালেক্টররা অনেক সময় সরকারি হিসাবপত্রে কম অর্থ দেখাতেন, যাতে ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে কিংবা অনুমোদন পেতে সমস্যা না হয়।
এই ঘটনা থেকে কোম্পানি আমলের প্রশাসনিক বাস্তবতারও একটি চিত্র পাওয়া যায়। একদিকে রাজস্ব আদায়ের কঠোর ব্যবস্থা, অন্যদিকে স্থানীয় সামাজিক রীতিনীতি ও উৎসবের সঙ্গে প্রশাসনের সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা- দুটি বিষয়ই পুণ্যাহ উৎসবের মধ্যে মিলেমিশে ছিল। রাজস্ব আদায়ের মতো কঠিন প্রশাসনিক কাজকে উৎসবের আবহে সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে প্রজাদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরিরও একটি প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়।
টিলম্যান হেঙ্কেলের সময়কার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের একটি নির্দেশনায়। সে বছর রাজস্ব বোর্ডের আদেশ অনুযায়ী কালেক্টরদের বার্ষিক সফরে যাওয়ার কথা ছিল। তবে বোর্ড এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক নিয়ম প্রণয়ন করেনি। ফলে কেউ নিয়মিত বার্ষিক ভ্রমণে যেতেন, আবার কেউ যেতেন না। এসব সফরের উদ্দেশ্য ছিল রাজস্ব প্রশাসনের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় সমস্যার খোঁজখবর নেওয়া এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা অর্জন করা।
যশোরের ইতিহাসে মুড়লীর পুণ্যাহ উৎসবের এই ব্যয়ের তালিকা অষ্টাদশ শতকের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, সামাজিক উৎসব এবং কোম্পানি শাসনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। আজ সেই উৎসব বিলুপ্ত হলেও সংরক্ষিত দলিলের পাতায় টিলম্যান হেঙ্কেলের আয়োজিত পুণ্যাহ যশোরের দুই শতাধিক বছর আগের এক জীবন্ত ইতিহাস। 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: