১৮৬৯ সালে যশোরে ডেপুটি কালেক্টর ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করেন কবি, সাহিত্যিক ও পরবর্তীকালের খ্যাতিমান মহাকাব্যিক রচয়িতা নবীনচন্দ্র সেন। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি তৎকালীন যশোরের সমাজজীবন, মানুষের আচার-আচরণ, বিনোদন, নৈতিক মূল্যবোধ এবং নগরজীবনের নানা দিক খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাঁর আত্মজীবনী আমার জীবন-এ সংরক্ষিত সেই স্মৃতিচিত্র আজ ঊনবিংশ শতাব্দীর যশোরের সামাজিক ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল।
নবীনচন্দ্র সেনের বর্ণনায় দেখা যায়, সে সময় যশোরের শিক্ষিত ও বিত্তবান সমাজের একটি অংশের মধ্যে মদ্যপান ছিল সামাজিক আমোদের অন্যতম অনুষঙ্গ। বিভিন্ন আমোদ-সমিতিতে নিয়মিত আড্ডা বসত, যেখানে সুরাপানের আয়োজন থাকত। তবে তিনি নিজে কখনো অতিরিক্ত মদ্যপানের পক্ষপাতী ছিলেন না। বরং আত্মসংযম ও পরিমিতিবোধকে তিনি জীবনের অন্যতম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, পৃথিবীর কোনো বস্তুরই অতিরিক্ত ভোগে প্রকৃত সুখ নেই।
আত্মজীবনীর একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ে তিনি কুঞ্জ নামে এক ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। কঠোর নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং ভালোবাসা, আস্থা ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল দিয়েই তিনি বন্ধুকে সংস্কারের পথে আনতে চেয়েছিলেন। প্রথমে কুঞ্জের সব আবদারে সায় দিয়ে তাঁর পূর্ণ আস্থা অর্জন করেন। এরপর নিজের অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে বন্ধুকেও দিনের বেলা মদ্যপান থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করেন। পরে সন্ধ্যার আড্ডাতেও অজান্তে মদের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমিয়ে দিতে থাকেন।
নবীনচন্দ্র সেন লিখেছেন, নানা গল্প, স্মৃতিচারণ ও প্রাণখোলা আলাপের মাধ্যমে তিনি কুঞ্জকে এমনভাবে অন্যমনস্ক রাখতেন যে, পানীয়ের পরিমাণ কমে যাচ্ছে- তা তিনি বুঝতেই পারতেন না। একসময় কুঞ্জ বিস্মিত হয়ে আক্ষেপ করে বলেন, আগে যেখানে এক বোতল মদ পান করেও তাঁর নেশা হতো না, এখন সামান্য মদেই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। তখন নবীনচন্দ্র সেন যুক্তি দিয়ে বোঝান, অল্পতেই যদি একই ফল পাওয়া যায়, তবে অকারণে বেশি মদ পান করে অর্থ ও শরীর নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে শুধু একজন মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনের কাহিনি নয়, বরং তৎকালীন যশোরের শিক্ষিত সমাজে মদ্যপানের সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্পর্কের এক বাস্তব চিত্রও ফুটে ওঠে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যশোরের বিভিন্ন আমোদ-সমিতিতে উপস্থিত ব্যক্তিরা তাঁর বিচক্ষণতা ও আত্মসংযমের ওপর আস্থা রেখে প্রায়ই পানীয় বিতরণের দায়িত্ব তাঁর হাতেই তুলে দিতেন। এমনকি কেউ অতিরিক্ত মদ্যপান করে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনিই তাঁর সেবাযত্নে এগিয়ে যেতেন।
কুঞ্জের আরেকটি অভ্যাস ছিল গভীর রাতে শহরে ঘুরে বেড়ানো। সেটিও তিনি ধৈর্য ও কৌশলের মাধ্যমে কমিয়ে আনেন। কখনো নিজের অসুস্থতার অজুহাত, কখনো একসঙ্গে সন্ধ্যা কাটানোর প্রস্তাব, আবার কখনো বন্ধুদের বাড়িতে বেড়ানোর পরিকল্পনা করে তিনি ধীরে ধীরে সেই অভ্যাস দূর করেন। এতে বোঝা যায়, মানুষের আচরণ পরিবর্তনে তিনি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ও আন্তরিক সম্পর্ককে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম বলে মনে করতেন।
নবীনচন্দ্র সেনের স্মৃতিচারণে সমকালীন যশোরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরও এক অনন্য ছবি পাওয়া যায়। শরতের এক জোছনামাখা রাতের বর্ণনায় তিনি লিখেছেন, বাসার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদের স্থির নীল জলে চাঁদের আলো হীরক চূর্ণের মতো ঝিকমিক করছিল। নদীতীরের সবুজ প্রান্তর, নির্মল আকাশ এবং রুপালি জোছনায় ভেসে থাকা সেই পরিবেশ তাঁর ভাষায় যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এই বর্ণনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, ঊনবিংশ শতকের যশোর ছিল একদিকে প্রাণবন্ত প্রশাসনিক শহর, অন্যদিকে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এক জনপদ।
ইতিহাস গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকেও নবীনচন্দ্র সেনের এই স্মৃতিচারণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারি নথিপত্র সাধারণত প্রশাসনিক তথ্য সংরক্ষণ করে; কিন্তু মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক রীতি, বিনোদন, সম্পর্কের উষ্ণতা কিংবা একটি শহরের আবহ- এসবের নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া যায় সমকালীন স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনীতে। সেই বিবেচনায়, আমার জীবন গ্রন্থটি ঊনবিংশ শতকের যশোরের সামাজিক ইতিহাস অনুসন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক (Primary) উৎস হিসেবে বিশেষ মূল্য বহন করে।


























